রাজশাহী

সম্মেলনের ২০ দিনেও হয়নি কমিটি, শেষ মুহূর্তে আলোচনায় সেই বিতর্কিতরা

নিউজ ডেস্ক৮ অক্টোবর ২০২৩৪ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দীর্ঘ প্রায় সাড়ে ছয় বছর পর গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের ২৬তম বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন শেষে আগের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন। দ্বিতীয় অধিবেশনের পর কমিটি ঘোষণা দেওয়ার কথা থাকলেও তাঁরা কমিটি না দিয়েই ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন। এদিকে সম্মেলনের ২০ দিন হয়ে গেলেও এখনো কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। সভাপতি-সম্পাদক পদে আসতে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন পদপ্রত্যাশীরা। তবে শেষ মুহূর্তে আলোচনায় থাকা নেতাদের বিরুদ্ধে রয়েছে অছাত্ব, চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ নানা অভিযোগ। পদপ্রত্যাশী নেতারা বলছেন, কমিটি না থাকায় দলের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ৮ ডিসেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের ২৫তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১১ ডিসেম্বর গোলাম কিবরিয়াকে সভাপতি ও ফয়সাল আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করে ১৩ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্র। ওই কমিটির মেয়াদ শেষ হয় ২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর।

চলতি বছরের গত ১৮ সেপ্টেম্বরের সম্মেলনের মাধ্যমে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে আসতে ছাত্রলীগের ৯৪ জন কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় এক ডজন নেতার নাম ক্যাম্পাসে বেশি আলোচিত হচ্ছে। তাঁদের বেশির ভাগের ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে অনেক আগেই। শীর্ষ নেতৃত্বে কে আসবেন, এ নিয়ে ক্যাম্পাসের সব মহলে চলছে আলোচনা।

শেষ মুহূর্তে আলোচনায় সেই অছাত্ব ও বিতর্কিতরা :

একাডেমিক শাখা, বিভাগ, ছাত্রলীগের একাংশের সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সদ্য বিলুপ্ত কমিটির প্রশিক্ষণ-বিষয়ক সম্পাদক আসাদুল্লাহ-হিল-গালিব আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। প্রথম বর্ষে উত্তীর্ণ হলেও দ্বিতীয় বর্ষ আর টপকাতে পারেননি। পরে ড্রপআউট হয়ে ছাত্রত্ব হারিয়েছেন তিনি। ছাত্রত্ব দেখাতে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ভুয়া’ সনদ দেখিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে সন্ধ্যাকালীন মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হয়েছেন তিনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ছাত্রলীগ নেতা গালিব ঢাকার উত্তরার ১৫ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত ‘অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ থেকে বিবিএ পাশের নকল একটি সনদপত্র (যাহার রেজিস্ট্রেশন নম্বর : ৭৭-০০১৩-১২৪) বানিয়ে রাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্বান্ধ্যকালীন মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হন।

গত ৩ সেপ্টেম্বর রাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মুসতাক আহমেদ বরাবর ‘অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের’ পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কামরান চৌধুরী প্রেরিত একটি চিঠি এসেছে এই প্রতিবেদকের হাতে।

ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘আসাদুল্লাহ-হিল- গালিব ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেননি। এমনকি ৭৭-০০১৩-১২৪ রেজিস্ট্রেশন নম্বরে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সনদটি জমা দিয়ে গালিব রাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সান্ধ্য মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হয়েছেন, সেটি ভুয়া এবং অসত্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র না হয়েও অবৈধভাবে মাদার বখশ হলে থাকছেন তিনি।’

জানতে চাইলে অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. কামরান চৌধুরী  বলেন, ‘রাবির সংশ্লিষ্ট বিভাগ আমাদের কাছে জানতে চেয়েছিল, বিষয়টি সত্যি নাকি মিথ্যা। আমরা ওই বিভাগকে প্রায় এক মাস আগে আমাদের উত্তর জানিয়ে দিয়েছি। আপনি ওই বিভাগের সভাপতির সঙ্গে কথা বলেন।’

জানতে চাইলে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সভাপতি মুসতাক আহমেদ বলেন, ‘প্রতিটি সেশনে বিভাগে অসংখ্য শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। গালিব নামে কেউ ভর্তি আছে কি না, আমি সঠিক জানি না। জাল সনদে ভর্তির অভিযোগে অনুসন্ধানে বিভাগ থেকে চিঠি দেয়ার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার মেইলটি অফিস দেখাশোনা করে। তবে বিভাগে খোঁজ নিয়ে আগামীকাল জানাতে পারবো।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আসাদুল্লাহ-হিল-গালিব বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। এবিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’

আরেক পদপ্রত্যাশী কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য সাকিবুল হাসান দীর্ঘদিন ক্যাম্পাসের রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করা ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। সম্মেলনের আগে ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের দুই নেতাকে মারধর করে আলোচনায় আসেন তিনি। সম্মেলনে পদপ্রত্যাশী সাকিবুল হাসান লোকপ্রশাসন বিভাগ থেকে ২০২০ সালে পড়ালেখা শেষ করেছেন। এ বিষয়ে জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

দৌঁড়ে এগিয়ে থাকা আরেক নেতা অনিক মাহমুদ বনি। তার বিরুদ্ধে রয়েছে ছিনতাই, চাঁদাবাজির অভিযোগ আছে। ২০১৯ সালের অক্টোবরে ক্যাম্পাসে এক ছিনতাইয়ের মামলায় তিনি জেলে যান। এর আগে ২০১৭ সালের এপ্রিলে চাঁদাবাজির অভিযোগে তাকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এছাড়াও মাদকের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে মারামারির অভিযোগ রয়েছে বনির বিরুদ্ধে।

এ বিষয়ে অনিক মাহমুদ বনি বলেন, ‘আমাকে ষড়যন্ত্র করে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। পরে খায়রুজ্জামান লিটন ভাই ডেকে বিষয়টি মিমাংসা করে দিয়েছেন। তাছাড়া মামলার বিষয়টিও সমাধান হয়ে গিয়েছে।’

সদ্য বিলুপ্ত রাবি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী অছাত্রদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ নেই। কেন্দ্রীয় কমিটি যাচাই-বাছাই করে অতি শিগগিরই কমিটি ঘোষণা করবেন।’

ট্যাগ: