রাজশাহী

অবশেষে কাল বাগমারার ১৬ ইউপিতে নির্বাচন: উত্তেজনা

নিউজ ডেস্ক৩০ অক্টোবর ২০১৬৮ মিনিট পড়া

শামীম রেজা, বাগমারা:
রাজশাহীর বাগমারায় আগামীকাল সোমবার (৩১ অক্টোবর) অবশেষে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে স্থগিতকৃত নির্বাচন। এর আগে বিগত ৭ মে উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নে সহিংসতার আশঙ্কায় ভোট স্থগিত ঘোষণা করেছিল নির্বাচন কমিশন।

 

তবে শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় দফায় তফশিল ঘোষণা করে কাল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এদিকে এ নির্বাচনকে ঘিরে সরগরম উপজেলার ১৬ টি ইউনিয়ন। কয়েকটি ইউনিয়নে নির্বাচন ঘিরে আছে উত্তেজনাও। এর মধ্যে আউচপাড়া ইউনিয়নে এবং গোলাকান্দি ও হামিরকুৎসা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকেদের মাঝে রয়েছে চরম উত্তেজনা। এই প্রথম দলীয় প্রতীকে বাগমারায় ইউনিয়ন নির্বাচন হচ্ছে। তাই এ নিয়ে দলীয় প্রভাবও ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপক জোরেসরে-এমনটিও অভিযোগ করেছেন অন্য প্রার্থীরা।

 

নির্বাচনকে ঘিরে প্রচার-প্রচারণা শেষে এখন চলছে ভোট গ্রহণের প্রস্তুতি। মাঝে রাতটুকু পোহালেই কাল ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। আর এ সময়ে এসে প্রার্থীদের নিয়ে চায়ের স্টল, হাট-বাজারসহ সর্বত্রই চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে আঞ্চলিক ও নিজস্ব কিছু ইমেজে জন প্রতি ভোট অনুকূলে ভিড়ছে প্রার্থীদের ক্ষেত্রে।

 

কোনো প্রার্থী কার চেয়ে যোগ্য কে হচ্ছেন ইউপি’র চেয়ারম্যান সর্বত্রই আলোচনার ঝড় উঠেছে গ্রাম-গঞ্জে। এমন এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থীর হাল-চাল।

 

সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, বড়বিহানালী ইউনিয়নের আ’লীগের রেজাউল করিম ও বিএনপি’র মাহামুদুর রহমান মিলন। নির্বাচনে আ’লীগ সমর্থিত রেজাউল করিম ও বিএনপি’র সমর্থিত উপজেলা বিএনপি’র সহ সভাপতি মরহুম রফিকুল ইসলাম রফিকের পুত্র মাহমুদুর রহমান মিলন দু’জন প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাডি লড়াই হবে এমনটি হাওয়া বইছে সর্বত্রই।

 

ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রফিক মারা যাবার পর পদ খালি হয়ে পড়ে। নিয়মতান্ত্রিক ভাবে ইউপির উপ নির্বাচনে ইউনিয়ন আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক ইয়াছিন আলীকে হারিয়ে মাহমুদুর রহমান মিলন বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। এর পর আবারো আগামী ৩১ অক্টোবর ইউপি নির্বাচন। নির্বাচনে বিএনপি’র প্রার্থী মাহমুদুর রহমান মিলন বাবার ত্যাগ, তিতিক্ষা ও দলীয় পরিচয় নিয়ে ধানের শীষ নিয়ে মাঠ দখলে নিয়েছেন। তিনি পিতার গুণগান গেয়ে অনেকটা এগিয়ে রয়েছেন।

 

একই ভাবে সরকারী দলীয় হওয়ার সুবাধে আ’লীগ সমর্থিত রেজাউল করিম নিজের অবস্থা দৃঢ় করতে নৌকা প্রতীক নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

 

বাসুপাড়া ইউনিয়নে নির্বাচনকে ঘিরে এখন ইউনিয়ন সরগম। শেষ সময়ে দলীয় পরিচয় ও ব্যক্তি ইমেজে আ’লীগ সমর্থিত ইউনিয়ন আ’লীগের সভাপতি মাষ্টার লুৎফর রহমান নৌকা প্রতীকে নিয়ে ভোট চেয়ে ফিরছেন। বিগত দিনে চেয়ারম্যান থাকার ফলে তার নিজস্ব ভোট ব্যাংক রয়েছে । অপর দিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী দেউলিয়া গ্রামের আলহাজ আব্দুল জব্বার মন্ডল বীর মুক্তি যোদ্ধা পরপর ৩ বার এক সময়ে  চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে তিনি ইউনিয়নে পুরাতন লোকজনের বেশ আস্থাভাজন হিসেবে মাঠে রয়েছেন।

 

এছাড়া বিএনপি’র প্রার্থী দলের তরুন উজ্জিবীত নেতা জিল্লুর রহমান দেউলিয়া গ্রামের কৃতি সন্তান। মীর পরিবারের সদায় হাস্যজ্জ্বল, নম্র ও ভদ্র ছেলে হিসেবে তার বেশ সুনাম। বিগত ৭ মে উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নে অনিয়ম ও সহিংসতার কারণে ভোট বন্ধ হলেও সে মাঠে জনগণের কাছে ছিল সে হিসেবে তার মাঠে অবস্থান ভালো বলে জানিয়েছেন একাধিক ভোটার।

 

অপরদিকে উপজেলার গনিপুর ইউনিয়নের আ’লীগের এসএম এনামুল হক, বিএনপি’র এ্যাড. মনিরুজ্জামান রঞ্জু, জাতীয় পার্টির আফছার আলী, স্বতন্ত্র হারুন অর রশীদ সহ ৪ জন প্রাথী নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে লড়ছেন। এখানে মুলত বিএনপি ও আ’লীগের সমর্থিত প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হবে। রঞ্জু বাগমারা উপজেলা বিএনপির সভাপতি মুখলেছুর রহমানের বড় ভাই হওয়াতে দলীয় ইমেজে ধানের শীষে ভোট ধরে রাখতে চেষ্টারত রয়েছেন। সাবেক চেয়ারম্যান আ’লীগে বিদ্রোহী প্রার্থী হারুনুর রশিদকেও তালিকা থেকে বাদ দেয়া যাচ্ছে না।

 

আ’লীগের মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী এসএম এনামুল হক চকমহব্বতপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে সাবেক প্রধান শিক্ষক আমীর উদ্দিনের ছেলে। পিতার নাম জসের সাথে দলীয় হিসেবে পাশ্ববর্তি উপজেলা মোহনপুরের সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিনের একান্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু তার আর্শিবাদে মাঠে চুষে ফিরছেন নৌকা প্রতীক নিয়ে। সেই দিক দিয়ে দলের লোক  দলে ভিড়ে রাখতে পারলে সেই হবে চেয়ারম্যান এমনটি ভোটারদের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

 

কাচারী কোয়ালীপাড়া ইউনিয়নে আ’লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী আয়েন উদ্দীন,বিএনপি’র আব্দুল গাফ্‌ফার মাস্টার,জাতীয় পার্টির মোজাম্মেল হক, বিএনপি নেতা আব্দুস সামাদ প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন। ছোট ইউনিয়ন হওয়ার ফলে অল্প ভোটের ব্যবধানে দলীয় সমর্থন আর ব্যক্তিগত ইমেজ দুটোই যেন প্রাধান্য পাচ্ছে এখানে।

 

আউচপাড়া ইউনিয়নে ৭ জন প্রার্থী রয়েছেন চেয়ারম্যান পদে এরা হলেন আ’লীগ মনোনীত সরদার জান মোহম্মাদ, বিদ্রোহী প্রার্থী শহিদুল ইসলাম শহিদ, বিএনপি মনোনীত দলীয় প্রার্থী ডিএম.সাফিকুল ইসলাম, চেয়ারম্যান মাহাতাবুর রহমান মাতু,জাতীয় পার্টির আঃ রাজ্জাক, জামায়াত প্রার্থী আসাদুল্লাহ, স্বতন্ত্র প্রার্থী রানা। ৭ জন প্রার্থী থাকলেও ভোটারদের ধারনা নির্বাচনের মাঠে লড়াই হবে দলীয় সমর্থিত দুই প্রার্থী ডিএম সাফিকুল ইসলাম ও আ’লীগের প্রার্থী সরদার জান মোহম্মাদের মধ্যে।

 

শুভডাঙ্গা ইউনিয়নে আ’লীগের আব্দুল হাকিম প্রামানিক,বিএনপির দলীয় প্রার্থী আব্দুল জলিল প্রামানিক ও জাতীয় পার্টির আব্দুস সাত্তার। বর্তমান চেয়ারম্যান তার জনপ্রিয়তার কারনে বিপুল ভোট পাওয়ার আসা করছেন তিনি অন্যদিকে ইউনিয়ন আ’লীগের সভাপতি সাবেক ছাত্রনেতা আ’লীগের একক প্রার্থী হওয়ায় গণসংযোগ আর পথসভা করে সময় পার করেছেন। এই ইউনিয়নে জাতীয় পার্টির কথা মানুষ ভাবছেনা। কেবল লোকের মুখে শোনা যাচ্ছে হাকিম আর জলিল। কে হয় চেয়ারম্যান সেটাই দেখার পালা।

 

মাড়িয়া ইউনিয়নে আ’লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী আসকান আলী, বিএনপির দলীয় প্রার্থী রফিকুল ইসলাম, আ’লীগ পন্থি আকবর আলী,শাহজাহান আলী, ও রেজাউল করিম। স্থগিতকৃত নির্বাচনের সময়ে আকবর আলীর উপর হামলার পর থেকে লোকজন তার প্রতি একটু বেশি আগ্রহী। আ’লীগ মনোনীত প্রার্থী বসে থাকার না সে কারনে এবার মাড়িয়া ইউনিয়নে দলীয় প্রভাবটাই কাজে লাগাতে চাচ্ছে প্রার্থীরা।

 

দ্বীপপুর ইউনিয়নে আ’লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী বিকাশ চন্দ্র ভৌমিক,বিএনপি মনোনীত মতিউল আলম ও আ’লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মকলেছুর রহমান। আ’লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় ঝামেলা বিহিন মাঠে আছেন বিএনপি প্রার্থী। তাই বিকাশ চন্দ্র ভৌমিকের জস আর সুনাম তাকলেও ভোটের মাঠে এগিয়ে আছেন বিএনপি চেয়ারম্যান প্রার্থী।

 

গোয়ালকান্দি ইউনিয়নে বিএনপি প্রার্থী না থাকলেও আ’লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী আলমগীর সরকার ও বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুস সালামের মধ্যে লড়াই হবে। এছাড়াও চেয়ারম্যান পদে অন্যান্যে প্রার্থীরা হলেন নাছির উদ্দীন,জিতেন্দ্রনাথ, আব্দুল লতিফ।

 

গোবিন্দপাড়া ইউনিয়নে আ’লীগ মনোনীত উপজেলা যুবলীগের সভাপতি আল মামুন,বিএনপি সমর্থিত আশরাফুল ইসলাম,বিএনপি নেতা হাবিবুর রহমান,জামায়াতের মুহা: আব্দুল কাফি অন্যদিকে কমিউনিষ্ট পার্টি থেকে সাবেক চেয়ারম্যান বিজন কুমার সরকার। এলাকাবাসী জানান তরুন নেতৃত্বের দিক দিয়ে আল মামুন এগিয়ে। তবে কমিউনিষ্ট পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান বিজন কুমার সরকারকে বাদ দিতে পারছেনা ভোটাররা।

 

হামিরকুৎসা ইউনিয়নে আ’লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী উপজেলার সকল ইউনিয়ন মিলে একটায় মহিলা প্রার্থী শাফিনুর নাহার,বিএনপি মনোনীত আহসান হাবিব,আ’লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আনোয়ার হোসেন এবং জাতীয় পার্টির মোহম্মাদ আলী খামারু। দীর্ঘদিন ধরে দলের জন্য কাজ করে চলেছেন আ’লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আনোয়ার হোসেন দলীয় মনোনয়ন তাকে না দিলে ইউনিয়নের মধ্যে তার জনপ্রিয়তার অভাব লক্ষ্য করা যায়নি। সে কারনে বিএনপির একক প্রার্থী ও আ’লীগের দলীয় প্রার্থী থাকলেও শক্ত অবস্থানেই আছেন আ’লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী।

 

শ্রীপুর ইউনিয়নে আ’লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান মকবুল হোসেন মৃধা, বিএনপি মনোনীত আকবর আলী মল্লিক ও আ’লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হাবিবুর রহমান। আগে থেকে মকবুল হোসেন মৃধার জনপ্রিয়তা থাকলেও এবার কমেছে অনেকটাই তাই বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় ফুরফুরে মেজাজে মাঠে আছেন বিএনপির প্রার্থী।

 

নরদাশ ইউনিয়নে আ’লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী গোলাম শফি কামাল বাবুল,বিএনপি থেকে মতিউর রহমান,আ’লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী চেয়ারম্যান মাস্টার আব্দুর রশিদ। চেয়ারম্যান বাসীর সেবা করার কারনে আ’লীগের প্রার্থী থাকলেও বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে বুক ফুলিয়ে প্রচারণা শেষ করেছেন তিনি।

 

ঝিকড়া ইউনিয়নে আ’লীগে মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী আব্দুল হামিদ ফৌজদার,বিএনপির প্রার্থী চেয়ারম্যান সাইদুজ্জামান জামায়াতের প্রার্থী ইব্রাহীম হোসেন। এই ইউনিয়নে আ’লীগ ও বিএনপি প্রার্থীর মধ্যে ভোটের লাড়াই হবে বলে জানিয়েছেন ভোটাররা।

 

যোগীপাড়া ইউনিয়নে আ’লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী মোস্তফা কামাল, বিএনপির দলীয় প্রার্থী আরিফুল ইসলাম রনি,আ’লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী এম এফ মাজেদুল ইসলাম। আ’লীগের দলীয় ও বিদ্রোহী প্রার্থী থাকার কারনে নিজের  সামনে তেমন কোন বাঁধা দেখছেন না বিএনপি প্রার্থী।

 

সোনাডাঙ্গা ইউনিয়নে আ’লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী অধ্যক্ষ আজাহারুল হক, বিএনপি’র দলীয় প্রার্থী এ্যাড. মোজাফ্‌ফর হোসেন,জাতীয় পার্টির অহিদুল ইসলাম।

 

কোথাও সমর্থকদের দেয়া হচ্ছে হুমকি আবার কোন নির্বাচনী ক্যাম্পে চালানো হচ্ছে হামলা। সবমিলিয়ে বাগমারার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে জনমনে। ১৬ টি ইউপির প্রায় ৭ টি ইউপিতে ভোট গ্রহন ঝুকিপূর্ণ বলে জানা গেছে। নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে পরিস্থিতিও বদলে যাচ্ছে এসব ইউপিতে।

 

এদিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা বাহিনী সজাগ থাকবে বলে জানানো হয়েছে। কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে নির্বাচনী এলাকায় পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে। কোন দলের কোন ব্যাক্তি প্রভাব বিস্তার করতে চাইলে কোন ছাড় দেয়া হবে না বলেও জানানো হয়।

 

এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা এসপি মোয়াজ্জেম হোসেন ভুইয়া প্রার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, নির্বাচনে কোন দলের কোন ব্যাক্তি বা ক্যাডার যদি প্রভাব বিস্তার করতে চায় তাহলে সে তা তৎক্ষনাৎ প্রতিহত করা হবে।  সহিংসতার উদ্দেশ্যে কেউ বের হলে সে আর জীবন নিয়ে ফিরতে পারবে না।

স/শ