নিজস্ব প্রতিবেদক:
সীমান্তে নজরদারির অভাবে রাজশাহীতে বেড়েছে মাদকের চোরালান। পদ্মা নদীকেন্দ্রীক সাম্প্রতিক সময়ে মাদক কারবারিরা অনেকটায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। মাদকে গডফাদাররা শ্রমিক ভাড়া করে মাদকের কেনা-বেচায় জোর দিয়েছে বেশি। ফলে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না তাদের দাপট। মাদক বহনকারী শ্রমিকরা মাঝে মাঝেই গ্রেপ্তার হলেও আড়ালে থেকে যাচ্ছে গডফাদাররা। বিগত সরকারের আমলে স্থানীয় এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের আশ্রয়ে-পশ্রয়ে যারা মাদকের কারবারে জড়িত ছিল, তারা অনেকেই আবার এলাকায় ফিরে এসেছে। আবার কেউ দেশের বাইরে থেকেই মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করছে। কেউ আছে জেলে। জেলে বসেও এখনো কেউ মাদকের নিয়ন্ত্রণ করছে বলে একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।
একাধিক গোয়েন্দা সূত্র থেকে জানা গেছে, রাজশাহীতে তালিকাভূক্ত ৪৬ জন পাইকারী মাদক কারবারি আছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জনপ্রতিনিধিও হয়েছেন। তাঁদের অনেকেই এখন পলাতক। তবে তাঁদের অনুসারীরা এখনো দাপটে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে। আর সেই পলাতক মাদককারবারি জনপ্রতিনিধিরা আড়ালে থেকে অনুসারিদের নিয়ন্ত্রণ করছেন। এই গনপ্রতিনিধি ও মাদকের গডফাদারদের একসময় কিছুই ছিল না। এখন তাদের কেউ শত কোটি টাকার মালিক।

এদের মধ্যে রয়েছেন গোদাগাড়ী সাবেক দুই উপজেলা চেয়ারম্যান, তিন থেকে চারজন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, ৬-৭ জন কাউন্সিলর এবং অন্তত ২৫-৩০ জন ওয়ার্ড কাউন্সিলর। রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাড়াী) আসনের সাবেক এমপি ওমর ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধেও মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ছিল। এই এমপি মাদককারবারিদের সরাসরি আশ্রয়-পশ্রয় দিতেন। এমনকি মাদকের গডফাদার এমন অন্তত ১০ জনকে তাঁর মালিকানাধীন রাজশাহী নগরীর থিম ওমর প্লাজায় ফ্লাট ও দোকান কিনতেও বাধ্য করেছিলেন। এর মধ্যে ছিলেন গোদাগাড়ী উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম, ইউপি চেয়ারম্যান সোহেল রানা উল্লেখযোগ্য।
একটি গোয়েন্দা সূত্র মতে, রাজশাহীর যে ৪৬ জন মাদকের গডফাদারের তালিকায় নাম রয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে শীষ মোহাম্মদ, ইটভাটা মালিক তোফাজ্জল হোসেন, বাসের ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম, আমবাগানের ব্যবসায়ী আহমদ আলী, পোল্ট্রি ব্যবসায়ী মেজবাউল, মাছের ব্যবসায়ী ও খামারি সোহেল রানা, গরুর ব্যবসায়ী তারিক আজিজ, আমদানি-রপ্তানীকারক মাসুদ রানা, সাবেক ইউপি সদস্য সেতাবুর রহমান বাবু, তারেক, জরিনা বেগম, নাজমা বেগম প্রমুখ। এদের প্রত্যেকের নামে মামলা রয়েছে। আর মামলার বাইরে রয়েছে আরও অন্তত ১৫ জন শীর্ষ গডফাদার। মূলত মামলার বাইরে থাকা অধিকায়শই জনপ্রতিনিধি। এরা সবচেয়ে বড় মদাক কারবারি।
স্থানীয় একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্রয়ে-পশ্রয়ে থাকা গোদাগাড়ীর মাদকের গডফাদারদের মধ্যে ২০-২৫ জন আবার এলাকায় ফিরে গেছে। আবার কেউ কেউ এখনো পলাতক আছে। যারা এলাকায় ফিরেছে, তাদের মধ্যে রয়েছে মাহবুবুর রহমান, উজ্জল হোসেন, ইব্রাহিম হোসেন, তারেক বাবু, টিপু, আব্দুল মালেক, সোহেল রানা, আসারুল ইসলাম ওরফে রনি প্রমুখ। এরা আবারও নতুন করে মাদকের কারবারে জড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে গোদাগাড়ীর দুর্গম দিয়াড়মানিকচক এলাকার আসারুল ওরফে রনিকে গত ২৫ অক্টোবর ৬৪০ গ্রাম হেরোইনসহ গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। তার সঙ্গে সিরাজগঞ্জ জেলার জাহানারা বেগম (৫০) নামের এক নারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সেউ মাদককারবারি। রাজশাহী নগরীর শিরোইল কলোনি এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
র্যাব এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, জাহানারা বেগম (৫০) সিরাজগঞ্জ জেলার বাসিন্দা হওয়া সে বেশ কয়েকবার ট্রেন ও বাসযোগে রাজশাহীতে এসে হেরোইন সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের নিকট সরবরাহ করে। আসারুলে বাড়ি গোদাগাড়ীর দুর্গম চরে হওয়ায় সে সহজেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্তবর্তী অজ্ঞাত স্থান হতে সংগ্রহ করে পদ্মা নদী পার হয়ে জাহানারা বেগমসহ অনেকের কাছে হেরোইন সাপ্লাই দিত।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, এভাবেই সীমান্ত এলাকা দিয়ে মাদকের গডফাদাররা এখন ব্যাপক হারে মাদকের চোরাচালানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। সীমান্তে নজরদারি কমে যাওয়ার কারণে মূলত এটি বেড়েছে বলেও দাবি করেছেন একাধিক কর্মকর্তা। নজরদারি বাড়াতে এরই মধ্যে গতকাল রবিবার একটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও জানিয়েছেন একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।
এর আগে গত ২৩ অক্টোবর গোদাগাড়ী কুঠিপাড়া গ্রামস্থ কুঠিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে পদ্মা নদীর ধার থেকে ৫০০ গ্রাম হেরোইসনহ দুই মাদককারবারিকে গ্রেপ্তার করে গোদাগাড়ী থানা পুলিশ। তারা হলো, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর থানার বকচর গ্রামের গোলাম মোস্তফা (৪৬) ও আব্দুর রশিদ(৪০)।
গোদাগাড়ীর চর আষাড়িয়াদহ এলাকার বাসিন্দা সুজন আলী বলেন, ‘আগে সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনের প্রায় প্রতিদিন দেখো গেছে। কিন্তু এখন বিজিবি ছাড়া তেমন কাউকে দেখা যায় না। ফলে মাদককারবারিদের ওপর নজরদারি কমেছে বলেই মনে হচ্ছে। এই সুযোগে যেযার মতো আবারও মাদক ব্যবসা চাঙ্গা করছে।
স্থানীয় ওই ইউনিয়নের এক জনপ্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘৫ আগস্টের পরে অনেকেই গা ঢাঁকা দিয়েছিল। তাদের মধ্যে বেশিরইভাগই ফিরে এসে আবারও নতুন নতুন নেতাদের সঙ্গে মিশে গেছে। এলাকায় ফিরে পলাতক ওই মাদককারবারিরা আবারও মাদক ব্যবসাও জোরতালে করছে।’
জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রফিকুল আলম বলেন, ‘পুলিশ তার সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছে। টহলও জোরদার আছে। আমরা এরই মধ্যে বেশকিছু বড় অভিযানও করে মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার করেছি।’
স.আর









