সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার পয়লা ইউনিয়নে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থদের ত্রাণ নিয়ে তালবাহানা চলছে। অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় চেয়ারম্যান প্রকোশলী হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে। এমন পরিস্থিতিতে ত্রাণের ওই বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের পাশাপাশি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের অনেকেই।

বৃ্হস্পতিবার রাত ৯ টার দিকে ঘিওর আদর্শ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে সরেজমিনে এমনটাই বলেন উপজেলা চেয়ারম্যান খন্দকার লিয়াকত হোসেন।
বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে মানিকগঞ্জের ছয়টি উপজেলার দুই লাখেরও বেশি মানুষ। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওই সব এলাকায় আশ্রয়স্থল ছাড়াও নিয়মিতভাবেই বরাদ্ধ দেওয়া হচ্ছে ত্রাণ সামগ্রী। তবে এতো কিছুর পরেও ত্রাণ থেকে শুরু করে সকল প্রকারের সাহায্য থেকে বঞ্চিত রয়েছেন ওই উপজেলার পয়লা ইউনিয়নের কমপক্ষে ২০ হাজার পানিবন্দি মানুষ।
জমি জমার ফসলের কি খবর সেই বিষয়টি জানতে চাইলে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন ওই এলাকার মৃত হলাই শেখের ছেলে ফজল শেখ। এর কিচ্ছুক্ষণ পর তিনি বলেন, জীবনের তাগিদে ওই বৃদ্ধ বয়সে তিন বিঘা জমিতে পাট আর আমন ধানের আবাদ করেছিলেন। কিন্তু গত দুই সপ্তাহের পানিতে তার সব শেষ হয়ে গেছে।
এদিকে ত্রান দেওয়া তো দুরের কথা বন্যায় ক্ষতিগ্র্রস্ত কোন পরিবারে গিয়ে সরেজমিনে কোন প্রকারের খোঁজ খবরও নেওয়া হয়নি বলে অকপটেই বাংলানিউজকে জানান চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ।
এতে করে বন্যা কবলিত ওই এলাকার মানুষের মাঝে চরম ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে হতাশা। বিষয়টি নিয়ে সংবাদ কর্মীদের নিকট ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি ওই ঘটনায় নিন্দা প্রকাশ করেন সরকারদলীয় স্থানীয় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
তবে যে কোন প্রকারের ঝক্কি ঝামেলা ছাড়াই খুব অল্প সময়ের মধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ওই মানুষগুলোর মাঝে ত্রানসহ যে কোন প্রকারের সাহায্য সহযোগিতা বহাল রাখার দাবি জানান এলাকাবাসী।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ( ইউএনও) মাহবুবা আইরিন জানান, ইতিমধ্যে ওই এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ৪ টন ত্রানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যার কথা বিবেচনা করে ত্রাণের পরিমান বাড়তে পাড়ে বলেও জানান তিনি।
পাঁচ দিন পর একমুঠো খিচুরীর অপেক্ষা এদিকে মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর আর্দশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে খোলা হয়েছে অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্র। কেন্দ্রটিতে দেখা গেল প্রায় দুইশতাধিক লোকের অবস্থান।
বৃহস্পতিবার(০৪ আগষ্ট)রাতে আশ্রয় কেন্দ্রটি সরজমিনে পরিদর্শন করে দেখা গেল এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যে। এখানে সকলে আশ্রয়তো তারা পেয়েছেন কিন্তু নেই কোন খাবার ব্যাবস্থা।
কথা হলো আশি বছর বয়সি সফি শেখের সাথে। তিনি বলেন, পাঁচ দিন যাবৎ আমি আমার পরিবার পরিজন নিয়ে আছি এখানে। এখন পর্যন্ত আমাগো কোন খাবার কেউ দেয় নাই। বড় বিপদে আছি আমরা । চেয়ারম্যান, মেম্বার, ইউ এন ও আনেকে একটি বারের জন্য হয়তো দেখতে এসেছেন কিন্তু কেউ দেননি কোন খাবার।

সেরাজুল, হারান শেখ, নাজমা বেগমের মতো ৫০টিরও বেশি পরিবার এখানে রয়েছে। বৃহস্পতিবার তাদের সাথে নতুন যুক্ত হয়েছে তিনটি পরিবার। কেউই পায়নি কোন খাবার। গভীর ক্ষোভ আর দূঃখ ভরা কন্ঠে তুলে ধরেন তাদের হাহাকারের কথা। এমনকি এতোটুকু শুকনো খাবার পর্যন্ত হাতে তুলে দেয়নি কেউ।
কেউ বা ধার কর্জ করে আবার কেউবা মানুষের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে মিটিয়ে নিচ্ছে তাদের ক্ষুধা। কিন্তু এভাবে আর কতো দিন? হাতে কোন কাজ নেই, পেটে নেই খাবার। বাড়ি-ঘর সব পানির নিচে। চিন্তায় রাতের ঘুম পর্যন্ত হয়েছে হারাম।
আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থানরত নাজমা বেগম বলেন, এতোদিন পর আজ ছোট্ট একটি ড্যাকে খিচুরী রান্না করছে। পাঁচদিন পর যেন সবাই পেল আমাবশ্যার চাঁদ। সামান্য এই খাবার সংগ্রহ করার জন্য তাদের মধ্যে দেখা গেল দৌড়ঝাপ। থালা-বাসন যার যা আছে তাই নিয়েই ছুটছে খাবার সংগ্রহ করতে। একমুঠো খিচুরী ছাড়া আর কিছুই নেই।তা দিয়ে ভরে না তাদের পেটের এক কোনাও।
বানভাসী মানুষগুলো বলেন, আমাদের কোন খাবার ব্যাবস্থা নাই সরকার যদি আমাগো দুই বেলা খাবারের ব্যবস্থা করতো তাইলে অনেক উপকার হইতো। অন্ততো আমাগো একটু শুকনা চিড়া-মুড়ি, গুড়ের ব্যাবস্থা হইলেও পোলাপান নিয়া খাইয়া বাচতে পারতাম।
ওদিকে বন্যার প্রকট এখনো কমেনি। একের পর এক ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে। দূর থেকে মনে হবে উত্তাল নদী বা সাগর। আসলে এটি সাগার বা নদী না। বিস্তৃন্ন ফসলের মাঠে বন্যার পানিতে তলিয়ে যাবার পর এরকম পরিবেশের সৃষ্টি হচ্ছে।
শিবালয় উপজেলার শাইলি এলাকার ঘিওর – বরংগাইল সড়কে পুর্ব দিকে এমন চিত্র দেখা চোখে পড়ছে। রাস্তার ঢালে সিসি বক্ল দিয়ে বাঁধের মত করে দেওয়ায় ঢেউ এসে তাতে বাড়ি খাচ্ছে। এলাকার বানভাসী মানুষেরা তাই দেখছে।
তবে এলাকাবাসীরা জানান, যদিও ঢেউয়ের সৌর্›দয়্য দেখতে ভাাল লাগে আসলে এ ঢেউ তাদের ভাগ্য নিয়ে খেলা করে। ঢেউয়ের আঘাতে ফসলী জমিসহ নষ্ট করে কৃষকের স্বপ্নকে ভঙ্গেে দিয়েছে।

মানিকগন্জের ঘিওর থানার কান্দাকুষ্টিয়া এলাকার যোনতা বেগম ও জহুরা নামের দুই নারীকে দেখা গেল ঘর সংসার নিয়ে ভেলাই এখন ধারন বাহন, ভেলাই এখন তার দুকদম চলার সাথি।
যোনতা বেগমের স্বামী মন্জু ও জহুরার স্বামী গিয়াস দুই জনই পেশায় কৃষক। কোন মতো ক্ষেত খামার করে চলে তাদের জীবন। বানে ভেসেছে তাদের কর্মক্ষেত্র। এখন তারা নাম লিখিয়েছেন বেকারের খাতায়।
যোনতা বেগম দূঃখ ভরা কন্ঠে বলেন, এক ছেলে দুই মেয়েরে নিয়া বড় বিপদে আছি। আমাগো কেউ খবর নেয়না। ছেলে মেয়েরা স্কুলে যাইতে পারে না।
আরো বেশী অভিমান যেন এলাকার জনপ্রতিনিধিদের প্রতি এই নরীর। তাইতো তার কন্ঠে উঠে আসে “ভোট চাইতে বাড়ির মাটি রাহিনা, অহন আর খবরো লয় না। একটু ফুচি দিয়াও দেহে না।”
বানভাসী এলাকায় এসকল প্র্রকার শতশত নারী রয়েছে যারা নিজের পরিবার পরিজনের জন্য প্রতি নিয়ত কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছে। ভেলায় ভেসে ভেসে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের দৈনন্দিন কর্যক্রম।
সূত্র: বাংলা নিউজ









