ধর্ম

মধ্যযুগের হামদানি সাম্রাজ্যের গৌরবগাথা

নিউজ ডেস্ক১১ নভেম্বর ২০২৫৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

বনু হামদান ছিল এক বিশিষ্ট আরব পরিবার, যারা ইতিহাসে খ্যাতিমান হামদানি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। তারা একসময় মসুল ও আলেপ্পো নগরীর শাসক ছিল। ৮৯০ থেকে ১০০৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তাদের প্রভাব বিস্তৃত ছিল লেভান্ট ও ইউফ্রেটিস নদী উপত্যকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে, যার অন্তর্ভুক্ত ছিল বহু শহর, গ্রাম ও উর্বর ভূমি। হামদানিরা মূলত তাগলিব ইবনে ওয়াইল গোত্রের অন্তর্গত, যা উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার জাজিরা অঞ্চলে বসবাসকারী প্রাচীন আরব উপজাতিগুলোর একটি ছিল।

রাষ্ট্রটির প্রতিষ্ঠাতা হামদান ইবনে হামদুন প্রথমে আব্বাসীয় শাসকদের অধীনে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর যোগ্যতা ও প্রভাবের কারণে আব্বাসীয় খলিফা তাঁকে মারদিন অঞ্চলের গভর্নর নিযুক্ত করেন। পরবর্তীকালে আব্বাসীয় খিলাফতের দুর্বলতা এবং তুর্কি সেনাপতিদের পারস্পরিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে হামদানিরা নিজেদের শক্তি সুসংহত করেন। ফলে ২২৯ হিজরি (৮৪০ খ্রিস্টাব্দ) সালে তারা মসুলে স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠা করে এবং পরে তার পরিধি আলেপ্পো পর্যন্ত বিস্তৃত করে।

স্বাধীনতার পর, সিরিয়ার জাজিরা, ইউফ্রেটিস উপত্যকা ও সিরিয়ার মরুভূমির প্রান্তবর্তী অঞ্চলগুলোর বহু আরব গোত্র তাদের সঙ্গে একত্র হয়। ফলে হামদানি রাষ্ট্র পরিণত হয় মধ্যযুগীয় ইসলামী বিশ্বের একটি প্রভাবশালী ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ শক্তিতে। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর, হামদানিরা আব্বাসীয় খিলাফতের ওপর তুর্কি শাসকদের প্রভাব দেখে গভীরভাবে অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠে। খিলাফতের দুরবস্থায় তারা আব্বাসীয় খলিফাদের রক্ষায় এগিয়ে আসে এবং তাদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে।
এ সময়ে হাসান বিন আবদুল্লাহ হামদান বাগদাদে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। সেখানে পৌঁছে তিনি খলিফা মুত্তাকি বিল্লাহর কাছ থেকে উষ্ণ অভ্যর্থনা পান। খলিফা তাঁর বীরত্ব ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে উপাধি দেন ‘রাজপুত্রদের রাজপুত্র’ এবং ‘রাজ্যের সমর্থক’। তাঁর ভাই আলী হামদানি পান ‘রাষ্ট্রের তরবারি’ উপাধি। এই ঘটনার পর থেকেই হামদানিরা ধীরে ধীরে তুর্কি শাসকদের কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয়।

তবে পরাজয়ের পরও তুর্কিরা আত্মসমর্পণ করেনি। তারা আবার সংগঠিত হয় যুবরাজ তুজুনের নেতৃত্বে এবং তাদের পুরনো শক্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা শুরু করে। এই সময়ে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যার ফলে অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। আর্থিক চাপে পড়ে হামদানিরা জনগণের ওপর অতিরিক্ত করারোপ করতে বাধ্য হয়। ফলে দেশে অশান্তি ও নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়ে, সঙ্গে মহামারির প্রাদুর্ভাবও দেখা দেয়। এসব সংকটের কারণে হামদানিরা সৈন্যদের বেতন পরিশোধে ব্যর্থ হয়, যার ফলে সেনাবাহিনীর একাংশ বিদ্রোহ করে বসে। এই অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে যুবরাজ তুজুনের নেতৃত্বে তুর্কিরা হামদানিদের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ চালায় এবং তাদের ওপর পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়। এরপর ৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে, হামদানিরা ইখশিদি শাসকদের কাছ থেকে আলেপ্পো দখল করে এবং সেখানে তাদের নতুন রাজধানী স্থাপন করে। আলেপ্পোর শাসক ও গভর্নর নিযুক্ত হন সাইফুদ দাওলা হামদানি, যিনি পরে হামদানি গৌরবের প্রতীক হয়ে ওঠেন। এই সময়ে আব্বাসীয় খলিফা মুত্তাকি তুর্কিদের প্রতিশোধের ভয়ে হামদানিদের শরণাপন্ন হন। হামদানিরা তাঁকে নিরাপদ আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফিরে আসার আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টে যায়—তারা শেষ পর্যন্ত মুত্তাকিকে ক্ষমতাচ্যুত করে, এবং তাঁর স্থানে মুস্তাকফিকে নতুন খলিফা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এ ঘটনার মাধ্যমে হামদানিরা শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও ইসলামী বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।
মূলত হামদানি রাজ্য মধ্যযুগে একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ছিল। এই রাজ্যটি সরাসরি সীমান্ত ভাগ করত বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে, যার কেন্দ্র ছিল এশিয়া মাইনরের দক্ষিণাঞ্চলে। সীমান্তবর্তী এই অবস্থানের কারণে হামদানিদের সঙ্গে বাইজেন্টাইনদের সংঘর্ষ ছিল প্রায় অবশ্যম্ভাবী। আলেপ্পোর প্রখ্যাত আমির সাইফুদ দাওলা হামদানি ছিলেন সেই যুগের এক বলিষ্ঠ নেতা, যিনি বাইজেন্টাইনদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে দৃঢ়ভাবে কাজ করেছিলেন। তাঁর শাসনামল ছিল একের পর এক যুদ্ধ ও সংঘর্ষে পরিপূর্ণ। কিছু যুদ্ধে তিনি বীরোচিত জয় অর্জন করেছিলেন, আবার কিছু যুদ্ধে পরাজয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতাও পেয়েছিলেন। সাইফুদ দাওলার সময়ে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সিংহাসনে ছিলেন দুই প্রবল সম্রাট নাইসেফোরাস ফোকাস ও জন টজিমিস্কেস। নাইসেফোরাস ফোকাস একসময় আলেপ্পো দখল করতে সক্ষম হন। তিনি শহরটিতে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালান, সাইফুদ দাওলার প্রাসাদ জ্বালিয়ে দেন এবং নগরীর বহু অংশ ধ্বংস করেন। তবু সাইফুদ দাওলা পরাজয়ে ভেঙে পড়েননি। তিনি নিজ বাহিনী পুনর্গঠন করে বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনীকে পাল্টা আক্রমণ করেন। প্রথম দিকে তিনি কিছু সাফল্য পেলেও পরবর্তী সময়ে এক বৃহৎ পরাজয়ের মুখে পড়েন এবং আলেপ্পোর সীমান্তে মুসলিম আধিপত্য দুর্বল হয়ে পড়ে। এরপর জন টজিমিস্কেসের শাসনামলে বাইজেন্টাইনরা আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তাঁর নেতৃত্বে তারা জেরুজালেম দখল করে নেয়, যেখানে তখন হামদানিদের পক্ষ থেকে তেমন কোনো প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। বহু বছর ধরে বাইজেন্টাইনরা শহরটি দখলে রাখে, যতক্ষণ না মহান সেনাপতি সালাহউদ্দিন আইউবী এসে বিজয়ী অভিযানে জেরুজালেম মুক্ত করেন। সাইফুদ দাওলা হামদানির মৃত্যুর পর রাজ্যটি দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। হামদানি পরিবারের ভেতরে অন্তর্দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়, যা সমগ্র রাজ্যজুড়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। এদিকে আব্বাসীয় খলিফারা তখন নিজেদের দুর্বল অবস্থার কারণে ফাতেমীয় শিয়াপন্থী শক্তির মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হন। এই সুযোগে ফাতেমীয়রা উত্তর সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হয় এবং শেষ পর্যন্ত ১০০৩ খ্রিস্টাব্দে আলেপ্পো দখল করে। এর মধ্য দিয়েই হামদানি রাজ্যের পতন ঘটে এবং একসময়ের এই গৌরবময় রাষ্ট্র ইতিহাসের পাতায় স্থান পায় মুসলিম সামরিক বীরত্ব, সংস্কৃতি ও সাহসিকতার এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে।