নিজস্ব প্রতিবেদক:
ভাষা আন্দোলনে রাজশাহীর সর্বস্তরের পেশাজীবী ছাত্র-জনতার গৌরবময় ভূমিকা ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। ঢাকার পরেই ভাষা আন্দোলনের পুরো সময়টা রাজশাহী উত্তাল ছিল ছাত্র-জনতার আন্দোলনে। এমনকি এখানকার ভাষাসৈনিকদের দাবি, ভাষাশহীদদের স্মরণে রাজশাহীতেই দেশের প্রথম শহীদ মিনারটি তৈরি হয়েছিল। ২১ ফেব্রুয়ারি রাতেই রাজশাহী কলেজ ইট ও কাদামাটি দিয়ে তৈরী করা হয়েছিলে ভাষাশহীদদের স্মরণে একটি শহীদ মিনার।
রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় নেতাকর্মীরা এখনো যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের একটাই দাবি- দেশের মধ্যে এটিই প্রথম শহীদ মিনার। এর জন্য তারা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিরও দাবি জানান।

ভাষা আন্দোলনে রাজশাহীতে সক্রিয় থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জি। ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি ছিলেন রাজশাহী কলেজের ছাত্র। ভাষা আন্দোলনের সে দিনের দিনগুলোর কথা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি সিল্কসিটি নিউজকে জানান এভাবে, ‘ভাষা আন্দোলনে রাজশাহীর সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা ১৯৪৮ সাল থেকেই সক্রিয় ছিল। ওই সময় থেকেই যে কোনো আন্দোলনের সূতিকাগার ছিল রাজশাহী কলেজ। আমরা ভাষা আন্দোলনে ঢাকার ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সঙ্গে তাল রেখে রাজশাহীতে আন্দোলন-সংগ্রাম কর্মসূচি পালন করতাম। ১৯৪৮ সালে রাজশাহী নগরীর ফায়ার বিগ্রেড মোড়ে ছাত্র জনতার মিছিলে তৎকালীন মুসলিগের ক্যাডাররা ও পুলিশ হামলা করে। এতে একজন রক্তপাতও হোন। এর পর থেকেই রাজশাহীর ছাত্রজনতা আন্দোলন অব্যাহত রাখে।
মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জি বলেন, ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় ভাষার দাবিতে ছাত্র-জনতার আন্দোলন তখন তুঙ্গে। আমরাও রাজশাহীতে ভাষার দাবিতে আন্দোলন করছি। ২১ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীতে আমরা দিনভর ঢাকার খবর জানার জন্য গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম। কারণ, রাজশাহীর ছাত্রদের মনে গভীর আশঙ্কা ছিল- ঢাকায় বড় কিছু ঘটতে পারে। অবশেষে সন্ধ্যার দিকে রাজশাহীতে খবর এলো- ঢাকায় ছাত্রদের ওপর গুলি হয়েছে। অনেক ছাত্র আহত ও নিহত হয়েছেন। ঢাকায় ছাত্রদের ওপর গুলি চালানোর খবর পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে রাজশাহী শহরে বিষাদের ছায়া নেমে এলো। দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেল। তখনকার দিনে সব আন্দোলনেই ছাত্রদের জমায়েত হওয়ার স্থান ছিল রাজশাহী কলেজ। সন্ধ্যার কিছুটা পরেই কলেজের নিউ হোস্টেলে একে একে রাজশাহীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা জমতে শুরু করল। একপর্যায়ে কয়েক শ ছাত্র জমায়েত হলো হোস্টেল প্রাঙ্গণে। সবার চোখে-মুখে ভীষণ উৎকণ্ঠা, কিন্তু দৃঢ় প্রত্যয়ে সবার কণ্ঠেই উচ্চারিত হচ্ছে, ‘ছাত্র হত্যার বিচার চাই, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।’ রাজশাহী মেডিক্যাল স্কুলের সিনিয়র ছাত্র এস এম গাফ্ফারের সভাপতিত্বে শুরু হলো ছাত্রদের সভা। সভায় দুটি প্রস্তাব গৃহীত হলো। রাজশাহীতে দুর্বার গতিতে ভাষা আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য গঠিত হলো ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও শহীদ ছাত্রদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণ করা। ইট ও কাদামাটি দিয়ে যেভাবেই হোক, রাতেই শহীদদের স্মরণে একটি শহীদ মিনার তৈরি করতে হবে বলে সবাই সিদ্ধান্ত নিল। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি হলেন মেডিক্যাল স্কুলের ছাত্র এস এম গাফ্ফার এবং যুগ্ম আহ্বায়ক হলেন রাজশাহী কলেজের সিনিয়র ছাত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোলাম আরিফ টিপু (বর্তমানে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর) ও নাটোরের হাবিবুর রহমান। এর পর ওই রাতেই ভাষাশহীদদেও স্মৃতির প্রতি শ্রোদ্ধা জানাতে নির্মাণ করা হলো শহীদ মিনার। সেটি রাত জেগে পাহারাও দেওয়া হলো। কিন্তু সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম লীগের সন্ত্রাসীরা ও পুলিশ এসে শহীদ মিনারটি ভেঙে দিল।
মুত্যৃরর আগে ২০১৩ সালে রাজশাহীর আরেক ভাষাসৈনিক সাঈদ উদ্দিন আহমদ এক সাক্ষাৎকারে ভাষা আন্দোলনের সেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলে। “শহীদ মিনার নির্মাণ বা তার অবয়ব সম্পর্কে তখন আমাদের কোনো ধারণা ছিল না। এই অবস্থায় সারা রাত ধরে ইট ও কাদা-মাটি দিয়ে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করলাম। শহীদদের স্মরণে স্তম্ভের গায়ে লিখে দেওয়া হলো ‘শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’।
অন্যদিকে স্মৃতিস্তম্ভটির গায়ে লিখে দেওয়া হলো কবিগুরুর বিখ্যাত কবিতার একটি চরণ- ‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই। নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’ সেই শহীদ মিনারটির ছবি নানা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও তোলা হলো একটি পুরনো ভাঙাচোরা ক্যামেরা দিয়ে, যা আজও সংরক্ষণ করা আছে। মরহুম ভাষাসৈনিক সাইদ উদ্দিন আহমেদেও বাড়িতে।
ভাষাসৈনিক গোলাম আরিফ টিপু এবং আব্দুর রাজ্জাকও দাবি করেন, ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রোদ্ধা জানাতে নির্মাণকৃত রাজশাহীর শহীদ মিনারটিই ছিল দেশের প্রথম শহীদ মিনার।
স/আর









