নিজস্ব প্রতিবেদক:
শ্রমকিদের দাবি আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে প্রতি বছর পহেলা মে সারা বিশ্বজুড়ে পালিত হয় মহান মে দিবস। আজকের এই দিনটি নানাভাবে পালিত হয় বিশ্বজুড়ে। যদিও এবার করোনাভাইরাস আতঙ্কে তেমন কোনো আয়োজন হচ্ছে না। তবে মহান এই দিবসের করোনা আতঙ্কে ঘরবন্দি রাজশাহীর শ্রমিকরা পড়েছেন চরম বিপাকে। কেউ কেউ অল্পকিছু ত্রাণ পেলেও দিনের পর দিন ঘরে বসে খেতে গিয়ে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছেন দিন এনে দিন খাওয়া শ্রমিকরা। এই রকম কয়েকজন শ্রমিককে নিয়ে সিল্কসিটিনিউজের আজকের আয়োজন-

রাজশাহী নগরীর তেরোখাদিয়া কাঁচাবাজার এলাকার আব্দুল্লাহ (৬৫)। পেশায় একজন নরসুন্দর (নাপিত)। ফুটপাতের ধারে ছোট্ট একটি টঙের মতো দোকান করে সেখানেই চুল-দাড়ি কেটে সংসার চালাতেন এই বয়সেও। কিন্তু করোনাভাইরাস আতঙ্কে রাজশাহীর সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের দোকান বাদে) বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁর সেই দোকানটিও এখন চলছে না। কিন্তু পেটে তো খেতে দিতে হবে আব্দুল্লাহ ও তার স্ত্রীকে। স্বাভাবিক সময় আব্দুল্লাহ প্রতিদিন চুল-দাড়ি কেটে যে ২-৩’শ টাকা আয় করতেন-তা দিয়ে কোনো মতে সংসারটা চলতো তাঁদের। কিন্তু এখন একেবারেই বন্ধ। দিনের পর দিন কাজ করতে না পেরে বাধ্য হয়ে বৃদ্ধ আব্দুল্লাহ গত কয়েকদিন ধরে ফেরি করে চুলি-দাড়ি কাটতে বের হয়েছেন।

ছোট্ট একটি ব্যাগের মধ্যে কাচি, ব্লেডসহ আনুসঙ্গিক জিনিসপত্র নিয়ে নগরীর পাড়ায় পাড়ায় ঘুরছেন তিনি। আর হাঁকিয়ে হাঁকিয়ে বলছেন, ‘চুল-দাড়ি কাটাবেন, চুল-দাড়ি কাটাবেন।’

বৃদ্ধ আব্দুল্লাহ জানান, ঘরে তাঁর একেবারে খাবার নাই। এভাবে ফেরি করে যে দুই-একশ টাকা পান তা দিয়ে কোনো মতে এখন সংসার চালাচ্ছেন। তার পরেও করোনার ভয়ে সহজে মানুষ চুল-দাড়ি কাটাতে চাচ্ছে না। এ কারণে সারাদিন ঘুরেও তিন-চার জনের বেশি মানুষকে পাওয়া যায় না চুল-দাড়ি কাটানোর জন্য। কিন্তু সংসার চালাতে এটি করা ছাড়া এই বয়সে তাঁর আর কোনো বিকল্প নাই। তাই রাস্তায় নেমেছেন এই করোনাভাইরাস আতঙ্কের মধ্যেও।
আব্দুল্লাহ জানান, দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রায় এক মাস হলো তাঁর। কিন্তু এখনো তিনি কোনো সহযোগিতা পাননি।
একই অভিযোগ করেন রাজশাহী নগরীর অদূরে কাটাখালি পৌরসভা এলাকার হাজরা পুকুর মহল্লার বাসিন্দা আহম্মদ আলী। তিনিও নরসুন্দর পেশায় নিয়োজিত। বাড়িতে দুই ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রী। দুই ছেলে দিনমজুরের কাজ করেন। কিন্তু তারাও এখন বেকার। ফলে বৃদ্ধ বাবা বাধ্য হয়ে অনেকটা চুরি করে গোপনে নগরীর চৌদ্দপাই ফায়ার সার্ভিস মোড়ে এলাকায় ভোর থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত টঙ্গের দোকানের মধ্যে চুল-দাড়ি কাটাচ্ছেন গত কয়েকদিন ধরে।
আহম্মদ আলী বলেন, ‘বাইরে থেকে দোকানে বেড়ার ঝাঁপি আটকায় দিয়ে ভিতরে দুই-একটা করে চুল-দাড়ি কাটছি বাবা। কি করবো আর, কয়দিন বসে থেকে খাবো। আমাদের বাড়িতে তো আর টাকা জমানো নাই যে বসে থেকে খাইলেও সংসার চলবে। তাই বাধ্য হয়ে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে গোপনে করে এখানে কাজ করছি। খুব সকাল সকাল আসি। এরপর বেলা ১২টার মধ্যেই দোকান বন্ধ করে বাড়ি চলে যায়। প্রশাসনের ভয়ে যদি কিছু বলে। এ কারণে ভয়ে কখনো কখনো এলাকাতেও ঘুরে ঘুরে চুল-দাড়ি কাটি।’

মাইক্রোবাস চালক জিয়া। বাড়ি নগরীর খড়খড়ি কৃষ্টগঞ্জের মোড়। তিনি বলেন, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বাড়িতে বসে আছি। গাড়িও চলছে না। কমিশনে ভাড়া মারি। কিন্তু গাড়ী বন্ধ হয়ে থাকায় আর কোনো আয় নাই। এখন সংসার চালানো খুব দায় হয়ে পড়েছে। খেয়ে-না খেয়ে থাকতে হচ্ছে। এরই মধ্যে ধার-দেনাও হয়ে গেছে। কিন্তু কোনো সাহায্য পাইনি। কারো কাছে হাত পাততেও পারছি না। কিভাবে চলবো সামনের দিনগুলো এ নিয়ে টেনশনে ঘুম আসছে না। সেহরি ইফতারীতেও মিলছে না ভালো কিছু খাবার। এতোটা দুর্ভোগ কখনো সহ্য করতে হয়নি।’
রাজশাহী নগরীর খড়খড়ি এলাকার আরেক প্রাইভেট চালক আনিস বলেন, ‘গাড়ী চালিয়ে কোনো মতে সংসার চালায়। সরকার রেশন কার্ড দিচ্ছে আমাদের মতো গরিব মানুষদের অল্প মূল্যে জিনিসপত্র কেনার জন্য। কিন্তু পারিলা ইউনিয়নের স্থানীয় নেতারা নিজেদের লোকদের সেই কার্ড করে দিচ্ছে। ফলে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। কার্ড পেলেও অল্প টাকায় জিনিসপত্র কিনে খেয়ে-দেয়ে চলতে পারতাম।’
দুর্গাপুর উপজেলার কুশাডাঙ্গা এলাকার ভ্যানচালক কাবিল বলেন, ‘ভ্যান চালায়। কিন্তু রাস্তায় ভ্যান নিয়ে উঠলেই পুলিশের বাধা। আবার মানুষও পাওয়া যায় না। খাবো কি? কেউ কোনো অনুদানও দেয়নি।’
এদিকে ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাজশাহী স্টেশনের কুলিরাও পড়েছেন বিপাকে। কর্মহীন হয়ে পড়া এই মানুষগুলোকে সংসার চালাতেও হিমশিক খেতে হচ্ছে।
র্গাপুরের ট্রাক শ্রমিক লালন বলেন, ‘করোনা আতঙ্কে ট্রাকও ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। আয়ের পথ প্রায় বন্ধ। এই অবস্থায় খুব বিপাকে পড়েছি সংসার চালাতে গিয়ে। রাস্তায় বের হলেই শ্রমিক সংগঠনের নামে ধাপে ধাপে দিতে হয় চাঁদা। কিন্তু এই বিপদের সময় সংগঠন কোনো ট্রাক শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না।’
একই অবস্থা রাজশাহীর বাস শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। প্রায় তিন হাজার বাস শ্রমকিদের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি রাজশাহীতে। ফলে চরম কষ্টে আছেন এসব শ্রমিকরাও।
নগরীর বহরমপুর এলাকার বাসিন্দা সাহেদা খাতুন জানান, তিনি পরের বাড়িতে কাজ করি। এখন কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে দুই দফায় ১৫ কেজি চাল পেয়েছেন। এক লিটার তেল পেয়েছেন। পেয়েছেন হাঁফ কেজি ডাল। কিন্তু সংসারের অন্যান্য জিনিসপত্র কিনতে পারছেন না টাকার অভাবে। আবার ঘরের চালও প্রায় শেষের দিকে। এভাবে আরও কিছুদিন থাকতে হলে সংসার চালানো দায় হয়ে পড়বে তাঁর- দাবি করেন তিনি।

গোদাগাড়ীর নরেন টুডু বলেন, তাদের পরিবারের চার পুরুষ সদস্য সবাই দিনমজুর। তারা কখনো রাজমিস্ত্রীর কাজ, কখনো ধান কাটার কাজ আবার কখনো ধান রোপনের কাজসহ যখন যেটা পান, তখন সেটা করে সংসার চালান। কিন্তু করোনা আতঙ্কে তাদের কাজও প্রায় বন্ধ। ফলে সংসার চালাতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন তাঁরা। যদিও এরই মধ্যে সরকারি ১০ কেজি চাল পেয়েছেন তিনি। কিন্তু ওই চাল চারদিনেই শেষ হয়ে গেছে।’
এদিকে রাজশাহী জেলা প্রশাসক হামিদুল হক বলেন, ‘কোনো দরিদ্র মানুষ যেন না খেয়ে থাকেন সে ব্যবস্থা আমরা করছি। বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি রেশন কার্ড করে দেওয়া হচ্ছে। তার পরেও যদি রেশন কার্ড নিয়ে কোথাও অনিয়ম হয় আমরা সেসব জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিব।’
স/আর








