চাঁপাইনবাবগঞ্জ

রাজশাহী অঞ্চলের ঘাটে ঘাটে গরুর সঙ্গে আসে মাদক অস্ত্র, রয়েছে সীমাহীন চাঁদাবাজি

নিউজ ডেস্ক১০ ডিসেম্বর ২০১৬৬ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালানসহ অব্যাহত চাঁদাবাজি ঠেকাতে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর সবকটি সীমান্ত ঘাট দিয়ে গরু আমদানি প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে বর্ডার গার্ড (বিজিবি)। গত প্রায় এক মাস ধরে সীমান্ত দিয়ে গরু আসার পথ একের পর এক বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। সর্বশেষ গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে গরু আসা প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। এতে করে এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সাধারণ ব্যবসায়ীদের যেন মাথায় হাত পড়েছে। আবার রাজশাহীর করিডোরগুলোতেও কমেছে রাজস্ব আদায়ের মাত্রা।

  • অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা থেকে শুরু করে গরু আনার নামে ব্যাপক চোরাকারবারিতে জড়িয়ে পড়েছেন। আবার চাঁদাবাজিও করছেন এসব লোকজনই। ক্ষেত্র বিশেষে গরু প্রতি চাঁদা আদায় করা হচ্ছে ২-৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। আর এসব কারণে গরু ভারত থেকে আনা হলেও তার সুফল পাচ্ছেন না ভোক্তারা। সাধারণত ভারতীয় গরু আনার পরে সেগুলো দেশের বিভিন্ন হাট-বাজারে বিক্রি হয় মাংস হিসেবে। কিন্তু অব্যাহত চাঁদাবাজির কারণে গত কয়েক বছর মাংসের দাম কমার চেয়ে দিন দিন বেড়েই চলেছে। সীমান্তে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা বিজিবি সদস্যদের গোয়েন্দা রিপোর্টেও এমনটাই উঠে এসেছে বলেও নিশ্চিত করেছে একাধিক সূত্র।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহীতে সাতটি, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১০টি এবং নওগাঁয় একটি সীমান্ত ঘাট রয়েছে। এসব ঘাট দিয়ে গত এক মাস আগেও প্রতিদিন অন্তত ২০ হাজার গরু আসত ভারত থেকে। কিন্তু এক সপ্তাহ ধরে গরু আনা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ওপার থেকে গরু ছাড়ার সব ব্যবস্থা করা হলেও এপার থেকে বিজিবির বাধার কারণে তা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারছে না। গত ধরে প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সবকটি ঘাট। দুই-একটি ঘাট ছাড়া বাকি অন্তত ১৫টি ঘাটই বন্ধ হয়ে আছে গত তিনদিন ধরে।
একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, গরু আনার নামে এক শ্রেণির চোরকারবারি ওপর থেকে সমানে মাদক ও অস্ত্র আনা হচ্ছে। বিশেষ করে গরুর সঙ্গে আসে ফেনসিডিল, হেরোইন এবং পিস্তল। সাম্প্রতিক সময়ে এসব অবৈধ পণ্য দেশে আনার পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পায়। এরই মধ্যে গত ২৪ অক্টোবর চাঁপাইনবাগঞ্জের শাহিনের বাড়ি থেকে ২২টি পিস্তল, ৩৪টি ম্যাগজিন ও ১৩৬ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে পুলিশ।

 

এ ঘটনায় শাহিনের সৎমা রোকেয়া বেগম ও চাচাতো ভাই শাকিল আহমেদকে আটক করা হয়। এর বাইরেও গত তিন মাসে র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবি মিলে অন্তত ২০০টি পিস্তল উদ্ধার করে। এর সবগুলোই সীমান্ত পেরিয়ে ভারত থেকে আসা বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এর বাইরে বানের পানির মতো আসতে থাকে মাদক দ্রব্য। বিশেষ করে হেরোইন ও ফেনসিডিলের আমদানি রোধ করতেই যেন হিমশিম খেতে হয় সীমান্তে দায়িত্বরত বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। পাচার করে আনা মাদকের মধ্যে মাত্র ৪-৫ ভাগ কেবল ধরা পড়ে বলেও একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সরকারের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। সর্বশেষ গত ২২ নভেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্চের বকচরপুর সীমান্ত ঘাট এলাকা থেকে দুই কেজি ৯০০ গ্রাম হেরোইনের চালান উদ্ধার করে বিজিবি।

  • অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবঞ্জ সীমান্ত হয়েই সাধারণত গরুর সঙ্গে এসব অস্ত্র ও মাদকের চালান আসছে। গরু আমদানির কথা বলে একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতারাও মাদক অস্ত্র আমদানিতে জড়িয়ে পড়ছেন। যেগুলো পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করা হচ্ছে। পুলিশ র‌্যাব, বিজিবিসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

একটি বিস্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে, গরু আনার সঙ্গে মাদক ও অস্ত্রের চালান আসা ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে মারাত্মক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে চাঁদাবাজি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ঘাট মালিকরা এসব চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়েছেন। ক্ষেত্র বিশেষে গরু প্রতি চাঁদা আদায় করা হয়েছে ৩-৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।

  • সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভারত থেকে আনা গরু প্রতি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নামে এক হাজার ৫০০ টাকা, করিডোর করার জন্য ৬০০ টাকা, বিট খরচ ৩৫০ টাকা, লাখাল খরচ ৬০০ টাকা, ভারতের পাচারকারীদের খরচ এক হাজার টাকা, নৌকা ভাড়া ৩০০-৭০০ টাকা, হাট খরচ ৩০০-৩৫০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। রাজশাহীর সোনাইকান্দি, ১০ নম্বর চর ঘাট থেকে শুরু করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাখর আলী, চর বাগডাঙ্গা, হাকিমপুর, ফরিদপুরসহ সবকটি ঘাটেই এভাবে সীমাহীনভাবে গরু প্রতি চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।

গরু ব্যবসায়ী ডলার হোসেন বলেন, ‘গরু আনতে গেলে ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিতে হচ্ছে। চাঁদার পরিমাণ এতো বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, এখন গরু এনে অনেকেই লসের মুখেও পড়ছেন। এসব বিষয়ে আমরাও প্রতিকার চেয়ে প্রশাসনসহ স্থানীয় শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের কাছে অভিযোগ করেছি। কিন্তু তার পরেও চাঁদাবাজি অব্যাহতই থেকে গেছে। ফলে ভারত থেকে গরু আনা হলেও হাটে এর কোনো প্রভাব পড়ছে না। এতে করে মাংসের দামও কমছে না। বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে।’

  • চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাখর আলী সীমান্ত এলাকার বাসীন্দা হযরত আলী বলেন, ‘চরের মধ্যে বসবাস করি আমরা। ভারত থেকে গরু আমদানি করে যে অর্থ পাই তা দিয়েই কোনো মতে চলে সংসার। কিন্তু গত এক সপ্তাহ গরু আনা প্রায় বন্ধ হয়ে আছে। ফলে ব্যবসাও যেমন লাটে উঠেছে, তেমনি গরুর রাখাল হিসেবে যারা নিয়োজিত তারাও খেয়ে-না খেয়ে দিনাতিপাত করছেন।

চাঁদা আদায়ের কথা স্বীকার করে রাজশাহীর সোনাইকান্দি ঘাটের ইজারাদার মাসেদুল ইসলাম বলেন, ‘ সরকার দলের স্থানীয় কিছু নেতাকর্মী আছে, তাদের জন্য দেড় হাজার টাকা গরু প্রতি রাখতে হয়। এর বাইরেও ঘাট চালাতে কিচু টাকা খরচ হয়। তবে গত তিন দিন ধরে গরু আসা একেবারে বন্ধ হয়ে আছে।
কেন বন্ধ হয়ে আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিজিবি থেকে এখন বাধা দেওয়া হচ্ছে। কয়েকদিন পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলেও বিজিবি আশ্বস্ত করেছে।’

  • সরকার দলের স্থানীয় নেতাদের চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান বলেন, স্থানীয় কিছু নেতাদের চাঁদাবাজির কারণে ভারতীয় গরু ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে-এমন অভিযোগ আমাদের কাছেও আসছে। আমরা এসব বিষয় নিয়ে কয়েকজন নেতাকে এরই মধ্যে সতর্কও করে দিয়েছি। কিন্তু তারপরেও চাঁদাবাজি হচ্ছে বলে শুনেছি।’

গরু আমদানি প্রায় বন্ধ হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিজিবির রংপুর রিজিওনের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহরিয়ার আহমেদ চৌধূরী বলেন, ‘সীমান্ত দিয়ে গরু আমদানি বন্ধ করা হয়নি। তবে কিছু কারণে সীমান্ত দিয়ে গরু আনা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবার যেনতেনভাবে গরু আনার নামে কেউ যেন অপরাধে না জড়াতে পারে-সেইদিকটাও আমরা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গরু আনতে গিয়ে সীমান্তে কোনো হত্যাকা- না ঘটে সেইদিকটাও আমরা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।’

তবে বিজিবির একটি দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে, এবার পরিস্থিতি নিজেদের মতো করে তৈরী করেই সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে গরু আমদানির সুযোগ করে দিবে বিজিবি। এর জন্য আপাতত কয়েকটা দিন রাজশাহী অঞ্চলের ১৮টি ঘাটই প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আগামি দুই-এক দিনের মধ্যেই এসব ঘাট খুলে দেওয়া হবে। তবে সে ক্ষেত্রে কড়া সতর্কতার সঙ্গেই এবার গরু আমদানি করতে দেওয়া হবে ব্যবসায়ীদের। যাতে করে গরু আনতে গিয়ে সীমান্তে হত্যা বন্ধ ও মাদক এবং অস্ত্র চোরাচালন অনেকটায় প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।

স/আর