রাজশাহীর খবর

সেই ছয়দিনের যুদ্ধের কথা মনে হলে আজো গা শিউরে উঠে-মুক্তিযোদ্ধা মীর ইকবাল

নিউজ ডেস্ক২৭ মার্চ ২০১৭৫ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:
টানা ছয় দিনের সেই সেই স্মৃতির কথা মনে হলে এখনো গা (শরীর) শিউরে উঠে। কিভাবে ওই ছয়টা দিন পার হলো, আর কিভাবে আমরা শত্রু বাহিনীকে পিচু হটতে বাধ্য করলাম, তা ছিল সত্যিই ভয়ঙ্কর এক অভিজ্ঞতা। আসলে সবই ঘটেছি আমাদের প্রচ- মনবোল আর সাহসিকতার কারণেই। আর সেই কারণেই ছয়দিনের মাথায় আমরা পাকিস্তানের ইপিআর বাহিনীকে পরাস্ত করতে পারি। তারা পিছু হঠতে বাধ্য হয়। আমরা ক্যাম্প দখল করি। ক্যাম্প দখল শেষে আবার ফিরে যায় ভারতের মধ্যে। এর একদিন পরেই বাংলাদেশে স্বাধীনতার লাল-সবুজের পতাকা ওড়ে। তার দুইদিন পরে মুক্ত হয় রাজশাহী। কথাগুলো বলছিলেন রাজশাহীর মহানগরীর আহম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা ও মুক্তিযোদ্ধা মীর ইকবাল। যিনি রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতির পদেও রয়েছেন। বাব-দাদার আমল থেকেই যে পরিবারটি আওয়ামী লীগ রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত।
মীর ইকবালের বাবাকে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীরা এদেশের দোসরদের সহযোগিতায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা হলের নির্যাতন ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। এছাড়াও একই পরিবারের আরো ৬জনতে হত্যা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই এই পরিবারটির ওপর নেমে আসে পাকিস্তানী ও তাদের দোশরদের অন্যতম নির্যাতনের মাত্রা।

 

বাড়িঘর ভাংচুর করাসহ রাজশাহী শহরে তৎকালীন সবচেয়ে বড়বড় দোকানপাটগুলোও ভেঙে তছনছ করে দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর ডাক আর সেসেইসব দু:খ-কষ্টই শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে যেতে টেনে নিয়ে যায় মীর ইকবালকে। এরপর স্বাধীনতার লাল-সবুজের পতাকা উত্তোলনের একদিন আগ পর্যন্ত শুধু যুদ্ধ আর যুদ্ধেই কেটে যায় মীর ইকবালের সময়টুকু।
স্বাধীনতা দিবসে গতকাল রবিবার একান্ত সাক্ষাতকারে সেইসব দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে যা বলেন মীর ইকবাল তা সত্যিই দ:সাহসিক এক কাহিনী।
মীর ইকবাল জানান, বঙ্গবুন্ধ ১৯৬৯ এবং ৭০ এর নির্বাচনের সময় রাজশাহীতে এসেছিলেন। তখন বঙ্গবন্ধুকে নিজ বাড়ির সামনে আমার বাবা মীর রহমত আলী তাঁকে দুই বারই ফুলের মালা পরিয়েছিলেন। বৃটিশ শাসন আমলের সেনা সদস্য মীর রহমত আলীকে খুব ভাল করেই চিনতেন বঙ্গবন্ধু। আর দুই বার রাজশাহী এসে সেই রহমত আলীর বাড়ির রান্না করা খাবারই খেয়েছিলেন তিনি। ফলে দেশে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই সেই রহমত আলীর পরিবারের ওপর নেমে আসে ভয়াবহ নির্যাতনের মাত্রা। যদিও আগেই অবস্থা টের পেয়ে রহমত আলী তার ছেলে-মেয়েদের প্রধমে নগরীর দেবিশিং পাড়া এবং সেখান থেকে রাজশাহীর দুর্গাপুরে বখতিয়ারপুরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন রহমত আলী। আর নিজে শহরে আত্মগোপন করে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতে থাকেন। তবে দুর্গাপুরে যাওয়ার পরেও সেখানকার পিচ কমিটির সদস্যদের রোষানলে পড়ার উপক্রম হন রহমত আলীর পরিবার।

 

এরপর দুর্গাপুরের বখতিয়ারপুর থেকে পালিয়ে গৌরিহার গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নেন তার ছেলে-েমেয়ে। এরপর বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষনে উদ্বুদ্ধ হয়ে সেখান থেকে পালিয়ে বাইসাইকেল নিয়ে শহরে আসেন বড় ছেলে মীর ইকবাল। শহরে আসার পরেই নিজেদের বাড়ি-ঘর, দোকানপাট ভাংচুরের দৃশ্য দেখতে পান মীর ইকবাল। সেইসঙ্গে দুই চাচা-চাচিসহ এক শিশু ও চাচার এক শ্যালক মিলে ছয়জনের মৃত্যুর খবর শোনেন মীর ইকবাল। কিন্তু বাবার আর দেখা পাননি মীর ইকবাল।

 

এই অবস্থায় ২২ বছর বয়সে ১৯৭১ সালের  ১৮-১৯ এপ্রিলের দিকে প্রতিবেশী এক ব্যক্তির সহায়তায় ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে চলে যান মীর ইকবাল। ভারতে গিয়ে প্রথমে মূর্শিবাদের কাতলামারি নন্দিভিটা ক্যাম্পে এরপর পানিনিয়া ক্যাম্পে তারপরে শিলিগুড়ির পানিরঘাটা ক্যাম্পে গিয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন মীর ইকবাল। সেখান থেকে ফিরে এসে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রথমে রাজশাহী কাটাখালিতে ব্রিজ ধ্বংসের মিশনে নামেন মীর ইকবাল। এরপর পর্যাংক্রমে একের পর এক যুদ্ধে অংশ নেন তিনি।
মীর ইকবাল বলেন, ‘দিনটি ঠিক মনে করতে পারছি না। তবে জুনের শেষের দিকে হবে। আমার নেতৃত্বে রাতে ১৬ জনের একটি বাহিনী নদী পার হয়ে আমরা রাজশাহীর চারঘাটের ইউসুফপুর গ্রামে প্রবেশ করার চেষ্টা করি। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল ওই গ্রাম দিয়ে যাওয়ার সময় আমরা পাকিস্তানী বাহিনীর ওপর রাতের আঁধারে হামলা করে আবার ভারতে ফিরে যাব। কিন্তু নদী পার হয়ে ওপরে উঠতেই গ্রামের একটি কুকুর চিৎকার দিতে থাকে। এরপর বৃষ্টির মতো গুলি আর বোমা বর্ষণ করতে থাকে পাকিস্তানী সেনা বাহিনী। আমরা আত্মগোপন করি ধানক্ষেতের মধ্যে। এরই মধ্যে পালাতে গিয়ে বোমার আঘাতে নৌকার চালক কুড়াল মাঝির একটি হাত উড়ে যায়। পরে ভারেত ফিরে গিয়ে জানতে পারি আমাদের এক সহযোদ্ধাও ওই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন।’
মীর ইকবাল বলেন, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী বোমা ও গুলিবর্ষণ করতে থাকলেও তারা মনে করেছিল আমরা তাদের ঘিরে ফেলেছি। আর আমরাও জানতাম আমারা কেউ আর হয়তো বেঁচে ফিরতে পারবো না। তাই আমি আমার কাছে থাকা গ্রেনেডটি হাতেই ধরে রেখেছিলাম। মনে মনে পরিকল্পনা নিয়ে রেখেছিলাম। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যরা কাছে এলেই সেটির বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেকে শেষ করে দিব এবং তাদেরও শেষ করবো। তবে সেনাবাহিনীর সদস্যরা আমাদের আর কাউকে দেখতে না পেয়ে ধান খেতের আইল দিয়ে হেঁটেই চলে যায়। আমর তখন ধান খেতের ভিতরেই অবস্থান করছিলাম।’ পরে শরীরে কাদা-পানি মাখা অবস্থায় সকালে যে যার মতো পালিয়ে আবার ভারতে চয়ে যায়।’
মীর ইকবাল বলেন, সবচেয়ে বড় যুদ্ধ করেছিলাম কুষ্টিয়ার মহিষকুন্ডিতে। সেখানে নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে আমরা ৬০-৬২ জনের একটি দল টানা ৬দিন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেয়। আমরাও বাঙ্কার করে রেখেছিলাম, তারাও বাঙ্কার খুড়ে আমাদের দিকে গুলি করছিল। একদিন আমি হঠাৎ করেই বাঙ্কার থেকে বের হয়ে এসএলআর থেকে গুলি ছুড়তে ছুড়তে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। তখন মনের মাঝে বিন্দুমাত্র খেয়াল হয়নি ওপার থেকে একটি গুলিই আমার প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। শেষে অপর এক সঙ্গীর চিৎকারে আবার ফিরে আসি বাঙ্কারে। তারপর বাঙ্কার থেকেই চলতে থাকে যুদ্ধ। টানা ছয়দিন যুদ্ধের পরে শেষে আমরা মহিষকুন্ড ক্যাম্প দখল করি। সেই দিনের স্মৃতির কথা মনে হলে এখনো গা শিউরে উঠে।’
মীর ইকবাল বলেন, আমরা কখনো কথনো গেরিলা হিসেবেও যুদ্ধ করেছি। রাতের আধাঁরে এদেশের দোসরদের ধরে নিয়ে গেছি। আবার কখনো কখনো এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ছুটে গিয়েছি যুদ্ধ করতো। মেজর আব্দুর রশিদের নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশ নিলেও মেজর গিয়াসের নেতৃত্বেও যুদ্ধ করতে গিয়েছি দিনাজপুর, চাইপাইবাবগঞ্চের কয়েকটি স্থানে। রাজশাহী মুক্ত হওয়ার দিন ১৮ ডিসেম্বর সকালে রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানায় প্রথম লাল-সবুজের পতাকাও উড়িয়েছিলেন মীর আফজাল বাবলা। বাবলাকেও পাকিস্তান সেনাবাহিনী শহীদ জোহা হলে ধরে নিয়ে গিয়ে বুক পর্যন্ত মাটির মধ্যে পুঁতে রেখে নির্যাতন করেছিলেন। কয়েক দফা নির্যাতন শেষে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।’
স/আর