নিজস্ব প্রতিবেদক:
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) ‘বরেন্দ্র এলাকায় খালে পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে সেচ সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের ১৮ কোটি টাকার দরপত্রে ব্যাপক কারসাজি করে কাজ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। বঞ্চিত প্রতিষ্ঠানগুলির পক্ষে মঙ্গলবার কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবকে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।
প্রতিযোগী একাধিক প্রতিষ্ঠান অভিযোগ করে বলেছে প্রকল্পের প্রথমদফা দরপত্রে নাভানা ইঞ্জিনিয়ারিং অযোগ্য বিবেচিত হয়েছিল। তখন প্রতিষ্ঠানটির অনুরূপ কাজের অভিজ্ঞতা ছিল না বলে। তবে ঠিক এক মাসের মাথায় এই নাভানা ইঞ্জিনিয়ারিং অনুরূপ কাজের অভিজ্ঞতার সনদ জমা দেন দ্বিতীয়বার দরপত্রের সঙ্গে। বিষয়টি বিএমডিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজসে করা হয়।
তবে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে গুরুতর যে অভিযোগটি আনা হয়েছে সেটি হলো নাভানার অভিজ্ঞতার সনদটি জাল। এই জাল সনদেই নাভানাকে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন করেছে বিএমডিএ। জানা গেছে, নাভানাকে প্রকল্প বরাদ্দের ২০ শতাংশ কম দরে কাজটির কার্যাদেশ দেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ অনুসন্ধানে জানা গেছে, নাভানা ইঞ্জিনিয়ারিং, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে কাজ করার অভিজ্ঞতার একটি সনদ দরপত্রের যোগ্যতা হিসেবে যুক্ত করেছেন। তবে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) নারায়ন চন্দ্র দেবনাথ জানিয়েছেন, নাভানাকে এনএসসি থেকে কোনো সনদ দেওয়া হয়নি কারণ তারা এখানে কোনো কাজ করেননি। এছাড়া বিএমডিএ থেকেও জানতে চাওয়া হয়েছিল নাভানার ব্যাপারে। আমরা বলেছি অভিজ্ঞতার সনদা এনএসসি থেকে নাভানাকে দেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগে জানা গেছে, ২০১৫ সালে বরেন্দ্র এলাকায় খালে ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণ করে সেচ সুবিধা বর্ধিতকরণের মাধ্যমে নওগাঁর আত্রাই ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের ৩ হাজার ৭৮০ হেক্টর জমি সেচের আওতায় নেওয়ার লক্ষ্য স্থির করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় নিবিড় সেচ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে বছরব্যাপী প্রায় ৩৭ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন বাড়তি খাদ্যশস্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে বিএমডিএ।

একই সঙ্গে প্রকল্পের আওতায় জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো এবং পরিবেশের ভারসাম্য উন্নয়নের লক্ষে ফলদ, বনজ এবং ঔষধি বৃক্ষরোপণ করা, প্রকল্প এলাকায় শ্রমিক এবং প্রান্তিক চাষিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন করাও প্রকল্পের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সূত্র মতে, দুই বছর মেয়াদি প্রকল্পটির আওতায় বিভিন্ন প্যাকেজের জন্য গত সেপ্টেম্বরে দরপত্র আহ্বান করা হয়। প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত দুটি এলাকায় ২৫০ মিলিমিটার ডায়া পাইপলাইন নির্মাণ ও ৪০০ মিলিমিটার ডায়া পাইপলাইন নির্মাণ কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মুলত: এই দুটি প্যাকেজের দ্বিতীয়দফার দরপত্রের কাজ সম্প্রতি সম্পন্ন করে বিএমডিএ। আর এ দুটি প্যাকেজেই বড় ধরণের ঘাপলার অভিযোগ উঠেছে।
নথিপত্র যাচাই করে দেখা গেছে গত সেপ্টেম্বরে এই প্রকল্পের প্যাকেজ দুটির দরপত্রে নাভানা অংশগ্রহণ করে। তবে প্রয়োজনীয় কাজের অভিজ্ঞতা না থাকায় তারা অযোগ্য বিবেচিত হয়। কম দর দিলেও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের আপত্তির মুখে নাভানাকে কাজটি দিতে পারেনি বিএমডিএ। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যোগ্য প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও রহস্যজনক কারণে দরপত্রটি বাতিল করে।
বিএমডিএর সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রথম ও দ্বিতীয়বার দরপত্রে মোট ৪টি করে প্রতিষ্ঠানই অংশ গ্রহণ করেন। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো, নাভানা ইঞ্জিনিয়ারিং, আরএফএল প্লাস্টিক লিমিটেড , ন্যাশনাল পলিমার লিমিটেড ও এ-ওয়ান পলিমার লিমিটেড। এর মধ্যে আরএফএল প্লাস্টিক লিমিটেড ছিল দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা এবং সংশ্লিষ্ট কাজের যোগ্য ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান। আরএফএলের অভিযোগে আরো বলা হয়েছে প্রথমদফা নাভানাকে অযোগ্য ঘোষণার সময় আরএফএল-ছিল দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা। কিন্তু রহস্যজনক কারণে কাজটি তাদের দেওয়া হয়নি। দ্বিতীয়দফায় নাভানাকে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসাবে কাজটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএমডিএর প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী সামশুল হুদা বলেন, প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে কম দর দেয়ায় নাভানাকে যোগ্য মনে করা হয়েছে। প্রথমবার নাভার কাগজপত্রে ঘাটতি ছিল। এজন্য তাদের অযোগ্য করা হয়। তবে দ্বিতীয়বার তাদের কাগজপত্র ঠিক ছিল বলে যোগ্য করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতার চেয়ে কিছুটা কমদর দেওয়ায় নাভানাকে কাজটির জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। অভিজ্ঞতা ও অন্যান্য বিষয় আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হয়েছে। তবে নাভানার অভিজ্ঞতার সদনটি যাচাই করা হয়েছে কি-না জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা কোনো উত্তর দেননি। এদিকে বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক আব্দুর রশিদও একই ধরণের যুক্তি তুলে ধরেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সরকারের ই-টেন্ডারিংয়ের মনিটরিং প্রতিষ্ঠান সিপিটিইউ’র মহাপরিচালক ফারুক হোসেন বলেন, কোনো টেন্ডার চূড়ান্ত করার আগে দেখতে হবে প্রতিষ্ঠানটির যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও সুনাম ঠিক আছে কি-না। আবার কাগজপত্র বিশেষ করে অভিজ্ঞতার সদনগুলি ঠিক আছে কি-না দেখা দরকার। অনেক সময় দেখা যায়, প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়েও অনেক কম দিয়ে কাজ বাগিয়ে নেয়, পরে বিভিন্ন উপায়ে দর বাড়ানো হয়। এতে সরকারের বিপুল আর্থিক ক্ষতি যেমন হয় তেমনি অযোগ্য প্রতিষ্ঠান কাজ ফেলে পালিয়ে যায়।
এদিকে জাল অভিজ্ঞতার সনদ দিয়ে কাজ নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে নাভানা ইঞ্জিনিয়ারিং এর ডিজিএম আতিউর রহমান জানান, আমরা অভিজ্ঞতার দুটি সনদ দিয়েছি। একটি ওয়াসার ও অন্যটি এনএসসির। তিনি দাবি করেন সবকিছু ঠিক আছে। যোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে নাভানা কাজটি পেয়েছে। নাভানা অভিজ্ঞতার সনদ জাল করেনি-দাবি করেন তিনি।
স/আর









