নিজস্ব প্রতিবেদক :
পাবনা মানসিক হাসপাতালে নিরাপত্তা কাজে নিয়োজিত আনসার সদস্যদের টাকা দিলেই যে কেউ অবাধ যাতায়াত করতে পারছেন। ভেতরে গিয়ে রোগীদের নিয়ে তৈরি করছেন তামাশামূলক ভিডিও। এতে হয়রানিমূলক আচরণে মানসিক হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে রোগীদের। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় অবহেলায় যুগোপযোগী চিকিৎসা, বিনোদন ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা দিতে অক্ষম মানসিক রোগ চিকিৎসায় বিশেষায়িত এই হাসপাতালটি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রতিষ্ঠার প্রায় সাড়ে ৬ দশকেও ভাগ্য বদলায়নি হাসপাতালের। অবকাঠামো, চিকিৎসা সরঞ্জাম, চিকিৎসকসহ নানা সংকটে জর্জরিত এই হাসপাতাল। এদিকে দু-একজন সুস্থ হলেও পরিবার ও সমাজের নিষ্ঠুর আচরণে আবার তাদের ঠিকানা হচ্ছে মানসিক হাসপাতাল। সুস্থ হয়েও কেউ কেউ ফিরতে পারেনি আপন ঠিকানায়।

বহির্বিভাগে রোগীদের জন্য নেই পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ। রোগী ভর্তির ক্ষেত্রে দালালের কবলে পড়ে হয়রানির অভিযোগ নতুন নয়।
অরক্ষিত হাসপাতাল ও রোগী : নিয়মানুযায়ী রোগীর স্বজন ছাড়া অন্য কারো হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশের তেমন সুযোগ নেই। কিন্তু প্রতিদিন অসংখ্য লোক প্রবেশ করছেন এখানে।
প্রবেশ করে মানসিক রোগীদের উত্ত্যক্ত এবং হয়রানি করা যেন নিত্য ঘটনা। বিশেষ করে কথিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর বা ব্লগাররা এর ভেতরে ঢুকে মানসিক রোগীদের নিয়ে তৈরি করছেন তামাশামূলক ভিডিও। পরে এসব ভিডিও প্রকাশ করা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এমন স্পর্শকাতর ও সংরক্ষিত জোনে কিভাবে প্রবেশ করছেন যে কেউ? এর উত্তর মেলে কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে। সম্প্রতি পরিচয় গোপন করে হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলে ২০০ টাকা দাবি করেন দায়িত্বরত আনসার সদস্য এনামুল ও তাঁর সহযোগীরা।
পরে দর-কষাকষির এক পর্যায়ে ১০০ টাকা দিলে ভেতরে পৌঁছে দেন তাঁরা। এভাবেই ৫০-১০০ টাকায় যে কেউই হাসপাতালে ঢুকে পৌঁছে যাচ্ছে রোগী অবধি।
রোগী, ওষুধ ও দালাল সামাচার : গত বছরের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৮০ হাজার রোগী হাসপাতালে ভর্তি থেকে এ যাবৎ চিকিৎসা নিয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালের ভর্তি রোগীর মধ্যে সাতজন সুস্থ হলেও ভুল ঠিকানা ও স্বজনদের অনীহার কারণে বাড়ি ফিরতে পারছেন না। ভর্তি রোগীর বাইরেও দূর-দূরান্ত থেকে হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ২০০-৩০০ রোগী চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। কিন্তু টাকা না দিলে সিরিয়াল ব্রেক ও চিকিৎসাপত্র আটকে রাখাসহ রোগীর স্বজনরা নানাভাবে হয়রানির শিকার হন বলে রয়েছে অভিযোগ। কুষ্টিয়ার শমেসপুর থেকে রোগী নিয়ে আসা সালমা ও নাটোরের লালপুর থেকে আসা আব্দুল্লাহ-আল-মামুনসহ কয়েকজন এমন অভিযোগ করেন। রংপুর থেকে মানসিক রোগী ভাইকে নিয়ে আসা মইনুল জানান, আসার পর স্থানীয় কয়েকজন দালাল তাঁদের ঘিরে ধরেন। ১৬ হাজার ৮০০ টাকায় রোগী ভর্তি করে দেবে বলে জানান।
জনবল সংকট : এই হাসপাতালে ৬০ শয্যা দিয়ে শুরু হওয়া মানসিক চিকিৎসা শুরু হলেও পরে ২৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। হাসপাতাল ৫০০ শয্যায় উন্নীত হলেও এখনো সেই পুরনো জনবল কাঠামোতেই চলছে হাসপাতাল। ওই কাঠামো অনুযায়ী হাসপাতালে সিনিয়র কনসালট্যান্টের দুটি পদ রয়েছে। ১৯৭৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত এই পদ পূরণ হয়নি। ঢাকার ২০০ শয্যার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ৫০ চিকিৎসক থাকলেও ৫০০ রোগীর পাবনা মানসিক হাসপাতালে পদ রয়েছে ৩১ চিকিৎসকের। আবার এর ৯টি পদই শূন্য রয়েছে।
পাবনা মানসিক হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. নাঈম আকতার আব্বাসী বলেন, এ ধরনের রোগীদের উত্ত্যক্ত ও হেয়প্রতিপন্ন করা, মানসিক হেনস্তার বিষয়টি রোগীর মনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। এর ফলে তাদের যে রিকভারি ফেইস সেটি প্রলম্বিত হয়।
হাসপাতালের চিকিৎসা তত্ত্বাবধায়ক ডা. এহিয়া কামাল বলেন, জনবল ও অন্যান্য সংকট থাকলেও আমাদের পক্ষ থেকে রোগীদের প্রতি কোনো ধরনের অবহেলা করা হয় না।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রোগীদের উত্ত্যক্ত করা তো দূরে থাক, যত্রতত্র হাসপাতালে প্রবেশের সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে নিরাপত্তাকর্মীদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া আছে। এর পরও কেউ লোক ঢুকিয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।









