রাজশাহী

রাজশাহী বিজ্ঞান স্কুল: নিয়োগের নামে প্রতারণার ফাঁদে সহস্রাধীক বেকার যুবক

নিউজ ডেস্ক৭ নভেম্বর ২০১৬৪ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজশাহীতে সদ্য জেগে উঠা একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেখে প্রতারণার ফাঁদে পড়েছেন সহস্রাধিক বেকার যুবক। রাজশাহী বিজ্ঞান স্কুল নামের ওই প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়োগ লাভের আশায় ব্যাংক ড্রাফট ও এককালীন অনুদান এবং প্রশিক্ষণের নামে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

 

আর সেই প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়ে নি:শ্ব হতে হচ্ছে বেকার শিক্ষিত যুবকদের। যারা অধিকাংশই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। এ নিয়ে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে চাকরির আবেদনকারী যুবকদের মাঝে। প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষা দানের নামে বাণিজ্যে নেমেছে বলেও দাবি করেছেন ভূক্তভোগীরা।

 

 

  • সূত্র মতে, গত ২৬ আগস্ট রাজশাহীর একটি দৈনিকে এবং একটি অনলাইন বিজ্ঞাপনী সংস্থায় রাজশাহী বিজ্ঞান স্কুলের পক্ষ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। শিক্ষক-কর্মচারীসহ মোট ৩০টি পদের ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে জুনিয়র শিক্ষক এবং কর্মচারীদের জন্য ৪০০ টাকার অফেরতযোগ্য ব্যাংক ড্রাফট এবং সহকারী শিক্ষক এবং সিনিয়র শিক্ষকদের জন্য ৫০০ টাকা করে ব্যাংক ড্রাফটসহ আবেদন করতে বলা হয়।

 

এর বিপরীতে প্রায় দেড় হাজার আবেদন জমা পড়ে। যাদের প্রত্যেকের নিকট থেকে আদায় করা হয় ৪০০ ও ৫০০ টাকার ব্যাংক ড্রাফট। এরপর গত ১৪ অক্টোবর লিখিত পরীক্ষার আয়োজন করে রাজশাহী বিজ্ঞান স্কুল নামের ওই প্রতিষ্ঠানটি। এরপর থেকে চাকরি প্রার্থীদের আলাদাভাবে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ডেকে নিয়ে এক থেকে তিন লাখ টাকা করে আদায় করছে প্রতিষ্ঠানটি।
নিয়োগ লাভের জন্য এককালিন অনুদান ও প্রশিক্ষণের কথা বলে ওই টাকা আদায় করছেন প্রতিষ্ঠানের মালিক শামসুজ্জামান তুহিন। আর টাকা না দিলে লিখিত পরীক্ষায় উর্তীন হলেও তাদের চাকরি দিতে সরাসরি অপারগতা প্রকাশ করছেন তিনি।

  • এমনই একজন ভূক্তভোগী আইয়ুব আলী গতকাল অভিযোগ করেন, তিনি জুনিয়র শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে ৫০০ টাকা দিয়ে ব্যাংক ড্রাফট করেছিলেন। তার নিয়োগ পরীক্ষার রোল ছিল ১৪৯।

 

এরপর তিনি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৫ম স্থান লাভ করেন। জুনিয়র শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়ার কথাও রয়েছে ৫ জনকে। কিন্তু আইয়ুবকে ওই প্রতিষ্ঠানের মোবাইল থেকে ফোন করে ডেকে নিয়ে তার নিকট থেকে দেড় লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাঁকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না বলেও দাবি করেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শামসুজ্জামান তুহিন।
এরপর মোবাইল ফোনে আইয়ুবের কাছে আবারো দেড় লাখ দাবি করেন তুহিন। টাকা দাবির প্রমাণ রাখার জন্য আইয়ুব সেটি রেকর্ড করেও রাখেন। যেটি তিনি সরবরাহ করেছেন।

 

 

এদিকে জুনিয়র শিক্ষক হিসেবে এরই মধ্যে এক লাখ টাকা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়োগ লাভ করা মধ্যবিত্ত পরিবারের এক যুবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বেকার বসে থেকে থেকে বাসায় বাবা-মা-ভাই-বোনদের কথা শুনতে হয়। ৮ হাজার টাকা মাসিক বেতনের চাকরির সার্কুলার দেখে আবেদনও করি। কিন্তু নিয়োগ পরীক্ষার পরে আমার নিকট থেকে এক লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। ওই টাকা এককালিন অনুদান এবং শিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলে নিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক। এখন শুনছি যতদিন প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক অবস্থায় না যাবে, ততদিন বেতনও দিবে না। তাহলে আমি এখন যাব কোথায়। আবার টাকা ফেরত চাইতে গেলেও আমাকে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’
সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ‘রাজশাহী বিজ্ঞান স্কুল’ নামের প্রতিষ্ঠানটি নগরীর নওদাপাড়া এলাকায় একটি চার তলার বাড়ির দুটি ফ্লাট ভাড়া নিয়ে কিছুদিন আগেই সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়। এরপর তেমন কোনো অবকাঠামোগত সুবিধা ছাড়ায় শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞাপন এবং শিক্ষার্থী ভর্তির বিজ্ঞাপন প্রচার করতে শুরু করা হয় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে।

 

আর চটকদারী ওই বিজ্ঞাপন দেখে হুমড়ি খেয়ে পড়েন রাজশাহীসহ আশে-পাশের বিভিন্ন জেলার বেকার যুবকরা। যারা এখন প্রত্যেকেই প্রতারণার শিকার হয়েছেন। আগামী ১ জানুয়ারি থেকে প্রতিষ্ঠানটি প্লে-গ্রুপ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান শুরু করার কথা রয়েছে।

ব্যাংক ড্রাফট নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির মালিক শামসুজ্জামন তুহিন বলেন, নতুন প্রতিষ্ঠান খুলেছি। নিয়োগ পরীক্ষাতেও অনেক টাকা ব্যয় হয়েছে। তাই ব্যাংক ড্রাফট নেওয়া হয়েছে। তবে বেশি লোক আবেদন করেনি মাত্র ১৪৯ জন আবেদন করেছে। আবার অনেকে ৩০০ টাকা দিয়েও ব্যাংক ড্রাফট করেছে, তাদের নিয়োগ পরীক্ষা দিতে সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
নিয়োগ দেওয়ার নামে এক থেকে তিন লাখ আদায় প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রথমে সেটি অস্বীকার করেন শামসুজ্জামান তুহিন। তবে টাকা চাওয়ার প্রমাণ আছে বলে তাঁকে জানানো হলে তিনি বলেন, ‘শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনসহ দুটি উৎসব ভাতা এবং কল্যাণভাতাও দেওয়া হবে। তাই ওই টাকা চাওয়া হয়েছে। তবে কেউ মেধাবী হলে তাদের জন্য ছাড় দেওয়া হচ্ছে।