রাজশাহী

রাজশাহীতে ইলিশ পুঁতে রাখা হতো মাটিতে, এখন তিন বছরের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে ৬শ’ টাকা

নিউজ ডেস্ক১৪ এপ্রিল ২০২৫৫ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

আজ বাংলা নববর্ষ। বাঙ্গালীর ঐতিহ্য এ নববর্ষ এখন পান্তা-ইলিশের দিন হিসেবের পরিচিত। তবে অব্যাহত দাম বৃদ্ধিও কারণে বর্ষবরণে ইলিশ এখন উচ্চবিত্তদের দখলে চলে গেছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের পান্তায় দূরে থাক, কালে-ভাদ্রেও সহেজ পাতে ওঠে না ইলিশ।

অথচ এই রাজশাহীর পদ্মা নদীতেও এক সময় এতো ইলিশ পাওয়া যেত যে, খাওয়ার মতো সে পরিমাণ লোক ছিল না। ফলে ইলিশের পচা গন্ধ থেকে বাঁচতে জেলেরা মাটিতে পুঁতে রাখতেন। অথবা ইলিশের সুটকি করতেন। প্রবাদই ছিল, “যেদিন বাড়িতে খারাপ (মাংস ও অন্য মাছ ছাড়া) তরকারি, সেদিন রান্না হতো ইলিশ।” ফরিদপুর-পাবনা হয়ে রাজশাহীর পদ্মায় প্রচুর পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ত ৭০-৮০ বছর আগে। কিন্তু এখন মাঝে মাঝে ছোট ছোট জাটকা ছাড়া বড় ইলিশের আর দেখা যাওয়া যায় না। খুলনা বা বরিশাল থেকে বাসে বা ট্রাকে করে রাজশাহীর আড়তে যে সামান্য ইলিশ আসে, সেটার ওপরই নির্ভর করতে হয় উচ্চবিত্ত ভোজনরশিকদের। পদ্মার উজানে সর্বানাশা ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে নদীতে স্রোত মারাত্মক হারে কমে যাওয়ায় এখন আর ইলিশ মেঘনা থেকে রাজশাহীর পদ্মায় তেমন আসে না বলে দাবি করেছেন অভিজ্ঞরা।

রাজশাহীর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রাজশাহীর বাজারে গতকাল রবিবার এক কেজি বা তার চেয়ে একটু বড় ওজনের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ১৮-২২শ’ টাকা পর্যন্ত। কয়দিন আগেও এটি ছিল ১৫-১৬ টাকা কেজি। আর তিন বছর আগে এক কেজি ওজনের ইলিশ রাজশাহীতে পাওয়া গেছে ১২-১৩শ’ টাকা দরে। দেড় কেজি সাইজের ইলিশ পাওয়া যেত ১৬-১৮শ’ টাকা কেজি দরে। এখন সেখানে ২৩-২৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে হচ্ছে। ফলে এই তিন বছরে গড়ে অন্তত ৬০০ টাকা কেজিতে বেড়েছে ইলিশের দাম। গতকাল রবিবার রাজশাহীর বাজাওে ৪-৬শ’ গ্রাম ওজনের ইলিশও বিক্রি হয়েছে ১২-১৪ টাকা কেজি দরে। কিছুদিন আগে এই ওজনের ইলিশ বিক্রি হতে দেখা গেছে ৮-৯শ’ টাকা কেজি দরে।

গতকাল রাজশাহীর নিউমার্কেটের পাশে আড়তে খুচরা দোকানে ইলিশ কিনতে এসেছিলেন মাজেদুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, এ বছর ইলিশ একদিনও কিনতে পারিনি। কয়দিন থেকেই ভাবছিনু এবার বর্ষবরণের দিনে ইলিশ খাবো। তাই কিনতে অ্যাসছি। কিন্তু দাম এতো বেশি যে কেনার সাধটাও যেন হারায় গেলো।’

এ বাজারে খুচরা ইলিশ বিক্রি করেন আলাউদ্দিন নামের এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, এখন ইলিশের তেমন আসে না। আসলেও বেশি দামের কারণে তেমন ক্রেতা পাওয়া যায় না। সারাদিন বসে থেকে ৫০ জন ক্রেতা পাওয়ায় দায় হয়ে যায়। বাজারে যারা ইলিশ কিনতে আসেন, তাদের বেশিরভাই ধনি লোকজন। তারাই সাধারণত ইলিশ কেনেন দুই চারটা। মধ্যবিত্ত হাতে গোনা দুই-একজন মাঝে মাঝে আসেন ইলিশ কিনতে। তাও ছোট আকারেরগুলো। বড়গুলোর দাম শুনেই তারা আর কেনার সাহস পান না।’

আরেক ব্যবসায়ী নাজমুল হোসেন বলেন, ‘এক কেজি বা তার ওপরে হলেই ইলিশের দুই থেকে তিনগুন বেশি দরে কিনতে হয়। বিক্রি করতেও সেভাবে। বাজারে ক্রেতা এতো ক্রেতা কম যে, ইলিশ বিক্রি করে এখন সংসার চালানোয় দায় হয়ে পড়েছে। আবার ছোট আকারের ইলিশের তেমন সাদ থাকে না বলে মধ্যবিত্তরাও সেটি কিনতে চান না। তার পরেও যা বিক্রি হয়, সেগুলোই বেশি হয় বেশি।’

এদিকে, রাজশাহীর মধ্যবিত্ত ও নিম্মবিত্ত ক্রেতাদের কথা মাথায় রেখে গত বছরের অক্টোবরে ইলিশ কেটে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। কয়েকদিন এভাবে বিক্রিও করতে দেখা গেছে। কিন্তু ২৫০ গ্রামের নিচে কাটা ইলিশ বিক্রি না হওয়ায় ক্রেতারা কয়েকদিন পরেই মুখ ফিরিয়ে নেন ক্রেতারা। ফলে কাটা ইলিশ বিক্রিও বন্ধ হয়ে যায় মাস না পেরতেই।

নগরীর সাহেববাজার মাছবাজারে রাজশাহী মৎস্যজীবী সমিতির আয়োজনে কেটে ইলিশ বিক্রির উদ্বোধন করেন রাজশাহী ব্যবসায়ী সমন্বয় পরিষদ। পরিষদের সভাপতি ফরিদ মামুদ হাসান ও সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার আলী কেটে মাছ বিক্রির উদ্বোধন করেন।
সাহেব বাজারের ব্যবসায়ী আজমত হোসেন বলেন, বছর বিশেক আগেও আমরা রাজশাহীর পদ্মার ৫-৭শ’ গ্রাম ওজনের ইলিশ মাঝে মাঝে বিক্রি করেছি। এখন ওই ওজনের ইলিশ আর পদ্মায় পাওয়া যায় না। বর্ষায় জাটকা কিছু জেলেদের জালে আসে। এর বাইরে পদ্মায় আর ইলিশ তেমন পাওয়া যায় না। অথচ আমাদেও বাপ-দাদাদের কাছ থকে শুনেছি, এক সময় রাজশাহীর পদ্মার ইলিশ বিক্রিই ছিল তাদের মূল পেশা।’

রাজশাহীর শ্রীরামপুর এলাকার জেলে আব্দুস সাত্তার পদ্মায় মাছ ধরেন প্রায় ৪০ বছর ধরে। তিনিও বলেন, “২৫-৩০ বছর আগেও পদ্মায় ইলিশ পাওয়া যেত বেশকিছু। এখন কালে-ভাদ্রে দেখা মিলে ইলিশের। তাও একেবারে ছোট আকারের। বড় (৫শ থেকে কেজি) ওজনের ইলিশ আর তেমন চোখে পড়ে না।”

রাজশাহীর নদী গবেষক মাহাবুব সিদ্দিকী বলেন, ‘২৫-৩০ বছর আগেও বর্ষায় ধনি-গরিব প্রায় সবার পাতেই উঠতো ইলিশ। এখন বর্ষাতেও গরিব মানুষরা আর ইলিশ কিনতে পারে বলে মনে হয় না। ইলিশ এখন বড়লোকদের খাবার। মধ্যবিত্তরাও তেমন কিনতে পারেন না।’

তিনি আরও জানান, রাজশাহীর পদ্মায় ৭০-৮০ বছর আগে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ত। ফরিদপুর, পাবনা, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ হয়ে ভারতের ভগবানগলা পর্যন্ত ইলিশ স্রোতে টানে ছুটে যেত। কিন্তু ১৯৬১ সালে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ শুরুর পর থেকেই পদ্মায় স্রোত কমতে থাকে, সেই থেকে মেঘান থেকে পদ্মায় ইলিশ আসাও কমতে শুরু করে। এখন বর্ষাতেও আর পদ্মায় ইলিশের দেখা মেলে না তেমন।

অথচ একসময় এই রাজশাহীতেই ইলিশ মাটিতে পুঁতে রাখা হতো। পদ্মায় প্রচুর পরিমাণে ইলিশ পাওয়া যেত যা খাওয়ার মত মানুষ ছিল না তেমন। তখন বাধ্য হয়ে জেলেরা ইলিশ মাটিতে পুঁতে রাখত, না হয় শুটকি করতো।

স.আর