রাজশাহীর খবর

রাওধাহীন নিস্তব্ধ পড়ে আছে আমগাছের দোলনা দুটি

নিউজ ডেস্ক৩১ মার্চ ২০১৭৭ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহী নগরীর নওদাপাড়া এলাকায় অবস্থিত ইসলামী ব্যাংক মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। মেডিক্যাল কলেজের পাশেই পুকুর পাড়ে রয়েছে সাত তলা ছাত্রী হোস্টেল। প্রাচীর ঘেরা এই হোস্টেলের ভিতরে বেড়ে ওঠা একটি আমগাছের ডালে ঝুলছিল পাশাপাশি দুটি দোলনা। কিন্তু সেগুলো যেন নিস্তব্ধ হয়ে আছে। যেন কারো অপেক্ষার প্রহর গুনছে দোলনা দুটি। কেউ এসে যেন সেখানে চড়বে। আর তাতেই দুলিয়ে দুলিয়ে নড়বে-চড়বে দোলনা দুটি। পাশাপাশি দুটি ডালে প্লাস্টিকের দড়ি আর স্টিক দিয়ে তৈরী করা হয়েছে দোলনা দুটি।

 

দোলনা থেকে মাত্র হাত কয়েক দূরেই ছাত্রী হোস্টেলের ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে ছাত্রীদের অবস্থান করতেও দেখা যাচ্ছে। কিন্তু কেউ এসে বসছে না দোলনা দুটিতে। বসবে কি করে, যে দুই শিক্ষার্থী দোলনা দুটি টাঙিয়েছিলেন-তাঁদের একজন তো আর নাই। আরেকজন আছেন, কিন্তু তিনিও তার বান্ধবীকে হারিয়ে এখন বিমর্ষ। বলছিলাম আন্তজার্তিক মডেল কন্যা ও রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক মেডিক্যাল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী রাওধা আতিফের কথা। যিনি গত বুধবার আত্মহত্যা কেরে না ফেরার দেশে চলে গেছেন।


রাওধা তার আরেক পাশের রুমমেট আয়েশা নাজা ফায়েজকে সঙ্গে নিয়ে হোস্টেলের সামনে ওই আমগাছটিতে টাঙিয়েছিলেন পাশাপাশি দুটি দোলনা। কিন্তু তাঁদের মধ্যে রাওধা এখন আর নাই। গত বুধবার সকাল সাড়ে ১১ টার দিকে ওই হোস্টেলের দোতলার ২০৯ নম্বর কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয় আন্তজার্তিক খ্যাতিসম্পন্ন মডেল এবং ওই কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাওধা আতিফের ঝুলন্ত লাশ। আর তারপর থেকেই যেন নিস্তব্ধ হয়ে আছে দোলনা দুটি। সঙ্গে নিস্তবদ্ধ হয়ে হয়ে আছে গোটা হোস্টেলটি।

 

পাশাপাশি গোটা কলেজেই নেমে এসেছে শোকের ছায়া। কিন্তু কেন রাওধার এই অকাল চলে যাওয়া, কেন আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গতকাল দিনভর তাঁর সহপাঠিসহ কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে রাওধা সম্পর্কে নানা তথ্য। কিন্তু তাঁদেরই কেউই হিসেব মেলাতে পারেননি রাওধার এই চলে যাওয়ার পেছনের কারণ নিয়ে। তাঁদের সকলের মনেও একটাই প্রশ্ন-এমন ভালো প্রাণবন্ত, উচ্ছ্ল ও হাসি-খুশি ভরা মেয়েটি কেন আত্মহত্যা করবে? কেন এমন ভুল সিদ্ধান্তের দিকে পা বাড়ালেন তিনি?

 
রাওধাকে অনেকটা কাছ থেকে দেখেছেন রাজশাহী ইসলামি ব্যাংক মেডিক্যাল কলেজের ৫ম বর্ষের ছাত্রী ও পাশের ২০৮ নম্বর কক্ষের শিক্ষার্থী আয়েশা নাজা ফায়াজ।

 
নাজার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আয়েশা বলছিলেন, ‘খুব বেশিদিনের পরিচয় নয়। গত কিন্তু এই সময়ের মধ্যে যতটুকু মিশেছি-তাতে ওকে (রাওধা) খুব আপনই মনে হয়েছে। দুজনে একসঙ্গে আনন্দ করার জন্য আমগাছের ডালে দোলা টাঙ্গিয়ে ছিলাম। কিন্তু সেটি এখন শুধুই ঝুলে আছে। ওখানে আর দুজনের একসঙ্গে বসে মজা করা হবে না। আড্ডা দেওয়া হবে না। এখন এসব শুধুই স্মৃতি।’ কথাগুলো বলছিলেন কথাগুলো যখন আয়েশা বলছিলেন, তখন তার দুচোখ বয়ে গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রু। পড়া-শোনার দিক দিয়ে রাওধার চেয়ে আয়েশা প্রায় চার বছরের জেষ্ঠ্য। কিন্তু পরিচয় সূত্রের কারণে অনেকটা দুজন-দুজনকে আপন করে নিয়েছিলেন। তাই বুধবার রাওধা আত্মহত্যার পরে অনেক বিমর্ষ হয়ে পড়েছেন আয়েশা।


গতকাল দুপুরে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, শুধু তিনিই নন, রাওধার চলে যাওয়ার পরে গোটা কলেজজুড়েই নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আর তিনি যে হোস্টেলে থাকতেন সাত তলার ওই ছাত্রী হোস্টেলের গোটা ভবনজুড়েই নেমে এসেছে শুনশান নিরবতা। একদিন আগের সকালেও যে হোস্টেলটিতে অবস্থানকারী দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর পদচারণায় এবং কথা-বার্তায় প্রাণের উচ্ছ্বাস ছুয়ে যেত, বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার পর থেকে সেটিতে কেবলই নেমে এসেছে যেন নিরবতা। রাওধা শোকে বিহব্বল সহপাঠিরা কেউ কোনো কথাও বলতে চাইছেন না। তব্ওু অনেক কষ্টে কলেজ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে রাজি করানো হয় রাওধার পাশের রুমের রুমমেট আয়েশা নাজা ফায়াজকে।

 


তিনি গতকাল দুপুরে আরো কয়েকটি গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে রাওধার গুনাবলি সম্পর্কে কিছু তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘রাওধা ছিলেন অনেক ভালো, উচ্ছ্ল, চঞ্চল হাসি-খুশি ভরা একটা মেয়ে। সবার সঙ্গে হেঁসে হেঁসে কথা বলতো। দেখা হলেই হাই নাজা বলে সমন্ধন করতো। এরকম একটি মেয়ে আত্মহত্যা করবে কখনোই বুঝে উঠতে পারিনি।’

নাজা বলেন, ‘এতা সেলিব্রেটি একজন মডেল হলেও তার চলাফেরাও কখনো অমালিনতা ছিল বলে দেখিনি। পোশাও ছিল শালিনতার মধ্যেই। কখনো স্কার্ফও পরত। ক্লাশে পরীক্ষায় এপ্রোন পরেই আসতো। সবকিছুই তো ঠিক ছিল। তাহলে কেন এমনটা হলো কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।’

 
আত্মহত্যা সঠিক সিদ্ধান্ত নয়, ইসলাম এটাকে সাপোর্ট করে না, তবু কেন রাওধা এমনটি করলো ভাবতে পারছি না। আত্মহত্যার আগের দিন রাতেও তার ল্যাপটপে সমস্যা হয়েছে বলে আমার কক্ষে এসেছিল। আমি তাকে বলেছিলাম আমার ল্যাপটপেও চার্জ নাই। এরপর সে তার কক্ষে চলে যায়। তারপর আর তার সঙ্গে দেখা হয়নি। শেষে দেখা হলো, পরের দিন সকালে (বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে) যখন আত্মহত্যা করে লাশ পড়েছিল কক্ষের বিছানায় তখন।’

 
রাওধার সঙ্গে স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে নাজা বলেন, ‘গত জানুয়ারি মাসের দিকে পরিচয় হয় আমার তার সঙ্গে। আমি ৫ বর্ষের আর সে দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হলেও পরিচয় হওয়ার পর থেকে দুজনের মধ্যে আমাদের খুব চমৎকার একটি সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। নাজা সাধারণ লবন খেতে তেম পছন্দ করত না। আমি তাকে লবন খেতে বলতাম। সে পরিবর্তে বিট লবন চাইতো। আমরা খুব মজা করতাম। কিন্তু এখন পাশের কক্ষটি পড়ে আছে ফাঁকা। ওদিকে তাকাতেই পারছি না। তাকালেই চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। খুব কষ্ট পাচ্ছি। এভাবে আমাদের ছেড়ে রাওধা কেন চলে গেল বুঝতে পারছি না। সে অধিকাংশ সময় কক্ষে একাই থাকতো। কক্ষ থেকে তেমন বের হত না। তবে সবার সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক ছিল। কারো সঙ্গে খারাপ সম্পর্ক ছিল বলে জানা নাই। ফলে কেন আত্মহত্যা করতে পারে-এটা ভেবেই পাচ্ছি না।’

  • এদিকে জানা গেছে, রাওধা রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক মেডিক্যাল কলেজে পড়া-শোনার পাশাপাশি রাজশাহী নগরীতে বসবাসকারী যুক্তরাষ্ট্রের জন থর্প নামের এক পিয়ানো বাদকের কাছে পিয়ানো বাজানোও শিখত। পাশাপাশি বাংলাও শিখতেন রাওধা। গত জানুয়ারি মাস থেকে সপ্তাহে একদিন জন থর্পের কাছে পিয়ানো বাজানো শিখতেন রাওধা। জানতে চাইলে থর্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘সে কেন এমনটা করলো ভাবা যায় না। অনেকটা প্রাণবন্ত এক মেয়ে ছিল রাওধা। তাহলে আত্মহত্যা কেন করলো-তা মাথায় আসছে না।’

এদিকে রাজশাহী ইসলামি ব্যাংক মেডিক্যাল কলেজের সচিব আব্দুল আজিজ রিয়াদ সাংবাদিকদের জানান, রাওধা সবার সঙ্গে হাসি-খুশি মন নিয়ে কথা বলত। কারো সঙ্গে তার খারাপ সম্পর্ক ছিল বলে জানা নেই। কলেজের ক্লাশ-পরীক্ষাতেও ছিল তার সমান অংশগ্রহণ। তবে মাঝে গত বছরের ৩০ অক্টোবর থেকে ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ছুটি নিয় তার বাবার সঙ্গে ইন্ডিয়ায় দেখা করতে গিয়েছিলেন তিনি। তার কক্ষের আসবাবপত্রগুলোও তিনি সাজিয়েছিলেন নিজের মতো করে। কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই তিনি এসব করেছিলেন।

 

  • আব্দুল আজিজ রিয়াদ বলেন, একজন খ্যাতিমান মডেল হলেও কলেজে চলাফেরা ছিল তার শৃঙ্খলায় ভরা। কাজেই তার আত্মহত্যার কোনো কারণ কলেজ কর্তৃপক্ষ খুঁজে পাচ্ছে না। তবুও বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ৪ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটি পুলিশের পাশাপাশি নিজস্বভাবে তদন্ত করে দেখতে কেন রাওধা আত্মহত্যার পথ বেছে নিল।

অন্যদিকে রাওধার মৃত্যুতে গতকাল সব ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রেখে কলেজে শোক পালন করা হয় বলেও জানান ওই কর্মকর্তা। এতে কলেজের সকল শিক্ষার্থী অংশ নেন। তারা কেউই রাওধার আত্মহত্যার পেছনে কোনো তথ্য তুলে ধরতে পারেনি। সকলেরই একই প্রশ্ন ছিল, এতো ভালো একটি মেয়ে কেন আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নিল?

 
অপরদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে রাওধার লাশ নিতে এবং তাঁর আত্মহত্যার পেছনে খোঁজ-খবর নিতে বিমানযোগে রাজশাহীতে এসে পৌঁছেন মালদ্বীপের রাষ্ট্রদূত আয়েশাথ শান শাকির এবং কমনওয়েলথের দ্বিতীয় সেক্রেটারি ইসমাইল মুফিদ। বিকেল পৌনে চারটার দিকে তাঁরা রাজশাহীতে এসে প্রথমে ইসলামী ব্যাংক মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যান। এসময় তাঁরা কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন। পরে সেখান থেকে তাঁরা রাজশাহী সার্কিট হাউজে গিয়ে ওঠেন।  


অপরদিকে ইন্ডিয়ায় বসবাসকারী চিকিৎসক বাবা মোহাম্মদ আতিফ ও আমিনাথ মুহারমিমাথসহ পরিবারের লোকজন ঢাকা থেকে বিকেলে মাইক্রোযোগে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওনা দেন মেয়ের লাশ গ্রহণ করতে। রাতে তাঁরা রাজশাহী এসে পৌঁছেন। আজ সকালে রাওধার লাশ দেখতে রামেক মর্গে যাওয়ার কথা রয়েছে।

 

  • রাজশাহীর শাহ মখদুম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিল্লুর রহমান জানান, ঘটনার পারিপাশির্^পকতা দেখে এখন পর্যন্ত এটিকেই আত্মহত্যা বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে। তবে আন্তজার্তিক খ্যাতিসম্পন্ন রাওধা আতিফ কেন আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নিল, এর সঙ্গে কারা জড়িত থাকতে পারে-সেটি খতিয়ে দেখতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। তার ল্যাপট, মোবাইল থেকেও বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কারণ আমরা খুঁজে পাইনি।

প্রসঙ্গত, বিখ্যাত সাময়িকী ‘ভোগ ইন্ডিয়া’ গত বছর তাদের নবম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সংখ্যায় এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মডেলদের নিয়ে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করেছিল। এতে ‘বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য উদ্যাপন’ (সেলিব্রেটিং বিউটি ইন ডাইভার্সিটি) শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছিলেন মালদ্বীপের নীল চোখ খ্যাত সুন্দরি রাওধা আতিফ। ভোগ ইন্ডিয় কে দেওয়া সাক্ষাতকারে রাওধা বলেছিলেন, মডেল আমার পেমা নয়, নেশা। আমি পড়া-শোনা করে ভবিশ্যতে চিকিৎসক হতে চাই। আর সে জন্যই মালদ্বীপ থেকে রাজশাহীতে পাড়ি জমান মডেল রাওধা।

স/আর