রাজশাহীর খবর

‘মুসা মরে গিয়ে জাহান্নামে যাক, আমাদের দেখার নাই’-শ্বাশুড়ির ক্ষোভ

নিউজ ডেস্ক৩০ মার্চ ২০১৭৪ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক: ‘এক বছর আগে বিদেশ যাবে বলে আমার মেয়েকে নিয়ে একবার দেখা করতে এসেছিল মুসা। এরপর আর তার খোঁজ নাই। তার কারণেই আমার মেয়ে তৃষ্ণা আজ বড় বিপদে। আমরাও মানসিক কষ্টে আছি। মুসা মরে গিয়ে জাহান্নামে যাক, আমাদের দেখার নাই। আমরা চাই আমার মেয়ে এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুক। ’ কথাগুলো বলছিলেন নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা মাঈনুল ইসলাম ওরফে মুসার শাশুড়ি নাজমা বেগম।

 

নাজমা বেগমের বাড়ি বাগমারা উপজেলার সাঁইপাড়া গ্রামে। তিনি বাসুপাড়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সামাদের স্ত্রী।

 

মুসা সম্পর্কে জানতে চাইলে নাজমা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে আরো বলেন, ‘বছর খানেক আগে যখন তারা আমাদের বাড়িতে এসেছিল, তখন মেয়ে বিদেশ যাওয়ার জন্য কেনাকাটা করতে কিছু টাকা চেয়েছিল। আমরা মেয়ের হাতে ৫০ হাজার টাকা তুলে দিয়েছিলাম। এর পর থেকে মেয়েরও আর কোনো খোঁজ পাচ্ছিলাম না। শেষে ঢাকার আশকোনায় আত্মসমর্পণের পরই তার খোঁজ পাই আমরা। বিয়ে হওয়ার পর আমার মেয়েটির সর্বনাশ করেছে মুসা। না হলে আজ সে এতো বড়ড় বিপদে পড়তো না। তাকে নিয়ে আমরাও এখন আতঙ্কিত।’

 

নাজমা বেগম আরো জানান, ঢাকার আশকোনায় জঙ্গি আস্তানায় আত্মসমর্পণের পর থেকেই কারাগারে জীবন কাটছে তৃষ্ণার। কারাগারে থেকেই তৃষ্ণা একটি মেয়েসন্তান জন্ম দেন। আত্মসমর্পণের সময় তিনি সাত মাসের গর্ভাবস্থায় ছিলেন।

 

জানা গেছে, অনেক দিন ধরেই পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল জঙ্গি মুসার। এমনকি মায়ের খোঁজও নিতেন না। বছরখানেক আগে বিদেশ যাওয়ার নাম করে একবার বাড়িতে এসে নিজের সব জমি বিক্রি করে গিয়েছিলেন। এর পর থেকে আর কোনো খোঁজ নেই তাঁর।

 

এর আগে মাঝেমধ্যে ঈদের সময় বাড়িতে আসতেন মুসা। তবে গত এপ্রিল মাসের পর আর মা সুফিয়া বেগমের সঙ্গেও কখনো কথা হয়নি তাঁর। এমনটিই দাবি করেছেন মুসার মা সুফিয়া বেগম। গত মঙ্গলবার থেকেই খবর ছড়াতে থাকে, সিলেটের দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ী এলাকায় জঙ্গি আস্তানায় নিহত হয়েছেন মাঈনুল ইসলাম ওরফে মুসা। তাঁর মৃত্যুর খবরের পরও আতঙ্কে এ নিয়ে মুখ খুলতে চাচ্ছে না বাগমারার স্থানীয়রা। তবে এলাকায় মুসা অনেকটা মেধাবী বলে পরিচিত ছিলেন।

 

মুসার মা সুফিয়া বেগম বলেন, “গত এপ্রিলের দিকে হঠাৎ এক দিন বাড়িতে হাজির হয়েছিল মুসা। ওই সময় বিদেশ যাবে বলে তার জমিগুলো সব বিক্রি করে দিয়েছিল। আমি নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু বিদেশ যেতে তিন লাখ টাকা লাগবে বলে সে জমিগুলো বিক্রি করে দেয়। বাড়ি থেকে যাওয়ার সময় বলেছিল, ‘মা এ জীবনে আর দেখা হবে না, ওই জগতে দেখা হবে তোমার সঙ্গে। ভালো থেকো মা। ’ এর পর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাই না। ”

 

দুই ভাই-বোনের মধ্যে মুসাই ছোট। বড় বোন কামরুন নাহার বিয়ে হয়ে গেছে। ফলে গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার গনিপুর ইউনিয়নের বুজরুককোলায় অনেকটা নিঃসঙ্গই জীবন যাপন করতে হয় মুসার মা সুফিয়া বেগমকে। তিনি বলেন, ‘মনে হয়, মেজর জাহিদের পাল্লায় পড়ে নষ্ট হয়ে গেছিল আমার ছেলে। তাই আর আমারও খোঁজ নেয়নি। ’

 

অন্যদিকে, সিলেটের আতিয়া মহলে নিহত চার জঙ্গির মধ্যে নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা মাঈনুল ইসলাম ওরফে মুসা রয়েছেন কিনা সেটি নিশ্চিত হতে এবার তার মা, ভাই ও বোনের ডিএনএ টেস্টের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কারণে মুসার বুধবার সন্ধ্যার দিকে মুসার সুফিয়া বেগম, বোন কামরুন নাহার ও খায়রুল আলমকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
তবে বিষয়টি সরাসরি স্বীকার করতে চান নি রাজশাহী জেলা পুলিশে ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তা। কিন্তু সূত্রগুলো বলছে, যে কোনো সময় তাদের ঢাকা হয়ে সিলেট নেওয়া হবে। সেখানে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে জঙ্গি মুসার ডিএনএ মিলিয়ে দেখা হবে।
জানতে চাইলে রাজশাহী পুলিশ সুপার (এসপি) মোয়াজ্জেম হোসেন ভূঁঞা সাংবাদিকদের কাছে জানিয়েছেন, সিলেটে নিহত ব্যক্তি জঙ্গি মুসা কীনা সেই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য তার পরিবারের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।
বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)  নাসিম আহমেদকে বলেন, বাগমারা উপজেলার গণিপুর ইউনিয়েনের বজ্রকোলা গ্রাম থেকে সন্ধ্যার পর মুসার মা, ভাই ও বোনকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে তিনিও শুনেছি।

 

এদিকে স্থানীয় গনিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান রঞ্জু বলেন, মুসা এলাকায় কম আসতেন। ফলে তাঁর সম্পর্কে খুব একটা ধারণাও নেই স্থানীয়দের। তবে বাগমারায় মেধাবী ছাত্র হিসেবে মুসার পরিচিতি ছিল।

 

প্রসঙ্গত, ঢাকা কলেজে ইংরেজি সাহিত্য বিভাগে সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে উত্তরার লাইফ স্কুলে যোগ দেন মুসা। সেখান থেকেই মেজর জাহিদের ছেলেকে পড়াতেন। বাগমারা থানার ওসি নাছিম আহম্মেদ বলেন, ‘আমাদের কাছে মুসার মৃত্যুর বিষয়ে কোনো তথ্য নাই। তার পরও আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।