সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
বাংলাদেশ অমিত সম্ভাবনার দেশ। গত বিশ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার ৪.৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৭.৮ শতাংশের অধিক হয়েছে। একই সময়ে জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হার ২.০ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ১.২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ঊর্ধ্বগতি এবং জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির ক্রমহ্রাস আমাদের মাথাপিছু আয়ের প্রবৃদ্ধিকে আরও বেগবান করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালের মাথাপিছু আয় ৫৭৬ ডলার থেকে বেড়ে ২০১৭ সালে প্রায় ১,৭০০ ডলার হয়েছে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ১.৯ মার্কিন ডলারের বিচারে দারিদ্র্যের হার ১৯৯১ সালে ৪৪.২ শতাংশ থেকে ২০১৭ সালে ১৩.৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

দুটো উপাদান বাংলাদেশের অর্থনীতির দ্রুত প্রবৃদ্ধি ও ব্যাপক দারিদ্র্য হ্রাসের পেছনে প্রধান চালিকাশক্তির কাজ করেছে। একটি হল রফতানি আয়ের অব্যাহত প্রবৃদ্ধি; আরেকটি হল প্রবাসী বাংলাদেশিদের আয়ের ব্যাপক আন্তঃপ্রবাহ। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ গত দশ বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিটেন্স প্রবাহ পেয়েছে। বিশ্বের নীতিনির্ধারকরা বাংলাদেশকে তাই ভারত ও ভিয়েতনামের সঙ্গে দ্রুত প্রবৃদ্ধির উদীয়মান অর্থনীতি মনে করে।
২০১১ সালে গোল্ডম্যান স্যাক্স বাংলাদেশকে ১১টি উন্নয়নশীল দেশের একটি মোর্চায় শ্রেণীভুক্ত করেন যারা BRICS (ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া এবং চীন) দেশপুঞ্জের সঙ্গে ২০৫০ সাল পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতির চাহিদাকে নির্ধারণ করবে। ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে তাই নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
মাথাপিছু আয়ের প্রবৃদ্ধি, মানবসম্পদ সূচকে উন্নতি এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতাসূচক কমার কারণে জাতিসংঘ ২০১৭ সালে বালাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ অনায়াসে ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হবে।
রফতানি আয় ও রেমিটেন্সের ক্রমবর্ধমান আন্তঃপ্রবাহ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জিডিপির অনুপাতে মুদ্রার সরবরাহ (M2/জিডিপি) ২০০১ সালে ৩১.৫ শতাংশ থেকে ২০১৮ সালে তা প্রায় ৬০ শতাংশ করেছে। মুদ্রা সরবরাহের এই অব্যাহত প্রসার অর্থনীতিতে সার্বিক চাহিদা বৃদ্ধিতে নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছে।
যেমন- মোট বিনিয়োগ-জিডিপির হার এই সময়ে ২৩.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩০.৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের মোট দেশজ সঞ্চয় এ সময়ে বাড়লেও মোট বিনিয়োগ সেই তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে। সঞ্চয়-বিনিয়োগ তফাৎ (Savings-Investment Gap) তাই জিডিপি’র ৭-১০ শতাংশ বিরাজ করছে। অন্য কথায়, বিনিয়োগ সঞ্চয়ের থেকে সব সময় জিডিপি’র ৭-১০ শতাংশ বেশি হয়েছে।
এটা নির্দেশ করে যে, প্রতিবছর বাংলাদেশ সমপরিমাণ বাণিজ্য ঘাটতি মোকাবেলা করছে। কার্যত, বাংলাদেশ পণ্য ও সেবা খাতে এই বাণিজ্য ঘাটতি গত ৫ বছর যাবৎ প্রতিবছর গড়ে ১০-১২ বিলিয়ন ইউএস ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই অব্যাহত বাণিজ্য ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ কিন্তু বাড়তি কোনো বৈদেশিক ঋণের বোঝা সৃষ্টি করেনি। বরং রেমিটেন্সের আন্তঃপ্রবাহ সেই ঘাটতি পূরণ করেছে এবং তা সামষ্টিক অর্থনীতির চলতি হিসাবে ভারসাম্য (Current Account Stability) এনে দিয়েছে।
আমাদের বৈদেশিক ঋণ-জিডিপি হার ২০ শতাংশের নিচে (এডিবি, ২০১৮)। যে কোনো অর্থনৈতিক বিশ্লেষক বৈদেশিক ঋণের এই পরিমাণকে স্বাভাবিক বলবে। এটাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলার কোনো অবকাশ নেই।
গ্লোবাল রেটিং সংগঠন (যেমন Standard & Poor বা Moody’s) বাংলাদেশকে তাই সামষ্টিক অর্থনীতি ও বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় অনুকূল রেটিং দিয়ে থাকে। উল্লেখ্য, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা বা ভিয়েতনামের বৈদেশিক ঋণের বোঝা (জিডিপির তুলনায়) বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি।
অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান মুদ্র্রায়ণের (Monetisation) ফলে গত ২৫ বছরে আর্থিক খাতে ব্যাপক তারল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের ঋণদান ক্ষমতা বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বেসরকারি খাত এই সময়ে তাদের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগের সিংহভাগ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের মাধ্যমে পূরণ করেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ঋণের এই প্রবাহ সবসময় উৎপাদনশীল খাতে হয়নি।
শেয়ারবাজার ও আবাসন খাতে মাত্রাতিরিক্ত ঋণের প্রবাহ হওয়ার ফলে ওইসব খাতে ব্যাপক মূল্যস্ফীতি হয়েছে। জমি ও অ্যাপার্টমেন্টের দাম কোনো কোনো স্থানে ২০-৩০ গুণ বেড়েছে। শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক বাড়ার কারণে ২০১০ সালে স্টক মার্কেট ক্রাশ করেছে। সে ক্ষেত্রে কর্পোরেট সুশাসন ও স্টক রেগুলেটরদের আইন প্রয়োগে সক্ষমতার অভাব এবং স্টক এক্সচেঞ্জের অসম্পূর্ণ মার্কেট কাঠামো সম্পূরক ভূমিকা পালন করেছে।
মুদ্রানীতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও ভবিষ্যৎমুখী ও বিচক্ষণ হতে পারলে, উৎপাদনশীল খাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ২৩ শতাংশ না হয়ে ৩০ শতাংশ হতে পারত। ২০১৮ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭.৮ শতাংশ না হয়ে ৯ শতাংশে উন্নীত হতো বলে মনে করি। তারপরও স্বীকার করতে হবে, বাংলাদেশের অর্থনীতির গত তিন দশকের অর্জন অতুলনীয়। ২০০৯-২০১৮ সময়কালে বাংলাদেশ সরকারের সক্ষমতা বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ৪ লাখ ৬৫,০০০ কোটি টাকার সরকারি ব্যয়ের প্রাক্কলন করেছেন। চলতি মুদ্রা বিনিময় হারে যা প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে সরকারি ব্যয়ের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৫ বিলিয়ন ডলার। ২০০১-০২ অর্থবছরে তার পরিমাণ ছিল মাত্র ৭.৫ বিলিয়ন ডলার।
২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সালে সরকারি ব্যয়ের চার গুণ প্রবৃদ্ধির পেছনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচক্ষণ ও সাহসী নেতৃত্ব মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, ২০১২ সালে বিশ্বব্যাংকের ষড়যন্ত্রের কথা। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে কোনো ঋণ দেয়নি। কিন্তু তারা দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছিল। বৃহৎ স্বার্থের খাতিরে সরকার তাদের অন্যায় দাবিকে আমলে নিয়ে তৎকালীন সেতুমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে পদত্যাগ করিয়েছিল।
একজন জ্যেষ্ঠ সচিবকে জেলে পর্যন্ত ঢোকানো হয়েছিল। তারপরও বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সঙ্গে করা চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেছে। বাংলাদেশের সম্মানকে পদদলিত করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, রবার্ট জোয়েলিক তখন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি অতীতে একজন ডেমোক্রাট ছিলেন এবং বিল ক্লিনটন ও বারাক ওবামার প্রশাসনের উচ্চপদস্থ নীতিনির্ধারক ছিলেন।
বিশ্বব্যাংকের পদাঙ্ক অনুসরণ করে নীতিগত কারণে এডিবি, আইডিবি ও অন্যান্য দাতারাও চুক্তি থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। লক্ষ্য ছিল পদ্মা সেতু প্রকল্প যাতে না হয়। আওয়ামী লীগ যাতে ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে একটা রাজনৈতিক সংকটে পড়ে এবং নির্বাচনে জয়লাভ না করে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত ছিল রাজনীতি থেকে শেখ হাসিনাকে উৎখাতের।
জননেত্রী শেখ হাসিনা ওই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জানতেন। তিনি ঘোষণা করলেন, পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে করবেন। অর্থনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের লোকেরা তখন পরিহাস করেছিলেন। বলেছিলেন, সরকার এত অর্থ কোথায় পাবে?
২০১০ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যেখানে ৮ বিলিয়ন ডলার, সেখানে পদ্মা সেতুর ৪ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন কিভাবে হবে? সামষ্টিক অর্থনৈতিক অন্য সূচকগুলোও তখন খুব অনুকূলে ছিল না। সমালোচকরা বলছিল, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু হবে না।
নিন্দুকেরা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ২০১৪-২০১৮ সময়কালে শুধু পদ্মা সেতুরই বিনির্মাণ হচ্ছে না, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মিত হচ্ছে, মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে, কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পাওয়ার প্ল্যান্ট হচ্ছে।
২০০৯ সালে যেখানে ৩,২৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ হতো, তা ২০১৮ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ১১,৩৮৭ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। উল্লেখ্য, বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১৮,৭৫০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। সরকারি ব্যয়ের এবং বিনিয়োগের এই ব্যাপক প্রসার হয়েছে মূলত প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা ও রফতানি আয়ের ক্রমবর্ধমান আন্তঃপ্রবাহ থেকে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের এই অর্জন বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়েছে। শিক্ষা ও অবকাঠামো খাতে হাসিনা সরকার ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নে সরকারের অব্যাহত ও ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সুফল হল জন্মনিয়ন্ত্রণ, মাতৃত্বের সুরক্ষা, শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও গড় আয়ুর বৃদ্ধি। Lancet জার্নালে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বাংলাদেশের এই গণস্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
উন্নয়নের এই গতিকে আরও বেগবান করার জন্য সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। সুশাসন হল সরকারি নীতি ও আইনের সঠিক বাস্তবায়ন। সুশাসন হল সরকারি আয়-ব্যয়ে দক্ষতা ও জবাবদিহিতা আনয়ন করা। কর্পোরেট সুশাসন হল সঞ্চয় ও বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা প্রদান।
আর সুশাসন আসবে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন ও সক্ষমতার মাধ্যমে। রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন ও সক্ষমতা নির্ভর করে মানবসম্পদের ওপর। মানবসম্পদ সৃষ্টির জন্য স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক মানের করতে হবে। জননীতিকে জনকল্যাণমুখী করতে হবে। মেধাবী ও সৎ নেতৃত্বকে দেশ পরিচালনায় সুযোগ দিতে হবে। সততার পুরস্কার থাকতে হবে। দুর্নীতি দমন করতে হবে।
সাধারণ মানুষের স্থানীয় সরকার এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। সংসদীয় কমিটিগুলোকে কার্যকর করতে হবে। বিচার বিভাগের দক্ষতা বাড়াতে হবে। তাদের আর্থিক স্বাধীনতা দিতে হবে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নই টেকসই উন্নয়ন। ২০৩০ সালে বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়নের মডেল হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে মর্যাদার আসন অলংকৃত করবে, বিশ্বের নীতিনির্ধারকরা তাই মনে করছেন।









