নিজস্ব প্রতিবেদক:
নিয়োগ ও ভর্তি জালিয়াত চক্রের সঙ্গে দ্বন্দ্বে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মোতালেব হোসেন লিপু ‘হত্যার’ ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশংকা তার সহপাঠী ও পরিবারের। চুক্তি অনুযায়ী পাওনা পরিশোধ নিয়ে দ্বন্দ্বের ফলে পরিচয় ফাঁস হওয়ার আশংকায় চক্রের সদস্যরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নৃশংস এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। তবে পুলিশ বলছে- এখনও কোনো ক্লু উদ্ধার এবং কাউকে গ্রেফতারও করা সম্ভব হয়নি। জালিয়াত চক্রের সঙ্গে দ্বন্দ্বের বিষয়টি তদন্ত করে দেখবে তারা।
লিপুর ঘনিষ্ঠ সহপাঠী বলছে, চক্রের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে কাজ করেও টাকা না দেওয়ায় তাদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ছিল।

আর চাচা বশির মোল্লা বলছেন, প্রায়ই লিপুকে চক্রের ছেলেরা মোবাইলে হুমকি দিত বলে আমাকে জানিয়েছিল লিপু। বিষয়টি নিয়ে সে টেনশন করত। অন্য কারও সঙ্গে কোনো বিষয়ে দ্বন্দ্ব ছিল বলে জানা নেই।
গত বৃহস্পতিবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব আব্দুল লতিফ হলের ডাইনিং কক্ষের পেছনের ড্রেনে লিপুর দেহ পড়ে থাকতে দেখে কর্মচারীরা। পরে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে। মোতালেব হোসেন লিপু গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। লতিফ হলের ২৫৩ নম্বর কক্ষের আবাসিক ছাত্র ছিল সে।
লাশের সুরতহাল দেখে পুলিশ কর্মকর্তারা সিল্কসিটি নিউজকে জানান, তার মাথার পেছনে আঘাতে চিহ্ন দেখে প্রাথমিকভাবে এটিকে হত্যাকাণ্ড বলে মনে হচ্ছে। পরে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. এনামুল হক জানান, বুকে ও মাথায় গুরুতর আঘাতে তার মৃত্যু হয়েছে। তাকে আঘাত করা হয়েছে। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় লিপুর চাচা বশির মোল্লা নগরীর মতিহার থানায় অজ্ঞাত আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
নাম-পরিচয় না প্রকাশ করার শর্তে লিপুর এক সহপাঠী বলেন, রেলওয়ের নিয়োগ পরীক্ষায় অন্যজনের বদলে অংশ নেওয়ায় লিপু গ্রেফতার এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতে তিন মাসের কারাদণ্ড হয়। পরে জেল থেকে বেরিয়ে চুক্তি অনুযায়ী চক্রের কাছে টাকা চাইলে, তারা দিতে অপরাগতা প্রকাশ করে। তাদের কাছে প্রায় ৩০/৪০ হাজার টাকার মত পাওনা ছিল লিপুর। এনিয়ে ঝামেলা চলছিল বলে জানিয়েছিল তাকে।
লিপুর চাচা বশির মোল্লা সিল্কসিটি নিউজকে বলেন, ‘কিছুদিন আগে লিপু আমাকে জানিয়েছিল, নিয়োগ পরীক্ষায় অন্যজনের বদলে পরীক্ষা দিতে গিয়ে ধরা পড়ার পর থেকে জালিয়াত চক্রের সদস্যরা তাকে নিয়মিত ফোন দিত। ফোনে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তর্কাতর্কি ও হুমকি ধামকিও দিত। ব্যাপারটি নিয়ে লিপু বেশ টেনশন করত।’
ঘটনাস্থলে পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, যেখানে লাশ পড়ে ছিল, তার ঠিক উপরে তিন তলায় প্রায় ১৫ ফুট ডানে ৩২৩ নম্বর কক্ষ। ওই কক্ষের জানালার গ্রিল পুরোটা কাটা। সেখান থেকে জানালা দিয়ে বেরিয়ে স্বাভাবিকভাবে হেঁটে বেড়ানো যায় এমন সানসাইড রয়েছে। সেখান থেকে যেকোন কিছু ড্রেনে ফেলা সম্ভব। এছাড়া লিপুর লাশ যেখানে পড়ে ছিল, সেখানে চারপাশে ড্রেনের কাঁদা ছিটকে পড়েছিল। এমনকি পাশের দেয়ালেও কাঁদা ছিটকে পড়েছে। ওই কক্ষের ঠিক নীচ তলার কক্ষের বাসিন্দারা জানায়, রাতে ঝপ করে কিছু পড়ার শব্দ পেয়েছিলাম। তবে তা খুব জোরে না, তাই গুরুত্ব না দিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ি। হলে উঠে সিট না পেয়ে প্রথম দিকে কিছুদিন ওই কক্ষে ছিল লিপু। ফলে বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে।
আটক তিন জনকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ: এদিকে ঘটনার পর সন্দেহভাজন হিসেবে আটক চার জনের মধ্যে তিনজনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। আটক আরেকজন ছিলেন লিপুর রুমমেট উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের মনিরুল ইসলাম। তাকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। তবে মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়নি। ঘটনার পর রুমমেট মনিরুল ইসলাম, হলের ১৪১ নম্বর কক্ষ থেকে লিপুর নামে ইস্যুকৃত সিমকার্ডসহ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রদীপকে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। সন্ধ্যায় হলের দুই জন নৈশ প্রহরীকে আটক করা হয়। নৈশ প্রহরী দু’জনকে হল প্রাধ্যক্ষ শুক্রবার সকালে ছাড়িয়ে আনেন। আর প্রদীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ।
হল ফটকে সিসি টিভির ফুটেজে মিলবে গতিবিধি: লতিফ হলের ফটকে থাকা সিসি ক্যামেরার ফুটেজে লিপু এবং বহিরাগত কেউ হলে প্রবেশ করেছিল কি না তার গতিবিধি মিলবে। হল কর্তৃপক্ষের কাছে ফুটেজ রয়েছে। পুলিশ চাইলে তদন্তের স্বার্থে তা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক বিপুল কুমার বিশ্বাস।
জানতে চাইলে নগরীর মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ন কবীর সিল্কসিটি নিউজকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে হত্যাকাণ্ড মনে হলেও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারছি না। ফলে তদন্তও সেভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তবে ক্লু উদ্ধারের চেষ্টা করছে পুলিশ।’
স/অ









