রাজশাহী

চরম অব্যবস্থপনা রামেক হাসপাতালজুড়ে, চিকিৎসাসেবা শিকেয়

নিউজ ডেস্ক৫ সেপ্টেম্বর ২০২০৪ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক :

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ১৪ নম্বরে ওয়ার্ডে গতকাল সকাল ১১টার দিকে একজন রোগী ছটপট করছিলেন। কিন্তু তার কাছে কোনো চিকিৎসক যাননি। রোগীর স্বজন আলাউদ্দিন জানালেন, একবার একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক এসেছিলেন, কিছু নতুন ওষুধ দিয়ে গেলেন। সেগুলো খাওয়াতে বললেন। বড় ডাক্তারকে ফোন দিয়ে ওই ওষুধগুলো জেনে নিয়ে আমাদের লিখে দিলেন ইন্টার্ন চিকিৎসক। তার পরে ওষুধ কিনে নিয়ে এসেছি। খাওয়ানো হয়েছে। কিন্তু  কোনো লাভ দেখছি না। রোগীর ছটপটানি বন্ধ করা হয়নি। আমরাও চিন্তিত। কিন্তু বার বার ইন্টার্ন চিকিৎসককে ডেকে কোনো লাভ হবে না জেনে আর ডাকিনি।’

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, এভাবে শুক্রবার এলেই রামেক হাসপাতালজুড়ে ইন্টার্ন চিকিৎসক নির্ভর হয়ে পড়ে রোগীদের সম্পূর্ণ সেবা। এটি পুরনো রীতি। তবে হালে শুক্রবার ছাড়াও করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকেই অনেকটাই শুক্রবারের মতোই অবস্থা বিরাজ করছে অন্যান্য দিনগুলোতে। এর ওপর রয়েছে হাসপাতালের ওয়ার্ডের টয়লেটে পানি না থাকা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, আনসারদের দাপট, ইন্টার্নদের মারমুখি আচরণ ও অব্যবস্থাপনা। আর এসব মিলে রামেক হাসপাতালজুড়ে চিকিৎসাসেবা যেন এখন শিকেয় উঠেছে।

বিশেষ করে গুরুতর রোগীদের নিয়ে এসে চরম বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে স্বজনদের। সেবা তো দূরের কথা উদ্বিগ্ন স্বজনদের আশ্বস্ত করার মতোও কোনো চিকিৎসক বা সেবিকা থাকছে না কখনো কখনো। ফলে রোগীর মৃত্যু হারও বেড়েছে বলে মনে করছেন খোদ হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরায়।

গত চারদিন ধরে হাসপাতালের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন সুমন ইসলাম নামের এক রোগী। তিনি জানান, অন্যান্য ওয়ার্ডের চেয়ে এই ওয়ার্ডের চিকিৎসাসেবা একটু হলেও বেশি পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ওয়ার্ডের টয়লেটে দিনের মাত্র ২-৩ ঘন্টা পানি থাকছে। পানির ব্যবস্থা করতে বললে নার্সরা রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করছে। ওয়ার্ডের নার্সদের ব্যবহারও তেমন ভালো নয়। কোনো প্রয়োজনে ডাকতে গেলেও সহজে পাওয়া যায় না। নিজেরা ইচ্ছেকৃতভাবে কোনো রোগীর কাছে যান না। ডাকলেও পাওয়া যায় না সহজে।’

হাসপাতালের ২৫, ২৮, ২, ৩ নম্বর ওয়ার্ডসহ অধিকাংশ ওয়ার্ডেই পানির শঙ্কট লেগেই থাকে। হাসপাতালের ফ্যানের পাখাগুলোও ঘুরতে চায় না যেন। পুরনো জরাজীর্ণ ফ্যানগুলো দিনরাত ঘুরতে ঘুরতে তারা যেন ক্লান্ত। তাদেরই সেবা প্রয়োজন। কিন্তু দেখার কেউ নাই। আবার হাসপাতালেও ওয়ার্ডগুলোর বাইরে দুর্গন্ধে নিঃশ্বাস নেওয়া দায়। কতদিন পর পর ওয়ার্ডের আশপাশ পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়, সেটিও খোঁজ রাখে না কেউ-বলছিলেন রোগীর স্বজন আসলাম হোসেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একেবারে বাধ্য হয়ে হাসপাতালে এখনো রোগী নিয়ে পড়ে আছি। বাইরেও ভালো চিকিৎসা নাই। আবার অপারেশন করার মতো অতো টাকাও নাই। তাই দিনের পর দিন অপারেশনের আশায় পড়ে আছি রোগী নিয়ে। এই সময়ে দেখছি চিকিৎসাসেবা একেবারে নাই বললেই চলে। তবে গরিব মানুষের যাওয়ার কোনো জায়গা নাই বলে এখনো হাসপাতালেই ছুটে আসতে হচ্ছে।’
হাসপাতালের ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসক বসে আছেন। রোগীতে ঠাসা ওয়ার্ডটিতে অধিকাংশ রোগীই অভিযোগ করলেন চিকিৎসা তেমন নাই। শুক্রবারে তো একেবারেই নাই। শুধু ইন্টার্ন চিকিৎসকরা একবার সকালে এসে দেখে গেছে। সঙ্গে সিএ, রেজিষ্ট্রার ছিলেন। যদিও সিএ এবং রেজিষ্ট্রার পদধারী চিকিৎসকরাও এখনো শিখছেন। কিন্তু তারাই এখন দিনের বেশিরভাগ সময় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ভূমিকা পালন করছেন অন্যান্য দিনগুলোতেও।

হাসপাতালের এই ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডেই গত বুধবার ঘটে আলোচিত ঘটনা। ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে মায়ের লাশ আটকে ছেলেকে পুলিশে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পাশাপাশি মৃত রোগীর মুক্তিযোদ্ধা স্বামীকেও পেটানোর অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের এমন মারমুখি আচরণ যেন অতিরিক্ত হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ওয়ার্ডে কোনো রোগীর স্বজনরা সামান্য প্রতিবাদ করতে গেলেই দলবল নিয়ে ইন্টার্নরা ছুটে চলে আসে ওই ওয়ার্ডে। রোগী স্বজনদের হেনস্থার পাশাপাশি পিটিয়ে পুলিশে দেওয়া হয়। তাদের সঙ্গে হাসপাতালের আনসার সদস্যরাও কখনো কখনো যুক্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু এই আনসার সদস্যরা মূলত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বরত থাকেন। তবে এদের ভূমিকা সবময়ের জন্য থাকে রহস্যজনক। হাসপাতালের পুলিশও ঠুনকো অভিযোগ পেলেই রোগীর স্বজনদের ধরে নিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পুরো হাসপাতালজুড়েই যেন চরম অস্থিতরতা বিরাজ করছে।

জানতে চাইলে নগরীর রাজপাড়া থানার ওসি শাহাদত হোসেন বলেন, ‘চিকিৎসকদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই রোগীর স্বজনদের থানায় নিয়ে আসা হয়। মামলা হলে সেই স্বজনদের বিরুদ্ধে তদন্ত পূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কাউকে হয়রানির সুযোগ নাই।’

জানতে চাইলে রামেক হাসপাতালের উপপরিচালক সাইফুল ফেরদৌস বলেন, ‘করোনার কারণে হাসপাতালে চিকিৎসক শঙ্কট তো কিছুটা আছে। এরই মধ্যে অনেক চিকিৎসক, নার্স হাসপাতালের কর্মী করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। এখনো হচ্ছেন। তাতে চিকিৎসাসেবা কিছুটা ব্যাঘাত ঘটছে। তবে তার পরেও আমরা সাধ্যমত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি রোগীদের সেবা দিতে।’
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পানি শঙ্কট থাকার কথা নয়। তার পরেও যেসব ওয়ার্ডে এ সমস্যা তৈরী হচ্ছে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

ট্যাগ: