লাইফ স্টাইল

উলটকম্বল : হরেক গুণের আকর

নিউজ ডেস্ক২০ অক্টোবর ২০২৫৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

একদিন কাকডাকা ভোরে প্রকৃতির খোঁজে গিয়েছিলাম মোগরাপাড়ার সোনারগাঁও সরকারি ডিগ্রি কলেজের আঁকাবাঁকা পথ ধরে। যেতে যেতে শাহচিল্লাপুর রাস্তার ধারে গিয়ে পারস্যের কবি হাফিজের বন্ধু গিয়াস উদ্দিন আযম শাহর মাজার শরিফে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করেছিলাম। এর একটু সামনে ভাগলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ঘেঁষা মসজিদের পাশে ওলিয়ে কামেল দ্বিন-দুনিয়ার ইসলাম প্রচারক, যা পাঁচপীরের মাজার নামে বাংলায় ব্যাপক পরিচিত (তাঁদের প্রকৃত নাম জানা যায়নি), এর এক কোণে ঔষধি গুণসমৃদ্ধ উলটকম্বল গাছ কী সুন্দর সাজুগুজুতে দাঁড়িয়ে আছে। প্রীত হলাম, আবেগে আপ্লুতও হলাম।

সেই কবেকার কথা; শতাব্দীর আশির দশকে নিজ বড় ভাই, পানামনগর থেকে বাড়ির উঠানের দক্ষিণ কোণে ঔষধি গুণসমৃদ্ধ বলে, উলটকম্বল গাছ রোপণ করেছিলেন। এই গাছ সম্পর্কে সাহিত্য বা ছন্দের অন্দরমহলে তেমন কোনো তথ্য না পাওয়া গেলেও কবি মাসুদ খান তাঁর ‘স্বপ্নভূভাগ’ কবিতায় লিখেছেন : ‘মায়াপরবশ সেই কুটিরের কথা বলো, সেই একটানা মমতালোকের কথা বলে যাও হে কাপ্তান, যে দেশে নিশুতি রাতে রাধিকাপুরের ঝিয়ারিরা পথ চলে শিস দিয়ে, তুড়ি বাজাতে বাজাতে। আর আশপাশের ঝোপঝাড় থেকে তালে-তালে পাল্টা তুড়ি বাজিয়ে সাড়া দেয়, নবীন উলটকম্বলের চটপটে পাতা ও পল্লব।’

গাঁও-গ্রামে উলটকম্বল ভেষজ ঔষধি গাছ হিসেবে ব্যাপক সমাদৃত।

এটি মালভেসি পরিবারে অ্যাব্রোমা গণের একটি গর্বিত প্রজাতি। দ্বিপদী বা বৈজ্ঞানিক নাম Abroma augusta বা augustum। ‘গণ’ নাম abroma হচ্ছে দুটি গ্রিক শব্দের মিলনের ফসল। গ্রিক শব্দ ‘a’ আর ‘broma’ মিলে তৈরি হয়েছে ‘abroma’।

গ্রিক ভাষায় ‘a’ মানে ‘না’ আর ‘broma’ অর্থ ‘খাবার’। এই যৌগ শব্দ ‘abroma’ বোঝাচ্ছে বিষাক্ত এ উদ্ভিদটির প্রকৃতি। আর ‘প্রজাতি’ নাম augusta অর্থ উঁচু ও রাজসিক। কার্ল লিনিয়াস ১৭৬৭ সালে প্রথম উলটকম্বলের দ্বিপদী নাম Theobroma augusta নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। পরে তিনি নামটিতে সংশোধনী আনেন।

অন্য একটি ব্যাখ্যা মতে, abroma শব্দের শুরুর a (ἀ) বর্ণটি গ্রিক অভাবসূচক উপসর্গ। আর গ্রিক bróma (βρῶμα) অর্থ খাবার, পুষ্টি। খানিকটা বিষাক্ত উদ্ভিদ হওয়ার কারণে এ ধরনের নামকরণ বেছে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ‘প্রজাতি’ নাম লাতিন augusta বা augustum অর্থ সম্ভ্রম উদ্রেককারী, মহান, রাজসিক, উন্নত। এ গাছের আকার আর ফল ধারণের ক্ষমতা দেখে এমন নাম দেওয়া হয়।
প্রাচীনকাল থেকে ভেষজ ওষুধ হিসেবে উলটকম্বলের আলাদা কদর রয়েছে। বিশেষত ভারতীয় আয়ুর্বেদিক শাস্ত্রে গুল্মটির স্থান অনেক ওপরে। বিভিন্ন রোগে উলটকম্বলের মূল, কাণ্ড আর পাতা ব্যবহৃত হচ্ছে। এর বীজে রয়েছে ২০ শতাংশ তেল, যাতে রয়েছে ৭০ শতাংশ লিনোলিক, ১৫ শতাংশ পালমেটিক, ১০ শতাংশ ওলেইক আর ৫ শতাংশ স্টিয়ারিক এসিড। এই গাছে গাছে বিরক্তিকর হুল থাকার পরও এটি মাঝে মাঝে আলংকারিক উদ্ভিদ হিসেবে বাগানে শোভা পায়। কারণ এর ফুল বেশ দৃষ্টিনন্দন ও রাজসিক।

উলটকম্বলকে অনেকে devil’s cotton বলেও চেনেন। কারণ এই গাছের হুল চামড়ায় জ্বালা ধরায়। ঔষধি গাছ হিসেবে পরিচিত এই গাছটি পাওয়া যায় এশিয়ার সর্বত্র। সাধারণত এপ্রিলের শুরুর দিকে এই গাছে ফুল ফোটা শুরু হয়। গাছটি ৮ থেকে ১০ ফুট লম্বা হয়। বেশি মোটা হয় না। গাছের ছালে রেশমের মতো আঁশ থাকে, ফুলের রং মেরুন। ফল পঞ্চকোণবিশিষ্ট লোমাবৃত। কাঁচা অবস্থায় সবুজ এবং পাকলে ধূসর বর্ণের হয়। এর পাতা, গাছ ও মূলের ছাল ঔষধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে যে মেয়েদের অনিয়মিত ঋতুস্রাব হয় অথবা নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে কম পরিমাণ হয়ে থাকে, তাদের ক্ষেত্রে উলটকম্বল একটি পরীক্ষিত ওষুধ। এর মূলের ছাল থেকে এক ধরনের আঠাজাতীয় রস বের হয়, যা গর্ভাশয়ের শক্তি বৃদ্ধি করে। বিশেষ করে বন্ধ্যা রোগীদের ক্ষেত্রে উলটকম্বলের মূলের ছাল ভীষণ উপকারী। পাতা ও কাণ্ডের রস গনোরিয়া রোগেও বিশেষ উপকারী। দীর্ঘদিন থেকে অনিয়মিত ঋতুস্রাব, জরায়ুসংক্রান্ত রোগ, বন্ধ্যাত্ব, ব্যথাসহ বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে এটি কার্যকর বলে জানান ভেষজ বিশেষজ্ঞরা।

উলটকম্বলের আঁশ পূর্ব আফ্রিকায় দড়ি, মাছ ধরার জাল আর হ্যামক (দোলনাসদৃশ বিছানা) তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। আর এশিয়ায় এর আঁশ একই উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হওয়ার পাশাপাশি কাপড় তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়। ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায় এই আঁশ ব্যবহৃত হয় পরচুলা তৈরিতে। ফিলিপিন্সে বেতের বিকল্প ভাবা হয় উলটকম্বলগাছকে। এই গাছের গুঁড়ি দিয়ে সেখানে র‌্যাক, ঝুড়ি ও ট্রে বানানো হয়। ভারত ও নিউ গিনিতে মাঝেসাজে উলটকম্বলের পাতা সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। এর বীজও খাওয়া চলে। এশিয়ায় এই গাছকে বনায়নের কাজে ব্যবহারের সুপারিশ মিলেছে। কারণ উলটকম্বল cogon grass বা কুগুন ঘাস (Imperata cylindrica) দমাতে পারে।

লেখক পরিচিতি : প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক