অর্থ ও বাণিজ্য

স্বল্প সুদে বৈদেশিক ঋণ আর না

নিউজ ডেস্ক১৯ এপ্রিল ২০১৯৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমেই ভালো হচ্ছে। বাড়ছে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি)। সেই সঙ্গে বাড়ছে মানুষের মাথাপিছু আয়।

চূড়ান্তভাবে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসার পথে রয়েছে দেশ। এ অবস্থায় বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে নেমে আসছে সুদের খক্ষ। অর্থাৎ অবস্থা ভালো হওয়ার সুবাদে স্বল্প সুদ বা বিনা সুদে ঋণ পাওয়ার দিন ফুরিয়ে আসছে। বিশ্বব্যাংক ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) সুদের হার বাড়িয়েছে। নতুন করে সুদের হার বাড়াতে চাচ্ছে চীন।

এ অবস্থায় চলছে দরকষাকষি। সিদ্ধান্ত চাওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে। তবে চীনের সুদ বাড়ানোর বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) বক্তব্য হচ্ছে, প্রথমে ভাবা হয়েছিল শুধু বিদ্যুৎ খাতের দুটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে চীন সুদ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু আসলে সেটি নয়, তারা অন্য প্রকল্পেও বর্ধিত সুদ চাচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি বাড়ালেও যেন লাগামহীন না বাড়ে।

এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসার কারণে স্বল্প সুদে ঋণের উইন্ডো বন্ধ হলেও সঠিক বার্গেনিংয়ের (দরকষাকষি) মাধ্যমে সর্বোচ্চ কম সুদে ঋণ পাওয়ার চেষ্টা করার তাগিদ দিয়েছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মোস্তফা কে. মুজেরি। তিনি বলেন, ‘দরকষাকষির দক্ষতা বাড়াতে হবে।’

সূত্র জানায়, চীন সাধারণত দু’ভাবে ঋণ দেয়। এর একটি হল গভর্নমেন্ট কনসেশনাল লোন (জিসিএল), অন্যটি প্রেফারেন্সিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট (পিবিসি)। উভয় ঋণের সুদহার বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই সঙ্গে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ ব্যবস্থাপনা ফি এবং শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ কমিটমেন্ট ফিও রয়েছে। এ বছর ঋণচুক্তির জন্য নির্ধারিত দুই প্রকল্পে সাড়ে ৪ শতাংশ হারে সুদ দাবি করে চীন। তবে ইআরডির সঙ্গে আলোচনার পর শেষ পর্যন্ত ৩ শতাংশের প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি।

এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য সারসংক্ষেপ ইতিমধ্যেই ইআরডি থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইআরডির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা। প্রকল্প দুটি হচ্ছে- ডিপিডিসি এলাকায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্প এবং স্ট্রেংদেনিং পাওয়ার সিস্টেম অব পিজিসিবি প্রকল্প। গত বুধবার ‘ঢাকা-আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে’ শীর্ষক প্রকল্পটির জন্য ঋণের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে আলোচনা হয়েছে চীনের সঙ্গে। এ প্রকল্পেও ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ সুদ দাবি করেছে চীন। তবে এটি এখনও একেবারেই প্রাথমিক পর্যায় থাকায় আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সুদের হার কমানোর সুযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে।

জানতে চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) অতিরিক্ত সচিব ও এশিয়া উইংয়ের প্রধান আবদুল বাকী যুগান্তরকে বলেন, এর আগে যে পাঁচটি প্রকল্পের জন্য চীনের সঙ্গে ঋণচুক্তি হয়েছিল সেগুলোর সুদের হার ছিল ২ শতাংশ।

কিন্তু বিদ্যুতের প্রকল্প দুটির ক্ষেত্রে তারা বেশি সুদ চায়। আমরা নেগোশিয়েশন করে তিন শতাংশে নিয়ে আসতে পেরেছি। কিন্তু অর্থমন্ত্রী বলেছেন, হঠাৎ করে এক শতাংশ সুদের হার বৃদ্ধি করার কারণ কি? যেহেতু সুদের ক্ষেত্রে এত বড় পরিবর্তন, সেহেতু প্রধানমন্ত্রীর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সার-সংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠিয়েছি। এখনও কোনো সিদ্ধান্ত পাওয় যায়নি।

সূত্র জানায়, ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি-জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশের ২৭টি উন্নয়ন প্রকল্পে ২ হাজার ২৫০ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। এ ব্যাপরে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। এর মধ্যে ৫টি প্রকল্পে ২ শতাংশ সুদে সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি হয়েছে। এমওইউতে ঋণের শর্তাবলীর বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু উল্লেখ না থাকায় চীন সুদহার বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে বলে মনে করছে ইআরডি।

জানতে চাইলে বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক মোস্তফা কে. মুজেরি বলেন, ‘আমরা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসছি। এ অবস্থায় ধীরে ধীরে স্বল্প বা বিনা সুদে ঋণ প্রাপ্তির উইন্ডোগুলো বন্ধ হয়ে যাবে এটিই স্বাভাবিক।

আমাদের কমার্শিয়াল ঋণের দিকে যেতেই হবে। তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, এক্ষেত্রে বার্গেনিং বা দরকষাকষির দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। এর মাধ্যমে সুদের হার যতটা কম রাখা যায়। তাছাড়া যেসব প্রকল্পের বিপরীতে ঋণ নেয়া হবে সেগুলো যাতে যথাসময়ে বাস্তবায়ন হয় সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। এসব প্রকল্প থেকে সুফল প্রাপ্তি শুরু হলে কিছুটা বেশি সুদ তখন কোনো সমস্যা হবে না।’

এদিকে ২০১৮ সালের ১ জুলাই থেকে ঋণের কঠিন শর্ত ও উচ্চ সুদ কার্যকর করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি সুদের হার শূন্য শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ২৫ শতাংশ কার্যকর করেছে। এর সঙ্গে আগে থেকে অব্যাহত থাকা সার্ভিস চার্জ দশমিক ৭৫ শতাংশ বলবৎ রয়েছে।

তাই সব মিলিয়ে এখন সুদের হার দাঁড়িয়েছে ২ শতাংশ। এছাড়া ঋণ পরিশোধের সময়ও কমিয়ে দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। অর্থাৎ আগে আইডিএ তহবিল থেকে নেয়া ঋণ পরিশোধে সময় পাওয়া যেত ৩৮ বছর। এখন ৮ বছর কমিয়ে ৩০ বছর করা হয়েছে। অন্যদিকে আগে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে ৬ বছরের গ্রেস পিরিয়ড (রেয়াতকাল) ছিল। কিন্তু এখন ১ বছর কমিয়ে ৫ বছর করা হয়েছে।

সুদ যুক্ত করার কারণ হিসেবে বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০১৫ থেকে ২০১৭ এ ৩ বছর মাথাপিছু জাতীয় আয় বৃদ্ধির ধারবাহিকতা অর্জন করায় ‘গ্যাপ কান্ট্রি’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে বাংলাদেশকে। তাই সস্তা ঋণ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া এটি শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই নয়, যে কোনো দেশ এ অবস্থানে থাকলে সস্তা ঋণের সুবিধা আর পায় না।

এছাড়া কম সুদে ঋণ পাওয়ার আর একটি অন্যতম উৎস ছিল জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। সংস্থাটির কাছ থেকে বার্ষিক শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশ সুদে ঋণ মিলত। সেই সঙ্গে ১০ বছরের রেয়াতকালসহ ৪০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি সময়ে ঋণ পরিশোধের সুযোগ ছিল। কিন্তু এখন সুদ হার বাড়িয়ে শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ করেছে জাইকা।

তাছাড়া পরিশোধের ক্ষেত্রে রেয়াতকাল ঠিক থাকলেও পরিশোধের সময় ১০ বছর কমিয়ে করা হয়েছে ৩০ বছর। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও (এডিবি) ইতিমধ্যেই সুদের হার বাড়িয়েছে। কিছুটা অনমনীয় ঋণে সুদের হার ২ শতাংশ করা হয়েছে।