ধর্ম

সোনালি যুগের বীরাঙ্গনা মুসলিম নারী

নিউজ ডেস্ক২ অক্টোবর ২০২৫৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

মানবসভ্যতার ইতিহাসে নারীকে আমরা কোমলতা, মমতা ও লজ্জাশীলতার প্রতীক হিসেবেই দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু ইসলামের ইতিহাসের পাতা উল্টালে এক ভিন্নতর চিত্রও চোখে পড়ে। এখানে নারী শুধু গৃহকোণ সামলাননি, বরং সংকটময় মুহূর্তে রণাঙ্গনেও পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছেন প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। ঈমানের শক্তিতে সিক্ত হয়ে শত্রুর মোকাবেলা করেছেন।

তারা কখনো মাতৃত্বের স্নিগ্ধ ছায়া হয়ে সমাজকে দিয়েছেন শীতলতা। আবার কখনো যুদ্ধক্ষেত্রে অদম্য যোদ্ধা হয়ে ইতিহাসের পাতায় রেখেছেন পদ চিহ্ন। আসলে ইসলামের ইতিহাস শুধু ত্যাগ-তিতিক্ষার নয়, এটি বীরত্ব, সাহসিকতা ও আত্মমর্যাদারও এক অনন্য ভাণ্ডার।
খেলাফতের যুগে ১৩ হিজরির একটি রক্তগরম অধ্যায় তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বহন করে।

বিশাল মুসলিম বাহিনী ‘আজনাদিন’-এর পথে অগ্রসর হচ্ছে। অগ্রভাগে অজেয় সেনাপতি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)। আর পশ্চাতে রসদপত্র ও নারী-শিশুদের রক্ষায় নিয়োজিত আস্থাভাজন সাহাবি আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রা.)। কয়েক দিন আগেও তারা দামেশকের দুর্গ কিছুকাল অবরোধ করে রেখেছিলেন।

কিন্তু আকস্মিক সংবাদ এলো—আজনাদিনের প্রান্তরে নব্বই হাজার রোমক সৈন্য সমবেত হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে অবরোধ তুলে নেওয়া হলো এবং মুসলিম বাহিনী একত্রিত হয়ে আজনাদিনের দিকে পা বাড়াল।
দুর্গের অন্তরে আবদ্ধ শত্রুরা এই সুযোগ হাতছাড়া করল না। শক্তিশালী মূল বাহিনী সামনে অগ্রসরমাণ, আর নারী ও শিশুদের নিয়ে দুর্বল কাফেলা পিছনে ধীর পায়ে অগ্রসর হচ্ছে। ঠিক তখনই রোম সম্রাট প্রেরিত সহায়ক বাহিনী এসে মুসলিম বাহিবীর পেছনে আক্রমণ চালাল।

মুহূর্তেই মুসলিম নারীরা ও শিশুরা বন্দি হয়ে গেল। রোম বাহিনী তাদের দুর্গের দিকে টেনেহিঁচড়ে নিতে লাগল। হতবিহ্বল নারী-শিশুর হৃদয় ভয়ে কাঁপছিল, বুকের ভেতর যেন মৃত্যু ও লাঞ্ছনার ছায়া ঘনিয়ে এলো।
এমন সময়ে বজ্রনিনাদি কণ্ঠে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন খাওলা বিনতে আজওয়ার (রা.)। তিনি সঙ্গিনী নারীদের উদ্দেশে উচ্চারণ করলেন: “হে বোনেরা! তোমরা কি কাফেরদের হাতে বন্দি হতে প্রস্তুত? তোমরা কি ইসলামের কীর্তিকে কলঙ্কিত করবে? কাফিরদের হাতে নিজেদের সোপর্দ করার চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয় নয় কি? ”

খাওলার আহ্বান যেন অন্ধকারে এক বজ্রঝলক হয়ে সকল নারীদের মধ্যে ছড়িয়ে গেল। ভীত প্রাণগুলোতে সাহসের শিখা প্রজ্বলিত হলো। নারীদের রক্তে বইতে লাগল টগবগে নতুন স্রোত। খাওলা এগিয়ে গেলেন, সঙ্গে উম্মে আবান বিনতে উতবা, সালামা বিনতে নু‘মান এবং আরও কয়েকজন। তাদের হাতে ধারালো অস্ত্র ছিল না, তবু তারা তাবুর খুঁটি কাঁধে তুলে নিয়ে শত্রুর দিকে ক্ষিপ্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।

অপ্রস্তুত শত্রুরা প্রথমে হতভম্ব হয়ে গেল। মুহূর্তেই তাদের ত্রিশ যোদ্ধা লাস হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। মুসলিম নারীদের অগ্নিশিখার মতো আক্রমণে শত্রুর সারি ভেঙে গেল। শত্রুরা পাল্টা আঘাত হানলেও মুসলিম নারীরা পিছু হটলেন না। বুকের ভেতর নিজেদের সম্ভ্রম আর সন্তানদের রক্ষা করার আগুন, আত্মমর্যাদার শপথ এবং ঈমানের জোয়ার তাদের অদম্য করে তুলল।

এদিকে সামনে অগ্রসরমান মুসলিম বাহিনী যখন পশ্চাতে ফিরে নারীদের রক্তে-রঞ্জিত বীরত্বের দৃশ্য দেখল। তখন তারাও মুহুর্তকাল বিলম্ব না করে বীরবিক্রমে নারীদের সহযোগিতায় এগিয়ে এলো। মূল বাহিনী যুক্ত হতেই ফলাফল আর দেরি হলো না; শত্রুরা সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হলো। সে যুদ্ধে মুসলিম নারীরা শুধু নিজেদের বন্দিত্ব থেকে মুক্তই করেনি, বরং ইসলামের ইতিহাসে রচনা করলেন এমন এক অধ্যায়, যা আজও সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে আছে। (আল-কামিল ফি আত-তারিখ লি ইবনুল আসির, বৈরুত থেকে ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৭৪–৩৭৬; উসুদুল গাবাহ ফি মারিফাতিস সাহাবাহ লি ইবনুল আসীর, দারুল ফিকর বৈরুত থেকে ১৪০৯ হিজরিতে প্রকাশিত, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৩১–১৩৩)

খাওলা বিনতে আজওয়ার (রা.)-এর এই বীরত্ব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—নারী মানেই দুর্বলতা নয়; বরং প্রয়োজনের সময় বিশ্বাস ও দৃঢ়তায় তারাও পুরুষের সমান কাতারে দাঁড়াতে পারেন।

আজকের মুসলিম নারীসমাজের আধুনিক বোনেরা! আপনারাও শিক্ষা, কর্ম, সমাজ ও মানবতার প্রতিটি অঙ্গনে ইসলামের সাহসী নারীদের উত্তরসূরি। আপনাদের হাতে রয়েছে নতুন প্রজন্মের গঠন, সমাজে সত্য ও ন্যায়ের পতাকা উত্তোলন, আর নৈতিকতার পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিরাট দায়িত্ব। আপনাদের হৃদয়েও যদি খাওলার মতো ঈমানের দীপ্তি প্রজ্বলিত হয়, সকল অন্যায় আর অনাচারের বিপক্ষে মুষ্ঠিবদ্ধ হয় আপনার ইস্পাত কঠিন হাত। তবে দুনিয়ার কোনো শক্তিই আপনাদের পথ রুদ্ধ করতে পারবে না। আপনারাই হয়ে উঠবেন মায়ের স্নেহস্নিগ্ধ বিতরণকারিণী, আবার সত্য ও ন্যায়ের পক্ষের অদম্য সৈনিক। এ দুইয়ের সমন্বয়েই গড়ে উঠবে নতুন মানবসভ্যতার স্বপ্নময় ভোর।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে সত্য ও সঠিক পথকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার তাওফিক দান করুন।

লেখক : প্রবন্ধিক ও অনুবাদক
saifpas352@gmail.com