জাতীয়

কারো কপালে যেন বৃদ্ধাশ্রম না জোটে

নিউজ ডেস্ক৫ জুলাই ২০১৬৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

সারা জীবন সংসারটাকে শিশুর মতো যত্নআত্তি করে সেবা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখেন। বড় করে তোলেন। নিজের সংসারের জন্য আপন সুখ পর্যন্ত বিসর্জন দেন বিনা সঙ্কোচে। ছেলে-মেয়েদের যেন কষ্ট না হয়, সেজন্য নিজে প্রয়োজনে না খেয়ে সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেন। কিন্তু শেষ জীবনে এ কি ঘটে এইসব মানুষদের ভাগ্যে। কেন এমন হয়? তিল তিল করে গড়ে তোলা সেই ঘর ছেড়ে কেন তাকে বৃদ্ধাশ্রমে চলে যেতে হয়? এসব প্রশ্নের উত্তর অনেকেরই জানা। বৃদ্ধ বাবা-মাকে অনেক সন্তানই সহ্য করতে পারে না। ফলে যে মানুষটি সর্বোচ্চ ত্যাগ দিয়ে তাকে অফিসার কিংবা বড় চাকুরিজীবী বানালো শেষ পর্যন্ত তাকেই কি না সে দূরে ঠেলে দেয়! ঘরছাড়া করে! বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায়!

তবুও জীবনের পড়ন্ত বিকেলে গোধূলীর আলো-ছায়ায় স্পষ্ট হেসে খেলে বেড়ায় প্রিয়জনের মুখগুলো। দ্বীর্ঘশ্বাস এখনো তাদের খোঁজে ফিরে স্মৃতির ময়দানে। কিন্তু প্রিয়জন! আছেন, যে যার মতো। আর প্রিয়জনদের খোঁজে ফেরা সেই মানুষটির সঙ্গী এখন কেবল বৃদ্ধাশ্রম!

Ma

কারো প্রতি নেই অভিযোগ, নেই কোনো অনুযোগের ছিটেফোঁটাও। দু:খে-কষ্টে কাষ্ঠ। পাথরসম প্রায়। প্রবীণ নিবাস এখন আপন ঘর। নিবাসের বাসিন্দারা প্রতিবেশি। তারাই সব সময়ের সাথী।

আড্ডা, গল্প, বইপড়া, খবরপত্র নিয়ে আলোচনা, সমসাময়িক বিষয়ের বিশ্লেষণ; নিজেদের মধ্যে খুনসুটি, একে অপরের পাশে দাঁড়ানো সবকিছু যেন ভাগাভাগি তাদের সম্পর্ক।

রোববার রাজধানীর প্রবীণ হিতৈষী সংঘের ৫ম তলার হোমে ঢুকেই চোখে পড়লো দুজন বৃদ্ধা আর একজন মধ্যবয়স্ক নারী বসে গল্প করছেন। দেখে জানতে চাইলেন, কে এবং কেনো?

পরিচয় দিলে কিছুটা ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে আফসানা রমিজ (৭০) (ছদ্মনাম) বললেন, ‘যা কিছু একটা লিখেন। বলেন আমি বলেছি। আমাদের নিয়ে লিখে কী হবে? আমরা ভালো আছি।’ কথার ভঙ্গিতে নিশ্চিত হওয়া গেছে ভদ্রমহিলা আধুনিক এবং উচ্চ শিক্ষিতা। আরো কিছু বলতে চেয়েছেন। পারেননি। কারণ কথা ততোক্ষণে অন্যের মুখে।

hqdefault

পাশে বসে থাকা সায়রা আফরোজ (৭৬) (ছদ্মনাম) বলেন, ‘প্রবীণ নিবাস আরো বড় করতে হবে। সামনে আরো মানুষ আসবে। এতো ছোট জায়গায় সবাই থাকতে পারবে না। বরং হোম বাড়ানো যায় কি না- এ নিয়ে লিখেন।’

আবারো কথা টানেন আফসানা রমিজ। বলেন, ‘আমাদের এখানে খাবারের মান খুব খারাপ। পারলে এ নিয়ে কিছু করেন। মাঝে মাঝে বিভিন্ন জায়গা থেকে উপহার সামগ্রী আসলে কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত এসে ঠেকে যায়। এর মাধ্যমে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে।’

এবার যোগ দিলেন মধ্যবয়স্ক নারীও। তার কথায় জানা গেলো এতোক্ষণ তারা গুলশান ট্রাজেডি নিয়ে আলাপ করেছেন। তারা হতবাক! এ ছেলেগুলো কিভাবে বিপথগামী হতে পারে। নিহত জঙ্গিদের একজনকে মধ্যবয়স্ক ভদ্রমহিলা চেনেনও। তিনি তাজ্জব বনে গেলেন তার এ বদলে যাওয়ায়। তবে নিজের পরিচয়টা এক প্রকার এড়িয়ে গেলেন তিনি।

অনেকটা হতাশা ঝেড়ে বলেন, ‘এখন তাদের অভিভাবকদের ধরে বিচাররের আওতায় আনা উচিত। তার প্রশ্ন, আপনার ছেলে কি করে আপনি কেনো জানবেন না? তার দায়-দায়িত্ব আপনার। কর্মের ফলও আপনাকে নিতে হবে।’

একটু পরে জানা গেলো মধ্যবয়স্ক এই নারী তার এক আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। প্রায়ই আসেন। তাই প্রবীণ নিবাসের অনেকের সাথে তার খুব চেনা-জানা। কথার ফাঁকে ওই নারীর সাথে আসা তার ছেলে (খুব সম্ভবত) এবং এক ভদ্রলোক বেরিয়ে আসলেন নিবাসের একরুম থেকে। সাথে আসলেন আরেক প্রবীণ। এখানে বসে গল্প করা প্রবীণদের থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। সাথে সাথে সবাই আড্ডাস্থল ত্যাগ করলো।

বেরিয়ে আসার সময় দেখা মেলে চন্দনা (ছদ্মনাম) নামের আরেক বৃদ্ধার সঙ্গে। বয়স আনুমানিক ৮০ হবে। আলাপ হলো তার সাথে। আগামী কোরবানিতে ২ বছর হবে এ নিবাসে। নিবাসের সবার সঙ্গে খুব ভালো জানা-শোনা। তার কথায় ‘আমাদের সুখ-দুখ এখানকার সবার।’

প্রবীন নিবাস কেমন লাগে? প্রশ্নের উত্তরে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, ‘কেউ যেনো বৃদ্ধাশ্রমে না আসে। কারো কপালে যেনো এ বৃদ্ধাশ্রম না জুটে। কিছুটা থেমে নিজে নিজে বলতে লাগলেন, এ বয়সে সবাই নিজের পরিবারের সাথে থাকতে চায়। নিজের হাতে গড়া বাড়ি-ঘর সংসার ছেড়ে এখানে থাকাটা খুব কষ্টের।’

একা একা বলে গেলেন, ‘এ খুব কষ্টের। মাঝে মাঝে বুকটা ফেটে যায়। আগে খুব কষ্ট হতো। এ বারান্দায় দাঁড়িয়ে কতো কেঁদেছি। এখন আর কষ্ট হয় না। থাকতে যেহেতু হবে কেঁদে কি লাভ।’

এতো কষ্ট করে কেনো মানিয়ে নিলেন? তার ছলছল চোখে চোখ রেখে বুঝা গেলো এ এক অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তব সত্য। যা শুধু মেনে নিতে হয়। সরাসরি কিছু না বললেও ব্যাখ্যা দিলেন সম্পর্কের।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন চন্দনা। ব্যক্তিগত জিবনে বিয়ে করেননি তিনি। বিয়ের বিষয়ে দ্বিতীয় কোনো প্রশ্ন করা যাবে না- জানিয়ে দিলেন আগেই। তার মতে সম্পর্ক তৈরির সাথে সাথে সম্পর্কের মানুষগুলোর যত্ন নিতে হয়। সম্পর্ক টিকে থাকে চর্চার ওপর। যত্ন আর চর্চা ঠিক করে দিবে সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত মানুষগুলো একে অপরের প্রতি কতোটা সহানুভূতিশীল।

image

একান্নবর্তী পরিবারে বড় হয়েছেন চন্দনা। তার মতে সামাজিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনে পারিপার্শ্বিকতায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। এখন একান্নবর্তী পরিবার নেই। নেই বড় পরিবারও। এখন সবাই ছোট পরিবার তৈরি করে। স্বামী-স্ত্রী আর এক, দুটি বাচ্চা।

চন্দনা প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘তাহলে বাবা-মা যাবে কোথায়?’ এ থেকে মুক্তি পেতে স্বামী-স্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, যত্নশীল, সহানুভূতিশীল হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘স্বামী যেমন স্ত্রীর বাবা-মা, পরিবারকে নিজের মনে করবে, স্ত্রীও স্বামীর বাবা-মা পরিবারকে নিজের ভাববে। একই সঙ্গে একে অপরের বিপদে এগিয়ে আসবে। নিজেদের মধ্যে লেনদেন বাড়াতে হবে। একে অপরকে বুঝতে ও বুঝাতে হবে। তাহলে পরস্পরের প্রতি নির্ভরতা বাড়বে। শ্রদ্ধা এবং গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।’

52d835dec8411-8

এবার ঈদ প্রসঙ্গ। এখানকার ঈদ কেমন লাগে আপনার? এতোক্ষণের আলাপচারিতায় আন্তরিকতার ঘাটতি ছিল না। যা এ প্রশ্নের উত্তরে বেরিয়ে এলো- উত্তরে বলেন, ‘ভালো লাগে। ভালো লাগে…।’ এ যে শুধু বলার জন্য বলা তা বুঝতে দেরি হয়নি। কথা এগিয়ে নিলেন তিনি। আত্মীয়রা তিনটি শাড়ি কিনে দিয়েছে। ঈদের দিন শাড়ি পরবেন। নিবাসের সবার সাথে ঈদ উদযাপন করবেন।

ঈদে কেউ নিতে আসলে বাড়িতে যাবেন? উত্তরটা তৈরি ছিল। আমি তো বাড়িতে যাই। প্রয়োজনে, ইচ্ছে হলে যাই। আবার চলে আসি। কাউকে বিরক্ত করি না। ঈদে কেউ আসবে কিনা জানিনা। আসলে আসবে, না আসলে নাই। এমনই ছিল তার মুখের সহজ উত্তর।

 

সূত্র:বাংলামেইল