নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের অনলাইন প্রস্তুতির প্ল্যাটফর্ম ‘অন্বেষণ’-এর একটি লাইভ ক্লাসে সংঘটিত ন্যাক্কারজনক ও আপত্তিকর ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, তীব্র ক্ষোভ এবং হতাশা প্রকাশ করেছে রাজশাহীর যুব সংগঠন ইয়ুথ এ্যাকশন ফর সোশ্যাল চেঞ্জ (ইয়্যাস)। ইয়্যাস এই জঘন্য কর্মকাণ্ডকে শিক্ষার পবিত্র স্থানে সংঘটিত একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে। একই সাথে, এই আপত্তিকর ভিডিওটি অনলাইনে দ্রুত ভাইরাল হওয়ায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর এর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানানো হয়েছে।
গত ৮ জুলাই রাত ১২টায় ‘অন্বেষণ’ কোচিংয়ের অনলাইন লাইভ ক্লাস চলাকালীন, এক অজ্ঞাত পুরুষ শিক্ষক এবং নারী শিক্ষক প্রকাশ্যে অশালীন ও যৌনতাপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি এবং চুম্বনের মাধ্যমে শিক্ষার পরিবেশকে মারাত্মকভাবে কলুষিত করেন। এ ঘটনা মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ভাইরাল হওয়ায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং আতঙ্ক দেখা দেয়।

ঢাকার গুলশান এলাকার একজন সচেতন অভিভাবক আশরাফ বিজয় বুধবার (০৯ জুলাই, ২০২৫)ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ভাটারা থানায় এই বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগপত্রে উল্লেখিত হয়েছে যে, এই অনৈতিক আচরণ ছাত্রছাত্রীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পেশাগত মর্যাদাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে। ঘটনার ভিডিও ফুটেজ অপরাধের প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষিত আছে।
ইয়্যাস গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছে যে, এই আপত্তিকর ও অশ্লীল ভিডিওটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে, অসংখ্য কোমলমতি শিক্ষার্থী, যারা অনলাইনে শিক্ষা গ্রহণ করে, তারা অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই অশ্লীলতার মুখোমুখি হচ্ছে। এটি তাদের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে, মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং শিক্ষার প্রতি তাদের আগ্রহ ও শ্রদ্ধাবোধকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এমন ঘটনা ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।
ইয়্যাসের সভাপতি মো. শামীউল আলীম শাওন (লেখক ও উন্নয়নকর্মী) বলেন, শিক্ষার মতো একটি পবিত্র স্থানে এমন নির্লজ্জ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত যৌনতাপূর্ণ আচরণ মেনে নেওয়া যায় না। যখন এই ভিডিওটি অনলাইনে ভাইরাল হয়ে যায়, তখন এর ক্ষতিকর প্রভাব কেবল সেই লাইভ ক্লাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং অসংখ্য কোমলমতি শিক্ষার্থীর মনোজগতে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি শুধু শিক্ষকতার নৈতিকতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং শিশুদের মানসিক বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষাজীবনেও মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে। আমরা এই জঘন্য অপরাধের দ্রুত, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িত অজ্ঞাত পুরুষ শিক্ষক, নারী শিক্ষক সামিরা এবং এর পেছনে যদি কোনো মদদ থাকে, তাদের সকলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানাচ্ছি। একই সাথে, যারা এই অশ্লীল ভিডিও ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছে, তাদের বিরুদ্ধেও সাইবার আইনের অধীনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।”
ইয়্যাস বিবৃতিতে বলেছে, “শিক্ষা হলো নৈতিকতা, দায়িত্ব ও সম্মানের প্রতীক। সেখানে এমন কাণ্ড শিশুদের মানসিক বিকাশে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই ঘটনাটি শুধু বিচ্ছিন্ন কোনো অনৈতিকতা নয়, বরং ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা।”
ইয়্যাস মনে করে, এই ঘটনা পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২ এবং সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ উভয় আইনেই বিচার্য। ডিএমপিকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে ইয়্যাসের বিবৃতিতে।
পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২ এর প্রয়োগ:
ধারা ৪ (পর্নোগ্রাফি উৎপাদন, সংরক্ষণ বা প্রদর্শন) এর আলোকে দ্রুত তদন্ত শুরু করে ভিডিও ফুটেজ ফরেনসিক বিশ্লেষণের জন্য পাঠানো এবং অভিযুক্তদের (অজ্ঞাত পুরুষ শিক্ষক ও সামিরা) শনাক্তপূর্বক জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রমাণ সাপেক্ষে গ্রেফতার করে চার্জশিট দাখিল করা। এই আইনের অধীনে অপরাধ আমলযোগ্য ও অজামিনযোগ্য।
সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ এর প্রাসঙ্গিকতা:
ঘটনার অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সংঘটিত হওয়া এবং ভিডিও ভাইরালহওয়ার কারণে ধারা ২৫ (আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ, ইত্যাদি) এর অধীনে এর প্রচারের বিষয়টি বিবেচিত হতে পারে। পাশাপাশি, ডিজিটাল ফরেনসিকের (ধারা ১০) মাধ্যমে তদন্ত পরিচালনা এবং প্রয়োজনে ক্ষতিকারক কন্টেন্ট অপসারণের জন্য বিটিআরসিকে অনুরোধ (ধারা ৮) জানানো।
ইয়্যাসের সুনির্দিষ্ট দাবি:
১. দৃষ্টান্তমূলক তদন্ত ও বিচার: ভাটারা থানায় দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে দোষী দুই শিক্ষক এবং এর পেছনে সম্ভাব্য মদদদাতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। যারা এই অশ্লীল ভিডিও অনলাইনে ভাইরাল করতে সাহায্য করেছে, তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
২. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কঠোর জবাবদিহিতা: সকল অনলাইন ও অফলাইন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তাদের শিক্ষকদের নৈতিকতা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখার বিষয়ে কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া।
৩. কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগ: সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য কঠোর আচরণবিধি ও নীতিমালা অবিলম্বে প্রণয়ন এবং তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
৪. শিক্ষকদের জন্য নৈতিকতা ও সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ: শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নৈতিকতা, দায়িত্বশীল আচরণ এবং সাইবার স্পেসে উপযুক্ত আচরণের বিষয়ে নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
৫. শিক্ষার্থীদের নিরাপদ অনলাইন শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিতকরণ: শিক্ষার্থীদের অনলাইন শিক্ষার পরিবেশকে সম্পূর্ণ নিরাপদ, সুস্থ এবং সুরক্ষিত রাখা, যাতে তারা কোনো ধরনের অশালীনতা বা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির শিকার না হয়। এই ধরনের ঘটনা থেকে শিশুদের মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
স.আর









