নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজশাহীর তানোর থানার সামনে থেকে এক যুবককে ধরে নিয়ে গিয়ে মাদক তল্লাশির নামে মারধর করা হয়েছে বলে কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও ওই যুবকের নিকট থেকে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়েরও চেষ্টা করেন সেই সাংবিাদিকরা। এ নিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে মারধরের শিকার সজল আলী (৩০ নামের ওই যুবক থানায় কোনো অভিযোগ করেননি। তিনি পেশায় একজন মোটরসাইকেল মেকানিক। বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শিবনগর গ্রামে।
যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তারা সকলেই তানোরের সাংবাদিক নামে পরিচিত। তাদের মধ্যে অন্তত আটজন সাংবাদিক ওই ঘটনার সঙ্গে সারসরি জড়িত ছিলেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়াও তাদের সঙ্গে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) তানোর জোনের একজন মেকানিক, উপজেলা সদরের একজন মুদি দোকানি এবং ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) একজন সদস্যও জড়িত ছিলেন। তাদের কাউকে গ্রেপ্তার করেনি পুলিশ।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার দুপুরে শিবগঞ্জ থেকে আসা সজল আলী মোটরসাইকেল নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমনূরা দিয়ে মুণ্ডুমালা-তানোর সড়কে ঢোকেন। তাঁর গন্তব্য ছিল নাটোরের নলডাঙ্গায় বোনের বাড়ি। মুণ্ডুমালা আসার পরে বিএমডিএর ওই কর্মচারীর সঙ্গে তার পেট্রোল পাম্পে তেল নিতে গিয়ে দেখা হয়। সজল তার কাছে নলডাঙ্গা যাওয়ার সহজ রাস্তা কোনটি তা জানতে চান। ওই কর্মচারী তখন তাকে তার পেছন পেছন আসতে বলেন। তার কথামতো সজল ওই ব্যক্তির মোটরসাইকেলের পেছন পেছন আসতে থাকেন।
বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তানোর থানার সামনে পৌঁছালে ওই মেকানিক তাকে থামান। এরপর তিনি এবং চার সাংবাদিক তাকে আটকান। তারা বলেন, সজলের কাছে মাদকদ্রব্য আছে। তারা পুলিশের লোক। তাকে তল্লাশি করতে হবে। এরপর তানোর থানার সামনে থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে উপজেলা পরিষদের কাছে তাকে একটি প্রেসক্লাবে নেওয়া হয়।
সেখানে ব্যাগ তল্লাশি করে সজলের কাছে একটি কাঁঠাল, কিছু আম এবং কিছু যবের ছাতু পাওয়া যায়। এই ছাতুকেই হেরোইন বলে ধরে নিয়ে তাকে থানায় নেওয়ার ভয় দেখান। এরপর থানায় নেওয়ার নামে তাকে আরও প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে মালার মোড় এলাকায় একটি স্কুলে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে মোটা অংকের মুক্তিপণ দাবি করা হয়। এ পর্যায়ে যোগ দেন আরও চারজন সাংবাদিক। সজল তাদের টাকা দিতে না চাইলে শুরু হয় মারধর। এ সময় স্থানীয় লোকজন তার চিৎকার শুনে এগিয়ে যান।
তারা পরিচয় জানতে চাইলে অভিযুক্তরা নিজেদের সাংবাদিক বলে পরিচয় দেন। এ সময় স্থানীয়রা তাদের জানান, সাংবাদিকদের তো এভাবে তল্লাশি ও মারধর করার সুযোগ নেই। পরে তারা সবাইকে ঘেরাও করে রেখে থানায় খবর দেন। সন্ধ্যার দিকে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, এ সময় ক্ষুব্ধ লোকজন সাংবাদিকদের ধাওয়া দেন। ধাওয়া খেয়ে ওই সাংবাদিকরা দিকবিদিক দৌড়ে পালিয়ে যান। থানায় নেওয়ার পর পুলিশ দেখতে পায়, ওই যুবকের কাছে ছিল ছাতু। এগুলো হেরোইন নয়। পরে মধ্যরাতে সজলকে তার মামা হোসাইন আলীর জিম্মায় দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার দুপুরে ভুক্তভোগী সজলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, শারীরিকভাবে তিনি ভীষণ অসুস্থ। মারধরের কারণে সারাশরীরে ব্যাথা। তিনি কথা বলতে পারবেন না। তিনি তাঁর একজন মামার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। ওই মামার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এভাবে থানার সামনে থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া অপহরণ। অপহরণ করে তার কাছে মুক্তিপণও দাবি করা হয়েছে। এ নিয়ে পুলিশ কোন মামলা না করে ঘটনাটি ধামাচাপা দিয়েছে। কারণ, অভিযুক্তদের বেশিরভাগই স্থানীয় পর্যায়ের সাংবাদিক।’
তানোর থানার ওসি আফজাল হোসেন বলেন, ‘আমাকে জিজ্ঞেস করছেন কেন? আপনাদের সাংবাদিকরাই ঘটনা ঘটিয়েছে। তাদেরকেই জিজ্ঞেস করুন।’ কোন কোন সাংবাদিক এমন ঘটনা ঘটিয়েছেন জানতে চাইলে ওসি একটি প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতিসহ কয়েকজনের নাম জানান। আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে ওসি বলেন, ‘যিনি ভুক্তভোগী তিনি কিংবা তার স্বজনেরা মামলা করতে চাননি। এখনও তারা চাইলে আমরা মামলা নেব।’









