ধর্ম

আরব জাতির উৎপত্তি ও শ্রেণিবিভাগ

নিউজ ডেস্ক২৯ অক্টোবর ২০২৫৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

আরব জাতির ইতিহাস মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন অধ্যায়। তাদের উৎস, বংশধারা ও শ্রেণিবিভাগ নিয়ে ইতিহাসবিদ ও বংশতাত্ত্বিকদের মধ্যে বহু আলোচনা হয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই তারা আরব উপদ্বীপে বসবাস করে আসছে এবং ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তা গঠন করেছে। আরবদের উৎপত্তি ও জন্মভূমি সম্পর্কে বংশতালিকাবিদরা মানবজাতিকে বিভিন্ন জাতিতে বিভক্ত করেছিলেন এবং প্রত্যেক জাতির নাম নির্দিষ্ট করেছিলেন।

এর মধ্যে অন্যতম ছিল সেমিটিক জাতি, যাদের উৎপত্তি নুহ (আ.)-এর পুত্র সাম থেকে। আরব জাতি এই সেমিটিক বংশেরই অন্তর্ভুক্ত। আরবরা বসতি স্থাপন করেছিল আরব উপদ্বীপে, যা প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত ছিল—দক্ষিণ আরব (বর্তমান ইয়েমেন অঞ্চল), যেখানে বাস করত কাহতানীয় আরবরা। তারা কাহতানের বংশধর বলে পরিচিত।

উত্তর আরব (হিজাজ অঞ্চল), যেখানে বাস করত আদনানীয় আরবরা, যাদের বংশধারা নবী ইবরাহিম (আ.)-এর পুত্র ইসমাঈল (আ.) পর্যন্ত পৌঁছে। বেশির ভাগ ঐতিহাসিক ও বংশতত্ত্ববিদের মতে, কাহতানীয়রা ছিল আদি আরব অর্থাৎ জন্মগতভাবেই তারা আরবি ভাষাভাষী ছিল। অন্যদিকে আদনানীয়রা ছিল তাদের শাখা, যারা কাহতানীয়দের কাছ থেকেই আরবি ভাষা শিখেছিল। কারণ ইসমাঈল (আ.) তাঁর পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর ভাষায় কথা বলতেন, যা ছিল আরামিক বা ক্যালদীয়, কিছু মত অনুযায়ী হিব্রু।

পরবর্তী সময়ে আল্লাহ তাআলা তাঁর হৃদয়কে আরবি ভাষার প্রতি উন্মুক্ত করেন এবং হিজাজে বসবাস শুরু করার পর তাঁর সন্তানরা আরবি ভাষা গ্রহণ করে। তাই বলা যায়, কাহতানীয়রা ছিল আদি আরব, আর আদনানীয়রা ছিল তাদের উত্তরসূরি বা শাখা আরব।
আরবদের শ্রেণিবিভাগ

বংশতাত্ত্বিকদের মতে, আরবদের সাধারণভাবে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে—প্রথম দুই শ্রেণির বংশধারা নুহ (আ.)-এর পুত্র সামের দিকে ফিরে যায়।

১. খাঁটি আরব (আদি আরব) : খাঁটি আরবদের বংশধারা ফিরে যায় কাহতান ইবনে এবার ইবনে শালিহ ইবনে আরফাখশাদ ইবনে সাম ইবনে নুহ (আ.)-এর দিকে। কিছু ঐতিহাসিকের মতে, কাহতান ছিলেন নবী হুদ (আ.)-এর পুত্র, আর হুদ (আ.)-এর প্রকৃত নামই ছিল এবার।

তবে অনেক পণ্ডিত মনে করেন, নবীর সঙ্গে বংশগত সম্পর্ক স্থাপনটি ছিল মূলত গৌরব প্রকাশের উদ্দেশ্যে, আদনানীয়দের নবী ইসমাঈল (আ.)-এর বংশধারায় গর্ব প্রকাশের জবাবে। কাহতানের পুত্রদের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। উল্লেখযোগ্য নামগুলোর মধ্যে আছে— ইয়ারুব, হাদরামাউত, ওমান ও জুরহুম। এই বংশ থেকেই দক্ষিণ আরবের (ইয়েমেন অঞ্চলের) বহু প্রাচীন গোত্রের উদ্ভব ঘটে।
২. আরবীকৃত আরব (আরবাইজড আরব): আরবীকৃত আরবরা ছিলেন আদনান ইবনে আদ ইবনে আদাদ ইবনে এলিয়াসা ইবনে আল-হুমাইসা ইবনে সালামান ইবনে নাবিত ইবনে হামল ইবনে কিদার ইবনে ইসমাঈল (আ.)-এর বংশধর। তাদের ‘আরবীকৃত’ বলা হয়, কারণ তাদের পূর্বপুরুষ ইসমাঈল (আ.) জন্মগতভাবে আরবি ভাষাভাষী ছিলেন না—তিনি তাঁর পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর ভাষা, অর্থাৎ আরামিক বা ক্যালদীয়, বলতেন। পরবর্তী সময়ে আরব উপদ্বীপে বসবাস শুরু করার পর তিনি জুরহুম গোত্রের কাছ থেকে আরবি ভাষা শিখেছিলেন। ইসমাঈল (আ.)-এর ১২ পুত্র ছিল, যার মধ্যে অন্যতম ছিলেন কিদার, যিনি পরে হিজাজ অঞ্চলের রাজা হিসেবে পরিচিত হন। কিছু ঐতিহাসিকের মতে, রাজত্ব আসলে জুরহুম গোত্রের হাতে ছিল, তবে কাবার চাবির দায়িত্ব ছিল ইসমাঈল (আ.)-এর পুত্রদের হাতে।

৩. বিলুপ্ত আরব : এই শ্রেণি সম্পর্কে তথ্য খুবই সীমিত। পবিত্র কোরআনে তাদের মধ্যে কয়েকটি জাতির নাম উল্লেখ আছে, যেমন—‘আদ জাতি, যারা বাস করত আল-আহকাফ অঞ্চলে; সামুদ জাতি, যারা বসতি স্থাপন করেছিল মাদাইন সালেহ (আল-হিজর) অঞ্চলে। তা ছাড়া তাওরাতে (পুরনো নিয়ম) উল্লেখ রয়েছে আমালেক জাতির এবং ইতিহাসে আরো কিছু গোত্রের নাম পাওয়া যায়; যেমন—তাসাম, জাদিস, আমিম, ও জুরহুম। প্রাথমিকভাবে অনেক প্রাচ্যবিদ এই জাতিগুলোকে পৌরাণিক কাহিনি বলে মনে করতেন। তবে পরবর্তী সময়ে যখন প্রত্নতাত্ত্বিকরা উত্তর আরব অঞ্চলে মুসনাদ লিপিতে লেখা সামুদ জাতির শিলালিপি ও ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেন, তখন ওই ধারণা বাতিল হয়ে যায়। সুতরাং বিলুপ্ত আরবরা ছিল প্রাচীন আরব জাতিগুলোর একটি দল, যাদের অস্তিত্ব এখন ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মাধ্যমেই জানা যায়।

(জাওয়াদ আলী, আল মুফাসসাফ ফি তারিখিল আরব কাবলাল ইসলাম, ২/৫-৯)