রাজশাহী

স্বজনপ্রীতি দুর্নীতিই কাল হলো ভুলুর: পাত্তা দিতেন না জনপ্রতিনিধিদেরও

নিউজ ডেস্ক২৮ ডিসেম্বর ২০১৬৫ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

‘জেলা পরিষদের বসে নিজের পালিত পূত্রকে নিয়ে সকল প্রকল্পের ভাগ-বাটোয়ারা করেছেন তিনি। করেছেন প্রকল্প থেকে কমিশন বাণিজ্য। এগুলো করতে গিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গেও দূরুত্ব বজায় রেখেছিলেন তিনি। তার কাছে যাওয়া যেত না। পরিষদের গাড়ী নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন পালিত ছেলে। বন্ধুদের নিয়ে পরিষদের টাকায় প্রায় প্রতিদিন দুপুরের খাবার খেতেন পরিষদে বসেই। এসবের প্রতিবাদ করতে গেলেই ভয়ভীতি দেখাতেন ভুলুর পালিত ছেলে। যেন তার দাপটেই থাকা দায় হয়ে যেত জেলা পরিষদে। এসব কারণে আমরা মনে-প্রাণে চাইছিলাম যেন ভুলু আর নির্বাচিত হয়ে পরিষদে ঢুকতে না পারেন। সেই কাজটিই হয়েছে। তিনি পরাজিত হয়েছেন। জেলা পরিষদটাও এখন রক্ষা পাবে হয়তো?

 

এভাবে নিজের আক্ষেপগুলো বুধবার সন্ধ্যায় প্রকাশ করছিলেন রাজশাহী জেলা পরিষদের একজন কর্মকর্তা। যিনি প্রতিবাদ করতে  সাবেক প্রশাসক ভুলু এবং তার পালিত ছেলের দ্বারা বেশ কয়েকবার হুমকির মুখে পড়েছেন।

 

সেই ভুলু বুধবার জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে বিপুল ভোটে পরাজিত হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিল্কসিটি নিউজকে বলেন, ‘তার (ভুলুর) স্বজনপ্রীতি আর ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতিই তার জন্য কাল হয়েছে। তিনি জেলার কোনো জনপ্রতিনিধিদের পাত্তাই দিতেন না। যার ফলে তিনি নির্বাচনে পেয়েছেন হাড়ে হাড়ে-বলছিলেন ওই কর্মকর্তা।

 

এর আগে গত ১৯ ডিসেম্বর জেলা পরিষদের ভূক্তভোগী কর্মচারীদের পক্ষ থেকে ভুলুর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে ডাকযোগে সিল্কসিটি নিউজসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে লিখিত অভিযোগ পাঠিয়েছিলেন।

 

  • এতে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মাহবুব জামান ভুলু এবং তার পালিত ছেলের নানা অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেছিলেন তারা।

ওই অভিযোগের আংশিক আবারো সিল্কসিটি নিউজের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো- গত কয়েকটা বছর আমরা চরম স্বেচ্ছারিতার মধ্যে দিনাতিপাত করেছি। জেলা পরিষদের কোটি কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। ভুয়া প্রকল্প বানিয়ে টাকা নিয়ে লুপপাট করেছেন।

 

দলবল নিয়ে অফিসে থাকা-খাওয়া থেকে শুরু করে পালিত পূত্রকে দিয়ে মোটরসাইকেল আর বাড়ির গাড়ীর তেলেরও বিল উত্তোলন করেছেন ভুলু। সাধুর মোড়ের বিশালকারার বাড়ির সংস্কারও হয়েছে জেলা পরিষদের টাকায়। এই বাইরেও ভুলুর বিরুদ্ধে অভিযোগের ফিরিস্তি তুলে ধরা হয় ওই লিখিত অভিযোগে।

  • ওই সময় এসব নিয়ে জানতে চাইলে ভুলু বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেছিলেন, কে বা কারা এসব অভিযোগ তুলেছে তা আমার জানা নাই। আমি কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি করিনি।

এদিকে রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিল্কসিটি নিউজকে জানান, ভুলুর পক্ষে রাজশাহীর স্থানীয় এমপি এবং জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা ওপরে ওপরে কাজ করলেও ভিতরে ভিতরে তারা মোহাম্মদ আলী সরকারের পক্ষেই কাজ করেছেন।

 

  • তাদের পক্ষ থেকে মোহম্মদ আলী সরকার সমর্থন দেওয়ার কারণ হিসেবে দলীয় সূত্রগুলো জানায়, রাজশাহী জেলা পরিষদের সরকারি বরাদ্দগুলো একাই হরিলুট করেন মাহবুব জামান ভুলু। নিজের ইচ্ছে মতো বরাদ্দ ভাগ-বাটোয়ারা করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে জেলার ৬ এমপি উপদেষ্টা হলেও তাঁদের কখনো বরাদ্দ ভাগ-বাটোয়ারা করতে ডাকা হয়নি। এমনকি এমপিদের নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সভাও করতে পারেননি ভুলু।

কয়েকজন জনপ্রতিনিধি অভিযোগ করেছেন, পালিত ছেলেকে নিয়েই জেলা পরিষদ চালাতেন ভুলু। আর তাঁকে দিয়েই সরকারি বরাদ্দের অর্থ হরিলুট করা হয়। এ নিয়ে রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের থেকে শুরু করে স্থানীয় এমপিদের মাঝে ছিল চরম ক্ষোভ। এ ক্ষোভের কারণেই এবার মাহবুব জামান ভুলুর বিরুদ্ধে সবাই ভিতরে ভিতরে আট-ঘাট নেমে মাঠে নেমেছেন। আর তাতে কপাশে সিঁকে ঝুলেছে ভুলুর। তিনি নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। মোহাম্মদ আলী সরকার পেয়েছেন ৭৪২ ভোট। আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মাহবুব জামান ভুলু পেয়েছেন ৪১৭ ভোট। জেলা রিটার্নিং অফিসার কাজী আশরাফ উদ্দীন এ ফলাফল ঘোষণা করেন।
এর আগে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে রাজশাহী ৯ উপজেলা চেয়ারম্যান ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির অন্যতম সদস্য একযোগে জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহববুব জামান ভুলুর বিরুদ্ধে সরকারি বরাদ্দের কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ তুলেন। এ নিয়ে ওই সময় বিভিন্ন মিডিয়াতেও খবর প্রকাশ হয়।
সূত্র মতে, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানরা ওই অভিযোগ তোলার পরে ২০১৪ সালে জেলার নয় উপজেলা চেয়ারম্যানকে ৫-৬ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু এর পরে উপজেলা চেয়ারম্যানদের আর কখনো কোনো বরাদ্দ বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব দেননি জেলা প্রশাসক মাহবুব জামান ভুলু।
একটি সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে জেলা পরিষদ থেকে ৬-৭ লাখ টাকা বরাদ্দ চেয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও রাজশাহ-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনের এমপি শাহরিয়ার আলম প্রশাসক মাহবুব জামান ভুলুকে অনুরোধ করেছিলেন। বাঘার আড়ানিতে সনাতন ধর্মাবলম্বি অধ্যুষিত এলাকায় একটি শ্বশান নির্মাণের জন্য ওই বরাদ্দ চেয়েছিলেন শাহরিয়ার আলম। কিন্তু তাঁর সেই চাহিদাপত্রটিও নাকচ করে দেন ভুলু।

  • জেলা পরিষদের একধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, ২০১১ সালের ১৫ ডিসেম্বর রাজশাহী জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান মাহবুব জামান ভুলু। এর পর থেকে সরকারি প্রায় ২০ কোটি টাকার সাধারণ বরাদ্দ আসে রাজশাহী জেলা পরিষদে। এর বাইরে রাজশাহী-২ (সদর) আসনের এমপি ফজলে হোসেন বাদশা বিশেষ বরাদ্দ নিয়ে এসেছেন প্রায় ৫ কোটি টাকা। সবমিলিয়ে গত চার বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকার বিভিন্ন কাজ করেছে রাজশাহী জেলা পরিষদ। এসব বরাদ্দের অনেকটায় লুটাপট হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

 

তবে এসব প্রসঙ্গে বুধবার ভুলুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

 

স/আর