সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
দেশে অপ্রয়োজনীয় গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ সেবনের মাত্রা এতটাই যে ২০২৪ সালে শুধু একটি র্ব্যান্ডেরই ওষুধ বিক্রি হয়েছে ৯১৮ কোটি টাকার। সর্বাধিক বিক্রীত ওষুধের তালিকায় প্রথম তিনটিই দখল করেছে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ ইসোমিপ্রাজলের তিনটি র্ব্যান্ড। দীর্ঘ সময় ওষুধটি সেবনে স্বাস্থ্যের কী ক্ষতি হতে পারে, তা জানাচ্ছেন ডা. মো. আসাদুজ্জামান কনক।
আমাদের দেশে পেপটিক আলসার ডিজিজ ও গ্যাস্ট্রোএসোফেগাল রিফ্লাক্স ডিজিজ (জিইআরডি) রোগীর অভাব নেই।

প্রচলিত ভাষায় এটাকে ‘গ্যাস্ট্রিক’ বলে বেশির ভাগ মানুষ। রোগ দুটি নিয়ন্ত্রণে ওষুধ ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকর। বেশির ভাগ রোগী জীবনযাপনে পরিবর্তন আনার বদলে ওষুধের ওপর নির্ভরশীলতাকেই বেছে নেন।
পেপটিক আলসারের প্রধান লক্ষণ বুকের নিচ থেকে নাভি পর্যন্ত পেটব্যথা।
পাশাপাশি অল্প খেলেই পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি হওয়া, পেট অতিরিক্ত ভরা মনে হওয়া এবং বমি হতে পারে।
জিইআরডির উপসর্গও কাছাকাছি। বুকে ব্যথা ও জ্বালাপোড়ার অনুভূতি, সঙ্গে থাকতে পারে ঢেকুরের সঙ্গে তিতা বা টক স্বাদ। পেট ফুলে আছে, এমনটাও অনুভব করেন অনেকে।
আমাদের দেশের বেশির ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে বুক জ্বালাপোড়া আর ব্যথার লক্ষণই বেশি দেখা যায়।
দীর্ঘ মেয়াদে যেকোনো ওষুধ সেবনই বিপজ্জনক। আর যদি তা হয় ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া, তাহলে তো কথাই নেই। উপসর্গ দেখা দেওয়া মাত্র চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ কিনতে ফার্মেসিতে ভিড় জমায় রোগীরা। সমস্যার শুরু সেখানেই।
প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর বা পিপিআই গোত্রের ওষুধে রোগ দুটি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব, তবে সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত ওষুধ ইসোমিপ্রাজল। দামে সস্তা ওষুধটি দ্রুত কাজ করে এবং চট করে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নজরে আসে না। তাই এর যথেচ্ছ অপব্যবহার দেখা যায়।
ইসোমিপ্রাজলের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার তালিকা বেশ লম্বা। স্বল্পমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, যেমন—মাথা ব্যথা, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা ও পেট ব্যথা অনেকেরই হতে পারে। ওষুধের জটিল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া শুরু হয় লম্বা সময় ওষুধ সেবনের কারণে। এর মধ্যে আছে দেহে ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি দেখা দেওয়া। এর ফলে রোগী শারীরিক দুর্বলতা এবং অরুচিতে ভুগতে শুরু করে, পাশাপাশি পেশিতে দুর্বলতা, অনিয়মিত হৃদস্পন্দনও দেখা দিতে পারে।
অরুচির কারণে খাবার গ্রহণ কমে যাওয়ায় ম্যাগনেসিয়ামস্বল্পতার পাশাপাশি অন্যান্য ভিটামিন ও মিনারেলের ঘাটতিও দেখা দিতে শুরু করে। একটানা তিন মাসের বেশি গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ সেবনে দেখা দেয় সমস্যাটি। এর মেডিক্যাল নাম হাইপোম্যাগনাসেমিয়া। এই রোগে হাড় দুর্বল হয়ে যায়, পরিপাকতন্ত্রে প্রদাহ দেখা দেয়, ভিটামিন-বি১২ কমে মুখে ঘা হতে পারে।
আরেকটি বড় সমস্যা, ইসোমিপ্রাজল বেশ কিছু হার্টের ওষুধের কার্যকারিতা নষ্ট করে; যেমন—বহুল ব্যবহৃত ক্লপিড্রোজেল। পাশাপাশি অ্যান্টিফাঙ্গাল, আর্থরাইটিস ও মৃগী রোগের ওষুধের কার্যক্রমও ইসোমিপ্রাজলের কারণে ব্যাহত হয়। হাসপাতালে আজকাল প্রচুর হার্ট অ্যাটাকের রোগী দেখা যায়, যাদের উপসর্গে অযাচিত ড্রাগ ইন্টার্যাকশনের প্রমাণ স্পষ্ট।
যাদের কিডনির রোগ আছে, তাদের জন্যও ইসোমিপ্রাজল বিপজ্জনক। প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর বা পিপিআই কার্যপ্রণালীর ওষুধের মধ্যে এটি পড়ে, যার প্রভাবে দেখা দিতে পারে অ্যাকিউট ইন্টারস্টিশিয়াল নেফ্রাইটিস। দুর্বল কিডনিকে দ্রুত অকেজো করে দিতে পারে এই ওষুধ, প্রয়োজন হতে পারে ডায়ালাইসিসের। লিভারে সমস্যার রোগীদের জন্যও একই কারণে এটি বিপজ্জনক হতে পারে। হজমক্ষমতা হ্রাস, অন্ত্রের পলিপ ও পরিপাকতন্ত্রের ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের পেছনেও ইসোমিপ্রাজলের অতিরিক্ত ব্যবহার দায়ী।
চিকিৎসকরা রোগীদের ইতিহাস বিবেচনা করে তবেই ব্যবস্থাপত্রে ওষুধের উল্লেখ করেন। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অথবা ফার্মেসির বিক্রেতার কথায় যদি রোগীরা মাসের পর মাস ইসোমিপ্রাজল সেবন করতে থাকেন, তাহলে বড়সড় রোগ দেখা দিতে বাধ্য।
পেপটিক আলসার ও জিইআরডি নিয়ন্ত্রণে জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা সবচেয়ে জরুরি। উপসর্গ না কমলে তখন শুধু বিশেষজ্ঞের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা যাবে। ভাজাপোড়া, ঝাল-মসলাদার ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে চললেই বেশির ভাগ রোগীর উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ধূমপান পরিহার, পর্যাপ্ত পানি পান ও খাবারের সময়ানুবর্তিতা মেনে চললে ওষুধের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরির হার অনেকটাই কমানো যাবে।
লেখক : মেডিসিন স্পেশালিস্ট
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল
সূত্র: কালের কণ্ঠ









