জাতীয়

অসাবধানতায় বাড়ছে বিদ্যুৎপৃষ্ট রোগীর সংখ্যা, আইনে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ নেই

নিউজ ডেস্ক৯ আগস্ট ২০১৮৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:  অসাবধানতায় বাড়ছে বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে রোগীর সংখ্যা। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের প্রতিদিনই আসছে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে আহত রোগী। এদের কেউ নিজ বাড়িতে আহত হয়েছেন, কেউ বা কর্মক্ষেত্রে এই ঘটনার শিকার হয়েছেন। প্রতিদিন ঘটে চলা এই অবস্থার পরিবর্তনে নকল বৈদ্যুতিক ব্যবহার উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধ, গৃহে ও কর্মক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে, বিদ্যুৎ আইনে নেই ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কোনও সুযোগ।

মো. রনি আহমেদ (৯) ও মো. সুজন আহমেদ (৭) নিজেদের বাসায় খেলাধুলা করছিল। এসময় একটি বল টেবিল ফ্যানের তারে এসে লাগে। রনি বলটি কুড়াতে গেলে ফ্যানের তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়। তাকে ধরতে গেলে ছোট ভাইও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়। এরপর তাদের হাসপাতালে ভর্তি করেন মা-বাবা। মো. মাহিন আহমেদ (৭) নিজ বাড়িতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়। তার ডান হাত পুড়ে যায়। পরবর্তীতে তাকে মা-বাবা বার্ন ইউনিটে এনে ভর্তি করে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে গেলে প্রায় সব ওয়ার্ডেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে আহত রোগীদের দেখা মেলে। এদের কেউ কর্মক্ষেত্রে আহত হয়েছেন কেউ বা নিজ বাড়িতে আহত হয়েছেন। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে আহতের তালিকায় রয়েছেন শিশু থেকে শুরু করে সত্তরোর্ধ ব্যক্তিও। অবহেলাজনিত এই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া থেকে চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, বেকার, গৃহিণী, স্কুল-মাদ্রাসায় পড়ুয়া শিশু কেউই বাদ পড়েনি।

আহতদের আত্মীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে আহতদের চিকিৎসা ব্যয় অনেক বেশি। বেশিরভাগ পরিবারই এই ব্যয় বহন করতে হিমশিম খাচ্ছে। যারা বেশি মাত্রায় আহত হয়েছেন তাদের ঘন ঘন অস্ত্রোপচার করাতে হচ্ছে। ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে বেড ভাড়া, চিকিৎসকের অস্ত্রোপচারের ব্যয়, রোগীর খাবার ও কিছু ঔষধ ফ্রি থাকলেও অনেক ঔষধই রোগীদের বাইরে থেকে কিনতে হয় যে ব্যয় সব রোগীর পরিবারের পক্ষে বহন করা সম্ভব হয়না।

শিউলি বালা (৩৭) ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে গত আট মাস ধরে অবস্থান করছেন । তিনি  বলেন, তার স্বামী একজন রাজমিস্ত্রি। নিয়োগকারী তাকে ঘরের টিনের ওপর উঠিয়েছিল গাছের ডাল কাটার জন্য। সেখানে ডালের পাশেই বিদ্যুতের তার ছিল সেটা তিনি বুঝতে পারেননি। ডাল কাটতে গেলে দায়ের কোপ লাগে বিদ্যুতের তারে। সঙ্গে সঙ্গে তার গায়ে আগুন ধরে যায়। এরপর সেখান থেকে উদ্ধার করে তাকে ঢাকা মেডিক্যালে (ঢামেক) নিয়ে আসি।

তিনি বলেন, ওর (স্বামীর) আয়েই আমাদের সংসার চলত। এখন আমরা পুরো নিঃস্ব হয়ে গেছি। জমানো টাকাও সব শেষ। জমিজমা সব শেষ। এরপরও সে পুরোপুরি সেরে উঠবে কিনা চিকিৎসকরা তার কিছু বলতে পারে না।
হতাশা নিয়ে শিউলি বলেন, বাড়িতে শখ করে বিদ্যুৎ নিছিলাম। কিন্তু সেই থেকে এমন বিপদ আসবে বুঝতে পারিনি।

বিদ্যুৎ আইন,২০১৮ এর ধারা ২৯ (১) এ দুর্ঘটনার নোটিশ ও তদন্ত সংক্রান্ত অংশে বলা হয়েছে, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন, সরবরাহ বা বিতরণের ফলে কিংবা বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন বা অন্যবিধ কার্যের ফলে কোনও দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকিলে অথবা ক্ষতি হইবার আশঙ্কা সৃষ্টি হইলে ক্ষেত্রমতো ক্ষতিগ্রস্ত বা জ্ঞাত কোনও ব্যক্তি ওই ঘটনা বা ক্ষতির বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে নোটিশ প্রদান করিতে পারিবেন।’

আইনের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে,‘এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে কর্তৃপক্ষ বলিতে প্রধান বিদ্যুৎ পরিদর্শককে অথবা সরকার কর্তৃক সময়ে সময়ে নির্দিষ্টকৃত কর্তৃপক্ষকে বুঝাইবে।’ আইনের (২) উপ-ধারা (১) এর অধীন নোটিশ প্রাপ্তির পর উক্ত কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত পদ্ধতিতে তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করিবে।’

শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, মানুষ কাজ করতে যায়। তখন জানে না যে গ্লাভস পরে কাজ করতে হবে। বাড়িতে বিদ্যুতের লাইনগুলো মনিটর করা হয় না। বাসার ছাদে কাজের মেয়েরা কাপড় শুকাতে যায়। কিন্তু,বিদ্যুতের তার ও কাপড় শুকানোর তার আলাদা থাকে না। এগুলোর কারণেই এই বিপদগুলো বেশি হয়। বেশিরভাগ রোগীর অঙ্গহানি হয়ে যায়। কারও হাত-পা কেটে যায়। সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যায়। বার্ন ইউনিট থেকে আমরা চিকিৎসাটা করি। ওদের এন্টিবায়োটিক কিছু ফ্রি দেই।

হেলথ রাইটস মুভমেন্ট এর প্রেসিডেন্ট ডা. রশীদ-ই-মাহবুব  বলেন, এটা তো বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের কাজ। সরকারের যে প্রচারের উইংগুলো আছে তাদের কাজ জনসচেতনতা বাড়ানো। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও মানুষকে সচেতন করতে কাজ করতে পারে। আসলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে আহতের ঘটনাগুলো বাড়িতে বেশি ঘটে। এগুলো নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা দরকার।

ডা. সামন্ত লাল সেন সচেতনতা তৈরি করা প্রসঙ্গে বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য আমি অনেকবার চেষ্টা করেছি।আগে কয়েকবার ওদের সঙ্গে মিটিং করেছি। পরে আর এ সংক্রান্ত কোনও সভা করতে পারিনি।

সেন্টার ফর ল অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্স সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ সঞ্চালন এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিতে, সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়বদ্ধতা নিশ্চিতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির বিষয়টি বিদ্যুৎ আইনে সংযুক্ত করা প্রয়োজন।