রাজশাহী

রাজশাহী বিআরটিএ: দালাল ছাড়া মেলে না সেবা

নিউজ ডেস্ক১৮ মে ২০২৫৪ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) রাজশাহী অফিসে দালাল ছাড়া মেলে না কোনো সেবা। ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির মালিকানা পরিবর্তন, রেজিস্ট্রেশন, রেজিস্ট্রেশন নবায়ন, ফিটনেস নবায়নসহ সব ধরনের সেবাতেই গুনতে হয় অর্থ। তবে এ অর্থ সরাসরি নেন না কোনো কর্মকর্তা। দালালদের হাত ঘুরে ঘুষের টাকা যায় কর্মকর্তাদেও পকেটে। বিআরটিএ অফিসের সামনে দুটি কম্পিউটারের দোকান ঘিরে বা অফিসের ভিতরেও ঘুরাঘুরি করেন দালালরা। তাদেও ম্যানেজ না করলে কোনো কাজের ফাইলই স্বাভাবিক গতিতে আগাবে না সামনে।

বিআরটিএ সূত্র মতে, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ বিআরটিএর সকল সেবার জন্য প্রথমে অনলাইনে আবেদন করতে হয়। আবেদনের পর সেবাগ্রহীতাকে দিতে হয় পরীক্ষা। পরীক্ষায় কৃতকার্য হলে ওইদিনই সেবাগ্রহীতার ছবি ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়া হয়। এর পর মোবাইলে ম্যাসেজ দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্সের স্মার্ট কার্ড হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় বিআরটিএ থেকে। এটি হলো একটি সহজ পক্রিয়। তবে যদিও কিন্তু থেকে গেছে এখানেই।

রাজশাহী বিআরটিএতে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদনকারী এমন বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। তারা নিশ্চিত করেছেন, দালাল না ধরলে আবেদনে নানা ভুল ধরে সেটি বাতিল করা হবে। ফলে সহজে আর পরীক্ষায় দেওয়া হবে না আবেদনকারীকে। আবার আবেদন সঠিক থাকলেও পরীক্ষায় অকৃতকার্য দেখানো হবে। এভাবে নানাভাবে হয়রানি করা হয় আবেদনকারীকে। ফলে সেবাপ্রার্থীরা বাধ্য হয়ে ছুটে যান দালালদের কাছে। দালালদেও ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রতি দেড় থেকে ১৫ হাজার টাকা দিলে কোনো ফাইলই তখন আর আটকে থাকে না।

পিন্টু আলী নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমি চার মাস আগে আবেদন করেছিলাম। কিন্তু নানা ঝামেলা ধরে আমাকে দিনের পর দিন ঘুরানো হচ্ছিল। পরে এক দালাল ধরে ১৫ দিনের মধ্যে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। এর পর আর কোনো ঝামেলা হয়নি। আমি ড্রাইভিংয়ের কার্ডও পেয়েছি হাতে।’

স্মার্ট কার্ড নিতে আসা আব্দুর রহিম নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমার এক পরিচিত লোকের মাধ্যমে ড্রাইভিং লাইসেন্সের কাজ করতে নির্ধারিত ফির চেয়ে দেড় হাজার টাকা বেশি দিয়েছিলাম। সে কারণে কোনো ঝামেলা হয়নি। আজকে স্মার্ট কার্ড নিতে এসেছি।’

গতকাল সরেজমিনে গিয়ে রাজশাহী বিআরটিএ অফিসের ভিতরেই তিনচারজন দালালকেউ দেখা গেলা। তাঁরা একেকজন ২-৩ জন বা তার চেয়েও বেশি সেবাপ্রার্থীর কাগজপত্র নিয়ে ঘুরাঘুরি করছিলেন। আর অফিসের পিয়ন মোহাম্মদ আলীকে খোঁজাখুঁজি করছিলেন কেউ কেউ। তাদের একজন হলেন, আসলাম উদ্দিন (ছদ্দ নাম)।

পরিচয় গোপন রাখার স্বার্থে তিনি জানান, তার বাড়ি বিআরটিএ অফিসের পাশেই নওদাপাড়া এলাকাতেই। তিনি পরিচিত কিছু লোকের কাজ করে দেন। তারাই অন্যদের নিয়ে আসেন বিআরটিএ’র কাজ করার জন্য। এর জন্য খুশিমতো যে যা দেয়, তাই নেন তিনি। তবে এর একটি অংশ বিআরটিএ অফিসেও দিতে বলে দাবি করেন তিনি। এই অর্থ যায় বিআরটিএ’র অফিস পিয়ন থেকে শুরু করে দ্বিতীয়-তৃতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে।

আরেক ব্যক্তি মুঞ্জুর রহমান জানান, তিনি তাঁর প্রাইভেট কারের মালিকানা পরিবর্তনের জন্য কাজগপত্র জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু নানা ভুল ধরে তাঁকে দুই-তিন দিন হয়রানি করা হয়। পরে এক দালালের মাধ্যমে দুই হাজার টাকা দিয়ে সেটি করে নিয়েছেন।

নতুন গাড়ীর রেজিস্ট্রেশন করতে এসেছিলেন আসাদুজ্জামান নামের এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, ‘গাড়ী দেখানোসহ নানা কাগজপত্র দিতে হয়েছে। তার পরেও অনেক জটিল মনে হয়েছে। তাই শো-রুমেই ম্যানেজারকেই অতিরিক্ত ৫ হাজার টাকা দিয়ে কাগজ জমা দিয়েছি। এখন গাড়ী দেখাতে এসেছি। স্মার্ট কার্ডেও জন্য মোবাইলে ম্যাসেজ গেলে পরে নাকি নিতে আসতে হবে।’

রাজশাহীর একটি পুরনো মোটরসাইকেলের শো-রুমের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের প্রায় প্রতিদিনইবিআরটিএ অফিসে আসতে হয়। পুরনো গাড়ীর নাম পরিবর্তন করার জন্য ক্রেতা-বিক্রেতারা সাধারণত বিআরটিএতে তেমন আসতে চান না। আমরাই সব করে দেয়। আর প্রতিদিন যখন একটা অফিসে আসতে হয়, তখন কিছু উপরি মানি না দিলে দ্রুত কাজ হবে না এটাই স্বাভাবিক। কিছু টাকা তো দিতেই হয় তাদের।’

স্মার্ট কার্ড বিতরণের ইনচার্জ শাহ নেওয়াজ ডেভিড বলেন, ‘আগে অনলাইন না থাকায় প্রচুর ভীড় হতো। এখন আপনি সারাদিনে একসঙ্গে একশ লোকও পাবেন না যারা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। এখন লাইন থাকেই না। যার যেটা কাজ, সেটি আগেই হয়ে থাকে। সেবাপ্রার্থীরা মোবাইলের ম্যাসেজের মাধ্যমে নির্দিষ্ট দিনে এসে ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ অন্যান্য কাজের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে যেতে পারেন। তবে অনেকেই অলসতা করে নিজে না করে দালাল ধরেন। এখানে আমাদের কিছু করার নাই। বাইরে দালালরা কাগজপত্র ঠিক করে দেওয়ার নামে কিছু টাকা নিলে আমরা কি করবো? আমরা তো আমাদের সেবা ঠিকই দিয়ে যাচ্ছি।’

বিআরটিএ’র রাজশাহী অফিসের মোটরযান পরিদর্শক ও ভারপ্রাপ্ত সহকারি পরিচালক আবুল কালাম আজদ বলেন, ‘আমাদের অফিসে ঘুষ লেনদেনের কোনো সুযোগ নাই। যাদের কাগজপত্র আমরা সঠিক পাই, তাদের হয়রানি হওয়ার কোনো সুযোগ নাই। নিয়ম অনুযায়ী সার্ভারের মাধ্যমে সকল সেবাপ্রার্থী অনলাইনে আবেদন জমা দিলে সে অনুাযায়ী কাজ হয়।’

স.আর