সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
দুর্বল মানের বাণিজ্যিক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে মার্জার বা একীভূতকরণের বিষয়ে কঠোর নীতিমালা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ নীতিমালায় কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হলেই প্রতিষ্ঠানটিকে অন্য কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মার্জার বাধ্যতামূলক করা হবে।
এর আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আর্থিকভিত্তি সবল করার নির্দিষ্ট সময় দেয়া হবে। ওই সময়ের মধ্যে অবস্থার সন্তোষজনক উন্নতি না হলে মার্জার চাপিয়ে দেয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রণীত খসড়া নীতিমালা চূড়ান্ত করতে ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি ডিপার্টমেন্টের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ড. কবির আহম্মদের নেতৃত্বে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ এবং ডিপার্টমেন্ট অব অফসাইট সুপারভিশন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
কমিটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন প্রণয়ন করে তা ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগে দাখিল করবে এবং তা দেয়া হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামালের নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটির কাছে। তারা এটি পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত করে গভর্নরের কাছে জমা দেবেন। পরে এটি সার্কুলার আকারে জারি করা হবে।
এ নীতিমালা জারি করা হলে দুর্বল ব্যাংকের সঙ্গে দুর্বল ব্যাংক, সবল ব্যাংকের সঙ্গে দুর্বল ব্যাংক, দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সবল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সবল ব্যাংকের সঙ্গে দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সবল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দুর্বল ব্যাংক একীভূত করা যাবে।
এক্ষেত্রে যেসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় ধরে তারল্য সংকট, প্রভিশন ঘাটতি, মূলধন ঘাটতিতে ভুগছে, আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না, শেয়ারহোল্ডারদের নিয়মিত লভ্যাংশ দিতে পারে না, পরিচালকদের মধ্যে রয়েছে আন্তঃকলহ, জাল-জালিয়াতির প্রবণতা বেশি, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে- তাদের মার্জারের আওতায় আনা হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, দুর্বল ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান আর্থিক খাতের ক্যান্সারের মতো। এগুলো টিকিয়ে রাখলে খাতের দুর্নাম হবে। এ কারণে মার্জারকে বাধ্যতামূলক করে দেয়া হবে। প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার অবনতি হয়ে নীতিমালার আওতায় পড়ে গেলে তা বাধ্যতামূলকভাবে মার্জারের প্রক্রিয়ায় চলে যাবে।
এ দফায় মার্জারের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপ আমলে নেয়া হবে না, আর্থিক অবস্থা দুর্বল হলে মার্জার চাপিয়ে দেয়া হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, আর্থিক খাতের সমস্যা সমাধানের জন্যই এসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এগুলো এ খাতে সুফল বয়ে আনবে বলে আমরা মনে করি।
এ বিষয়ে একজন অর্থনীতিবিদ বলেন, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে অদৃশ্যভাবে মোটা অংকের অর্থের লেনদেন হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। যারা এত অর্থ খরচ করে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান নেন তারা মার্জার করতে চাইবে না। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এটি কতুটুকু চাপিয়ে দিতে পারবে সেটা দেখার বিষয়।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. ফজলে কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এক সভায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক বা স্বেচ্ছাকৃত মার্জার বা একীভূতকরণ নীতিমালার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাচ্ছে দুর্বল ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সবল কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত হয়ে যাক।
কিন্তু কেউ হচ্ছে না। এতে আর্থিকভিত্তি নড়বড়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতাও কাটছে না। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানে ধস নামলে এর নেতিবাচক প্রভাব আর্থিক খাতের ওপর এসে পড়ছে।
এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা এখন খারাপ হয়ে গেছে। এগুলোকে মার্জার করে দিলে ভালো হবে। এর জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দরকার। কেননা রজনীতিবিদরাই এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক।
এর আগে ২০০৭ সালের ৪ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি মার্জার বা একীভূতকরণ নীতিমালা প্রণয়ন করে সার্কুলার আকারে জারি করে। এতে বলা হয়- কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর এ নীতিমালা চাপিয়ে দেবে না। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত হতে চায় তবে সহায়তা করবে তারা।
এতে আরও বলা হয়, একীভূত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক সেবার আওতা, শাখার সংখ্যা বাড়বে। প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা কেটে যাবে। আর্থিক বাজারে গভীরতা বাড়বে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনোক্রমেই আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে দেবে না। তারা সব সময়ই আমানতকারী, ঋণ গ্রহীতা ও শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষায় সচেষ্ট থাকবে।
সাড়ে ১০ লাইনের এ সার্কুলারে সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা ছিল না। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠান মার্জার হয়নি। যে কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট নীতিমালা করতে যাচ্ছে। কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান মার্জার হবে তাদের ধরন সম্পর্কেও নীতিমালায় সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ থাকবে।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশে এখনও কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্ব-ইচ্ছায় মার্জার হয়নি। তবে কিনে নেয়া বা বিক্রি করে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে সমঝোতার ভিত্তিতে। এর মধ্যে বিদেশি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক কিনে নিয়েছে এএনজেড গ্রিন্ডলেজ ব্যাংক। বিদেশি নোভাস্কোশিয়া ব্যাংক কিনে নিয়েছে বেসরকারি ব্যাংক এশিয়া। ওরিয়েন্টাল ব্যাংক কিনে নিয়েছে মালয়েশিয়ান আইসিবি গ্রুপ।
সূত্র জানায়, বর্তমানে নতুন প্রজন্মের ফার্মার্স ব্যাংক প্রবল সংকটে রয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকটি ব্যাংক বড় ধরনের সংকটে রয়েছে। সাতটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান তারল্য সংকটের কারণে আমানতকারীদের টাকা দিতে পারছে না।









