জাতীয়

বন্যায় পটিয়ার ৫১২ হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে, স্বপ্নভঙ্গ কৃষকের

নিউজ ডেস্ক১২ জুলাই ২০২৬৩ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

টানা কয়েক দিনের ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের বন্যায় চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কৃষি খাতে নেমে এসেছে ভয়াবহ বিপর্যয়। ১৭টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো পানির নিচে।

ঘরবাড়ি, সড়ক ও জনজীবনের দুর্ভোগের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় আঘাত লেগেছে কৃষকের জীবিকায়। কোমর সমান পানিতে ডুবে আছে ধান, সবজি ও আমনের বীজতলা। কয়েক মাসের পরিশ্রম, ধারদেনা করে করা বিনিয়োগ আর আগামী দিনের স্বপ্ন সব কিছুই যেন বানের জলে ভেসে গেছে।
পটিয়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, উপজেলার ১০০ হেক্টর আউশ ধান, ৩২ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ৩৮০ হেক্টর সবজি আবাদসহ মোট ৫১২ হেক্টর কৃষিজমি বর্তমানে বন্যার পানিতে নিমজ্জিত।

তবে কৃষি বিভাগের আশঙ্কা, পানি দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্ষতির পরিমাণ আরো অনেক বাড়বে।
সরেজমিনে উপজেলার কচুয়াই, ধলঘাট, কেলিশহর, খরনা, কুসুমপুরা, বড়লিয়া, জঙ্গলখাইন, হাবিলাসদ্বীপ, কোলাগাঁওসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, যতদূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। কোথাও সবজির মাচা ডুবে আছে, কোথাও আমনের বীজতলা পানির নিচে। কৃষকেরা অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে দেখছেন, কিন্তু কিছুই করার নেই।

কচুয়াই পাহাড়ি এলাকার কৃষক আবদুল জব্বার বলেন, ‘গত ৫-৬ দিন ধরে টানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে আমার তিন একর জমির কাকরোল, চিচিঙ্গা, পেঁপে, বেগুন, করলা, সিম ও আদার ক্ষেত একেবারে শেষ হয়ে গেছে। আগে বর্ষায় এমন ক্ষতি হয়নি। এবার সবকিছু চোখের সামনে ডুবে গেল। ধারদেনা করে চাষ করেছি, এখন সেই টাকা কীভাবে শোধ করব জানি না।’

জঙ্গলখাইন ইউনিয়নের কৃষক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমনের বীজতলা তৈরিতে অনেক টাকা খরচ করেছি।

এখন সব পানির নিচে। পানি আরও কয়েকদিন থাকলে বীজতলা আর রক্ষা হবে না। নতুন করে বীজ কিনে চাষ করার সামর্থ্য নেই।’
কেলিশহর এলাকার সবজি চাষি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আগাম সবজি লাগিয়েছিলাম ভালো দাম পাবো বলে। কিন্তু বাজারে নেওয়ার আগেই সব পানিতে তলিয়ে গেছে। পরিবার নিয়ে এখন কীভাবে চলব, সেটাই বুঝতে পারছি না।’

পটিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, ‘এখনও অনেক এলাকায় পানি রয়েছে। তাই প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। প্রাথমিকভাবে ১০০ হেক্টর আউশ, ৩২ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ৩৮০ হেক্টর সবজি আবাদি জমি নিমজ্জিত হয়েছে। পানি নেমে গেলে মাঠ পর্যায়ে বিস্তারিত জরিপ করে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করা হবে।’

তিনি আরো বলেন, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠে কাজ করছেন এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হবে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বীজ, সার ও কৃষি উপকরণ সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে, ক্ষতিগ্রস্হ কৃষকেরা বলছেন পুনর্বাসন ছাড়া ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। শুধু ক্ষয়ক্ষতির তালিকা করলেই চলবে না, দ্রুত পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করতে হবে। বিনামূল্যে আমনের বীজ, সবজির বীজ, সার, কৃষি প্রণোদনা এবং সহজ শর্তে কৃষিঋণের ব্যবস্থা না হলে অনেক কৃষকের পক্ষে নতুন করে চাষাবাদ শুরু করা সম্ভব হবে না।

তারা আরো বলছেন, পানি শুধু জমি ডুবায়নি, আমাদের ভবিষ্যৎও ডুবিয়ে দিয়েছে। এখন আমাদের একটাই প্রত্যাশা পানি দ্রুত নেমে যাক, আর সরকার যেন দ্রুত পুনর্বাসনের হাত বাড়িয়ে দেয়। তা না হলে এবারের বন্যা পটিয়ার কৃষি অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কৃষি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হবে। এরপর সরকারি পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এবার শুধু চলতি মৌসুমের ক্ষতিই নয়, আমনের বীজতলা নষ্ট হওয়ায় আগামী মৌসুমের ধান উৎপাদনও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে শত শত হেক্টর সবজির আবাদ নষ্ট হওয়ায় কয়েক সপ্তাহের মধ্যে স্থানীয় বাজারে সবজির সরবরাহ কমে গিয়ে মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।