নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজশাহীর দুর্গাপুরে সাবেক চেয়ারম্যানের ২২০ বিঘা জলাশয়সহ মাছ দখল করে নিয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। গত মার্চ মাসে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর নিকট পরাজিত হওয়ার সপ্তাহ খানেকের মাথায় নওপাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আজাদ রেজাউল করিমের লিজ নেওয়া বিলটি দখল করে নেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

উপজেলার পদ্ম বিলের শতাধিক কৃষকের নিকট থেকে লিজ নেওয়া এ বিলটিতে ৬ মাস চাষ করেন ওই সাবেক চেয়ারমান নেতা। আর বাকি সময়টা কৃষকরা ধানচাষ করেন।
কৃষকদের ধানচাষের সুবিধার জন্য আজাদ রেজাউল করিম একটি গভীর নলকূপও স্থাপন করে দিয়েছেন। ওই নলকূপ থেকে বিনা পয়সায় পানি সেচ দিয়ে কৃষকরা সেখানে ধান উৎপাদন করেন। কিন্তু বিলটি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দখলে নেওয়ায় এবার কৃষকদের ধানচাষও পড়েছে হুমকির মুখে।
কৃষকরা এ নিয়ে প্রতিবাদ করতে গেলেও তাদের নানাভাবে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। ফলে তাদের মাঝে দেখা দিয়েছে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক।
সরেজিমন গত শুক্রবার দুর্গাপুরের পদ্ম বিল ঘুরে দেখা যায়, গোটা বিলে থৈ থৈ করছে পানি। এরই মধ্যে মাছেরা মাঝে মাঝেই নাড়া-চাড়া দিয়ে উঠছে। তবে মাস দুয়েক পরেই এই পানি একেবারে তলানিতে গিয়ে নামবে। তখন মাঝ বিলের কিছু নিচু জমিতে গিয়ে ওই মাছগুলো আশ্রয় নিবে। যেখানে প্রায় সারা বছরই পানি থাকে। এরপর ওই মাছগুলো ধরার উপযোগী হবে।
- এভাবেই গত ৫ বছর ধরে ওই বিলের জমি কৃষকদের নিকট থেকে লিজ নিয়ে মাছ চাষ করে আসছিলেন নওড়পাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি আজাদ রেজাউল করিম। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের বর্ষার শুরুতেই ওই বিলে প্রায় ১৫ লাখ টাকার মাছের পোনা ছাড়েন তিনি।
এই পোনাগুলো দিন দিন বড় হয়ে এখন একেকটার ওজন প্রায় দেড় থেকে দুই কেজি আকারে পরিণত হয়েছে। বিলে মাছচাষের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ করতে হয়েছে।
- এছাড়াও পাহারাদারসহ আনুসঙ্গিক খরচ মিলিয়ে রেজাউল করিমের প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে গত কয়েক মাসে। কিন্তু সেই বিলটিই গত ২৮ মে নওপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ পরে দখলে নেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
আওয়ামী লীগ নেতা সাইফুল ইসলাম নির্বাচিত হওয়ার পরপরই তাঁর অনুসারী স্থানীয় ৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি সাইফুল ইসলাম, সহসভাপতি মেরাজুল ম-ল, কর্মী মোজাম্মেল হকসহ ১৫-২০ জনের একটি দল ওই বিলটি দখল করে নেন।
স্থানীয় গোপালপুর ও ইউসুফপুর এলাকার বাসিন্দা এবং কৃষক মজিবর রহমান, আব্দুল ওয়াহেদ, আমির চাঁদ, নসের আলী, আব্দুল কাদের, রুপচাঁদ অনেকে অভিযোগ করে জানান, সাবেক চেয়ারম্যান আজাদ রেজাউল করিম তাদের জমি লিখিতভাবে লিজ নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে মাছ চাষ করে আসছিলেন।
- বিনিময়ে কৃষকদের বিঘা প্রতি অর্থ প্রদান করা ছাড়াও সুষ্ক মৌসুমে বিনা খরচে ধানচাষের জন্য রেজাউল করিম ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি গভীর নলকূপও স্থাপন করে দেন বিলে। ওই নলকূপের পানি দিয়েই কৃষকরা ইরি-বোরো মৌসুমে ধানচাষ করেন।
আর বর্ষা মৌসুমে বিল ডুবে গেলে সেখানে রেজাউল করিম মাছ করে আসছিলেন। কিন্তু বিলটি আওয়ামী লীগের নেতার্কীরা দখল করে নেওয়ার কারণে আসছে ইরি-বোরো মৌসুমে কৃষকদের ধানচাষও হুমকির মুখে পড়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, সাবেক চেয়ারম্যান রেজাউল করিম তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি গভীর নলকূপ বসিয়ে দিয়েছেন বিলে। এর জন্য কৃষকদের কোনো অর্থও দিতে হয় না। তাকে। উপায়ন্তার জমি লিজ বাবদ কৃষকরাই কিছু করে হলেও অর্থ পান। কিন্তু এখন দুই কূলই হারাবে কৃষকরা।
- বিলের দখল না থাকায় রেজাউল করিম কৃষকদের ধান চাষের জন্য আর হয়তো পানি সেচ দিতে পারবেন না। ফলে প্রায় ২২০ বিঘা জমিতে আগামী ইরি-বোরো মৌসুমে কৃষকদের ধানচাষও পড়বে হুমকিরমুখে।
পানি না পেলে কৃষকরা ধানের জমিতে নামতেই পারবেন না বলেও দাবি করেন। আবার সাবেক চেয়ারম্যান বিলে মাছচাষ করতে না তাঁর নিকট থেকে লিজের প্রতি বছরের টাকাও হয়তো আর পাবেন না কৃষকরা।
বিল দখলকারীদের অন্যতম নেতা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের জমি আমরা দখল করেছি। কোনো লিজ দেওয়া হয়নি কাউকে, আমরাই সেখানে মাছচাষ করি। এবারো করছি।’
এদিকে সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আজাদ রেজহাউল করিম অভিযোগ করে বলেন, কৃষকদের কথা বিবেচনা করেই ওই বিলে মাছচাষ শুরু করি। কারণ বিলে অন্তত ৬ মাস পানি থাকে।’
তিনি আরো বলেন, ‘মাছচাষ শুরু হওয়ার পরে এখন সেখানে ওই ছয় মাসে অন্তত ৩০ লাখ টাকার মাছ উৎপাদন হয়। এর অন্তত অর্ধেক টাকায় দেওয়া হয় কৃষকদের জমির লিজ গ্রহণ বাবদ। পাশাপাশি সুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা বিনামূলে ধানচাষ করতেও পারেন। এতে করে কৃষকরা দুই দিক থেকেই উপকৃত হোন। কিন্তু সেই বিলটিই স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দখল করে কৃষকদেরও যেমন ক্ষতিরমুখে ফেলেছে, তেমিন আমারও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতি করেছে।’
রেজাউল করিম অভিযোগ করে জানান, আওয়ামী লীগ নেতা সাইফুল ইসলাম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পরপরই তার অনুসারীরা এ বিলটি দখর করেছেন। এ নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নজরুল ইসলামসহ বিভিন্ন মহলে অভিযোগ করেছি আমি এবং বিলের কৃষকরাও। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। বিষয়টি সমঝোতা করে দেওয়ার কথা বলেও উপজেলা চেয়ারম্যানও কালক্ষেপন করছেন। এতে করে আগামীতে ওই বিলে ধানচাষও পড়বে হুমকিরমুখে।’
বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার ওই বিলে কোনো জমি নাই। যাদের জমি তারাই দখল করে মাছচাষ করছে। এখানে কোনো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী আছে কিনা বলতে পারবো না।’
স/আর









