ধর্ম

পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে মুসলিম বিশ্বের করণীয়

নিউজ ডেস্ক১১ আগস্ট ২০২৫৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

আন্তর্জাতিক মুসলিম ইউনিয়নের পরিবারবিষয়ক কমিটির সভাপতি ড. ক্যামেলিয়া হেলমি তাঁর বক্তব্যে বিশ্বায়নের যুগে পরিবারের ওপর আসন্ন বিপদের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক কাঠামো ও নৈতিক মূল্যবোধকে দুর্বল করে দেওয়ার জন্য বহু আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সম্মেলনের মাধ্যমে পরিবারকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। এসব উদ্যোগের আড়ালে একটি সুসংগঠিত প্রচেষ্টা কাজ করছে, যা মানবসভ্যতার অন্যতম ভিত্তি পরিবারকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি এই ইস্যুকে পাঁচটি ভাগে বিভক্ত করে বিশ্লেষণ করেন।

প্রথম ভাগে তিনি জোর দেন এই প্রশ্নে : ‘জাতিসংঘ কেন পরিবারকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে?’ 

ড. ক্যামেলিয়ার ব্যাখ্যায় উঠে আসে, যে কারণে পশ্চিমা বিশ্ব কৌশলগতভাবে পরিবারকাঠামোকে ভেঙে দিতে চায়। এর পেছনে আছে দুটি প্রধান কারণ—

১. শিক্ষামূলক ভূমিকা : তিনি উল্লেখ করেন, ইতিহাসে পরিবার সব সময় পরিচয় রক্ষা ও দখলদারির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের এক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করেছে। উদাহরণস্বরূপ অতীতে আলজেরিয়া এবং বর্তমানে ফিলিস্তিনে পরিবারের এই ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পরিবারই ছিল শিশুদের মধ্যে জাতীয় ও ধর্মীয় চেতনাবোধ জাগ্রত করার প্রধান মাধ্যম।

২. জনসংখ্যাভিত্তিক ভূমিকা : ড. হেলমির মতে, ইসলামী বিশ্বে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পশ্চিমা বিশ্বের জন্য এক ধরনের হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যেখানে পশ্চিমা দেশগুলো জনসংখ্যার পতন ও বার্ধক্যজনিত সংকটে ভুগছে, সেখানে মুসলিম সমাজে তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের শক্তিশালী প্রজন্ম গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি সতর্ক করেন, এই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে, ফলে পরিবারকে দুর্বল করার নানা প্রস্তাব ও চুক্তির আড়ালে এজেন্ডা বাস্তবায়নের অপচেষ্টা চলছে।

দ্বিতীয় ভাগে তিনি দাবি করেন, আধুনিক বিশ্ব প্রতিষ্ঠানের শিকড় উপড়ে ফেলতে মূলত দুটি সমান্তরাল পথ অনুসরণ করছে—

১. নতুন পরিবার গঠনে বাধা সৃষ্টি : আন্তর্জাতিক চুক্তি ও নীতিমালার মাধ্যমে বিয়ের মতো পবিত্র বন্ধনকে দিন দিন জটিল ও নিরুৎসাহ করে তোলা হচ্ছে, বিশেষ করে বাল্যবিবাহকে সীমাবদ্ধ করার নামে এমন কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যা অনেক দেশে সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

২. বিদ্যমান পরিবারকাঠামোকে ভেঙে ফেলা : বর্তমান পরিবারগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। পুরুষ অভিভাবকত্ব ও পিতৃত্বের স্বাভাবিক অবস্থানকে বিতর্কিত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ধর্মীয় ও প্রকৃতিগত পার্থক্যের প্রতি শ্রদ্ধা না রেখে, নারী-পুরুষের মধ্যে জোরপূর্বক সমতা আরোপ করার মাধ্যমে পারিবারিক ভারসাম্যকে ধ্বংস করা হচ্ছে।

তৃতীয় ভাগে তিনি সতর্ক করে বলেন, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কিছু শব্দ ও পরিভাষা ব্যবহার করছে, যেগুলো শুনতে করুণাপূর্ণ ও মানবিক মনে হলেও বাস্তবে এগুলো সমাজ ও পরিবারের জন্য ধংসাত্মক, এসব শব্দের আড়ালে পারিবারিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে ধ্বংস করার সূক্ষ্ম কিন্তু সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা চলছে। যেমন লিঙ্গ (বেহফবৎ): যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য, ‘সিঙ্গল মাদার’ ইত্যাদি।

চতুর্থ ভাগে তিনি বেশ কিছু বাস্তবসম্মত প্রভাব তুলে ধরেন, যেগুলো পরিবারবিরোধী এজেন্ডার ফলস্বরূপ সমাজে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে যেমন—বিবাহবিচ্ছেদের হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বিয়ের প্রতি অনীহা দেখা দিচ্ছে, অবৈধ ও অনৈতিক সম্পর্কের বিস্তার ঘটছে, অজানা পিতা-মাতার সন্তান পরিবারবহির্ভূত সম্পর্ক থেকে জন্ম নেওয়া শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে, সমকামিতার মতো বিকৃত যৌনাচার সামাজিক স্বীকৃতি পাচ্ছে ও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পঞ্চম ভাগে ড. ক্যামেলিয়া হেলমি তাঁর বক্তৃতার শেষাংশে এই সংকট মোকাবেলায় মুসলিম সমাজকে আরো সচেতন, সংগঠিত ও সক্রিয় হওয়ার আহবান জানান। তিনি তিনটি মূল করণীয় তুলে ধরেন—

১. সচেতনতা ও পর্যবেক্ষণ : মিডিয়া, শিক্ষা পাঠ্যক্রম ও আইনগুলোর মধ্যে যে ধ্বংসাত্মক এজেন্ডা লুকিয়ে আছে, সেগুলো চিহ্নিত করা এবং জনসাধারণের সামনে তাদের আসল রূপ উন্মোচন করা।

২. রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ : সরকারগুলোকে নারী ও শিশু সম্পর্কিত সন্দেহজনক আন্তর্জাতিক চুক্তি ও প্রস্তাব থেকে সরিয়ে আনতে রাজনৈতিক ও নাগরিক পর্যায়ে চাপ সৃষ্টি করা।

৩. সম্প্রদায়কে প্রস্তুত করা : এই সাংস্কৃতিক সংঘাতের ফলে যে সামাজিক ও পারিবারিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে, তা মোকাবেলার জন্য মুসলিম সমাজকে মানসিক, নৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুত করা। ড. হেলমির মতে, ‘পরিবার রক্ষা মানেই সভ্যতা রক্ষা। আর পরিবারকে রক্ষার লড়াইয়ে এখন আর চুপ করে থাকার সময় নেই।’

সূত্র : আল-ইত্তিহাদ ও আন্তর্জাতিক মুসলিম ইউনিয়নের ওয়েবসাইট

আরবি থেকে ভাষান্তর করেছেন ওমর বিন নাসির