সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
অবশেষে উন্মুক্ত হচ্ছে শিল্প খাতে গ্যাস সংযোগ। দীর্ঘ ৪ বছর বন্ধ থাকার পর সরকার আবারও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় শিল্প কারখানায় গ্যাস সংযোগ উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ লক্ষ্যে জ্বালানি মন্ত্রণালয় গ্যাস সংযোগ নীতিমালাসহ একটি প্রাথমিক সার-সংক্ষেপ তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৌখিক নির্দেশনা পেয়ে জ্বালানি বিভাগ এ সার-সংক্ষেপটি তৈরি করে।
চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য এটি প্রধানমন্ত্রীর দফতরে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদনের পর এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হবে। আর এর মধ্য দিয়েই বিলুপ্ত হবে শিল্পে গ্যাস সংযোগসংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টার নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কমিটি।

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী আবেদন করলে ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই গ্যাস মিলবে শিল্প গ্রাহকদের। এ গ্যাসের জোগান দেয়া হবে আমদানি করা উচ্চমূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতিদিন ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি যুক্ত হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে। এপ্রিলের মধ্যে এটি ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, এলএনজির পরিমাণ ১০০০ মিলিয়নে পৌঁছালেই উন্মুক্ত হতে পারে শিল্প-কারখানায় গ্যাস সংযোগ।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, শিল্পে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করেছে সরকার। সেখানে নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস সংযোগও নিশ্চিত করতে চায়। এবার এ খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ হবে। এজন্য সরকার শিল্প খাতে গ্যাস সংযোগ স্বাভাবিক করতে চায়। তিনি বলেন, গ্যাস সংযোগ নিয়ে বিভিন্ন কমিটির কারণে নানা বাধা আসে। শিল্পমালিকরা নিরুৎসাহিত হন। দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। তাই আমি মনে করি, শিল্প গ্যাস সংযোগ টোটালি উন্মুক্ত হয়ে যাক। সংযোগের জন্য একটি গাইডলাইন থাকবে। সে অনুযায়ী শিল্পমালিকরা আবেদন করবেন। ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে কানেকশন (সংযোগ) পেয়ে যাবেন।
তবে জ্বালানি বিভাগের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সংযোগ দিতে হলে গ্যাসের দাম বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম অনেক বেশি। আর দেশে গ্যাসের চাহিদাও বাড়ছে দিন দিন। এ হিসাবে চাহিদা অনুযায়ী এলএনজি আমদানি করতে হলে সরকারকে আরও অনেক বেশি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। কাজেই গ্যাসের দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের সামনে কোনো বিকল্প নেই।
জানা গেছে, ১৮ আগস্ট থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি বা লিকিউফাইড ন্যাচারাল গ্যাস) যুক্ত হয় পাইপলাইনে। এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানি করেছে সরকার। প্রতি ইউনিট ৩২ টাকা দরে আমদানি করে ওই গ্যাস ৭ টাকা ১৭ পয়সা দরে বিক্রি করার কারণে এ পর্যন্ত প্রায় ১৫শ’ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে গত বছরের অক্টোবরে এলএনজিতে ভর্তুকি দেয়া হয়েছে ৫৬০ কোটি টাকা। জ্বালানি বিভাগের একটি সূত্রে জানা গেছে, উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানি করে এতদিন ভর্তুকি দিয়ে সরকার জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করেছিল। এ ভর্তুকি কমাতেই সব ধরনের গ্যাসের দাম ৬০ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করা হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিসিআই প্রেসিডেন্ট ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, গ্যাস সংযোগ উন্মুক্ত করার এমন উদ্যোগে আশাবাদী হবেন শিল্পমালিকরা। তাছাড়া সংযোগ নেয়ার জন্য উচ্চপর্যায়ের কোনো কমিটিই থাকবে না, এটা একটা বড় সিদ্ধান্ত হবে সরকারের। তার মতে কোয়ালিটি ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস যদি পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম একটু সমন্বয় হবে- এটা আমরাও মনে করি। যেহেতু কম দামে কিনে এনে তা বেশি দামে দেয়া যাবে না। তাই খাতওয়ারি কোন খাতে দাম বাড়বে ও কোন খাতে কমবে- সেটা সরকার চিন্তাভাবনা করবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতি-মাদকের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে দেশকে বিনিয়োগের নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে চান। এজন্য কার্যকরভাবে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেবেন। দেশের শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী সমাজ এজন্য প্রধানমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তবে তাদের মতে, বিনিয়োগ খাতে তখনই গতি আসবে, যখন সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা তথা গ্যাস-বিদ্যুতের প্রয়োজনীয় চাহিদার বিষয়টি নিশ্চিত করবেন। এর বাইরে কোনো স্বপ্ন কিংবা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হওয়ার সুযোগ নেই।
তাদের আরও অভিমত, অতীতের ন্যায় আমলাতন্ত্রসহ প্রভাব বিস্তারকারী বিভিন্ন সেক্টরের ষড়যন্ত্রকারীরা এখনও পুরোমাত্রায় সক্রিয়। তাদের কারণে বিগত দুই মেয়াদে সুযোগ ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি নিরাপত্তার বিষিয়টি নিশ্চিত করা যায়নি। তাই এবার শুরুতেই খোদ প্রধানমন্ত্রীকেই সজাগ ও সুদৃঢ় হতে হবে। তা না হলে ষড়যন্ত্রকারীদের রোষানলে পড়ে বিনিয়োগসহ দেশীয় শিল্প কলকারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সূত্র জানায়, এপ্রিলের মধ্যে সবমিলে ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) যুক্ত হবে জাতীয় গ্রিডে। এরপরই শিল্পে গ্যাস সংযোগ উন্মুক্ত করার টার্গেট রয়েছে সরকারের। বর্তমানে ঢাকাসহ সারা দেশে ২২শ’ ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট রয়েছে। এগুলোতে ৪০০-৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস লাগছে। প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর নেতৃত্বে শিল্পে গ্যাস সংযোগ দেয়ার জন্য গঠিত বিশেষ কমিটির কাছে বর্তমানে ৭ শতাধিক ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টে গ্যাস সংযোগের আবেদন জমা আছে। এর মধ্যে নতুন সংযোগের আবেদন পড়েছে আরও ৩০০। বাকিগুলো পুরনো ক্যাপটিভ প্ল্যান্ট এক্সটেনশনের আবেদন। সবমিলিয়ে আরও ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন এলএনজি যুক্ত হলেই শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দেয়া সম্ভব হবে।
জানা গেছে, গ্যাস অপচয়ের অজুহাত দেখিয়ে ২০১৫ সালের প্রথমদিকে ক্যাপটিভে নতুন সংযোগ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। একই সঙ্গে ক্যাপটিভ প্ল্যান্টের গ্যাসের দাম এক লাফে দ্বিগুণের বেশি বাড়িয়ে দেয়। এতে বিপাকে পড়েন সারা দেশের ছোট-বড় ২২শ’র বেশি শিল্পকারখানা মালিক। সরকারের আকস্মিক এ সিদ্ধান্তে বন্ধ হয়ে যায় শত শত শিল্পকারখানা। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে শিল্প স্থাপনসংক্রান্ত সব কাজ গুছিয়ে আনার পর সরকারের এ সিদ্ধান্তে বহু শিল্পোদ্যোক্তা চরম বিপাকে পড়েন। এতে নতুন শিল্পকারখানাগুলো শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়ে। নতুন শিল্প স্থাপনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন অনেক উদ্যোক্তা। এর প্রভাব পড়ে জাতীয় অর্থনীতিতে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শিল্পে গ্যাস সংযোগ বন্ধ ঘোষণার পর ২০১৫ সালের ৯ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় পরিদর্শন শেষে দ্রুত শিল্প ও বাণিজ্যিক কারখানায় গ্যাস সংযোগ দেয়ার নির্দেশনা দেন। শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় তিনি জ্বালানি বিভাগের কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষও প্রকাশ করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ফাইলবন্দি ছিল। পেট্রোবাংলার এক পদস্থ কর্মকর্তা ওই সময় বলেছিলেন, ২০১৫ সালে টানা অবরোধ ও হরতালে নাশকতার কারণে শিল্প খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা।
সরকারের নতুন এ সিদ্ধান্তে আবারও ঘুরে দাঁড়াবেন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকরা- এমনটি মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট থাকলে শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেয়া সম্ভব। পাশাপাশি কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। এতে পণ্য উৎপাদন সহজ ও খরচ কম পড়ে। কিন্তু ক্যাপটিভে গ্যাস সংযোগ বন্ধ হয়ে পড়ার পর থেকে এ সেক্টরে বড় ধরনের ধস নামতে শুরু করে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের এক নেতা বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। একমাত্র ক্যাপটিভ থেকেই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়ার সুযোগ আছে। এ অবস্থায় ক্যাপটিভে গ্যাস সংযোগ উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্তকে তিনি স্বাগত জানান।
৪ বছর ধরে শিল্প ক্ষেত্রে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় নতুন শিল্পকারখানা চালু হয়েছে খুবই কম। এতে শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আটকে গেছে অনেক উদ্যোক্তার বিনিয়োগ। ঋণ নিয়ে গড়া শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু করতে না পারায় তাদের এখন কাহিল দশা। সর্বোপরি জনসংখ্যা বাড়লেও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না।









