সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
প্রতিবছর ২০ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অস্টিওপোরোসিস ফাউন্ডেশন পালন করে বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস। বিশ্বের প্রতিটি ব্যক্তিকে হাড়ের স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতন করা এ দিবসের লক্ষ্য। এ বছরে দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য, ‘It’s Unacceptable!’ অর্থাৎ অস্টিওপোরোসিসের চিকিৎসা ও সচেতনতায় কোনো প্রকার ঘাটতি গ্রহণযোগ্য নয়।

অস্টিওপোরোসিস কী?
অস্টিওপোরোসিস শব্দের অর্থ ‘ছিদ্রযুক্ত হাড়’।
এই রোগে হাড়ের ঘনত্ব কমে যায়, ফলে হাড় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে এবং খুব সামান্য আঘাতেও ভেঙে যেতে পারে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মেরুদণ্ড, কোমর ও কবজির হাড়। এটি একটি ‘নীরব রোগ’, কেননা রোগের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে হাড় দুর্বল হলেও দীর্ঘদিন পর্যন্ত কোনো প্রকার উপসর্গ দেখা দেয় না। অনেক রোগী অল্প আঘাতে হাড় ভেঙে যাওয়ার পর জানতে পারে যে তার অস্টিওপোরোসিস হয়েছে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে অস্টিওপোরোসিস কমবেশি সবার হয়ে থাকে। তবে পুরুষদের তুলনায় নারীরা এ রোগে বেশি ভোগে। তরুণ বয়স থেকে প্রতিরোধে সচেতন হলে রোগের প্রকোপ কমানো সম্ভব। বেশির ভাগ রোগী বিভিন্ন জটিলতায় ভোগে শুধু সচেতনতার অভাবে।
ঝুঁকিতে যারা
► ৫০ বছরের বেশি বয়সী নারী ও পুরুষ
► রজঃনিবৃত্ত (মেনোপজ) পরবর্তী নারী
► ধূমপায়ী ও অতিরিক্ত মদ্যপানকারী ব্যক্তি
► যারা কম ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি গ্রহণ করে বাংলাদেশিদের মধ্যে এর হার অনেক বেশি
► শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়ামের অভাব রয়েছে যাদের আমাদের দেশে ক্রমেই শ্রমহীন জীবনযাপনে অভ্যস্ত হচ্ছে অনেকেই
► দীর্ঘদিন স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ ব্যবহারকারীরা
বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ও পুষ্টিহীনতার কারণে এই রোগের প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে
বিশ্বে অস্টিওপোরোসিসের চিত্র
বিশ্বে আনুমানিক ২০০ মিলিয়নের বেশি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে একজন এবং প্রতি পাঁচজন পুরুষের মধ্যে একজন জীবনের কোনো এক পর্যায়ে অস্টিওপোরোটিক ভাঙনের শিকার হয়। এ ধরনের ভাঙন শুধু যে ব্যথা বা চলাফেরায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে তা-ই নয়, অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক কষ্টেরও কারণ হয়।
প্রতিরোধই সেরা উপায়
অস্টিওপোরোসিস সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য নয়, তবে প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। মনে রাখতে হবে, সঠিক সময়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেয়ে ভালো কোনো চিকিৎসা নেই।
পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণ : দুধ, দই, পনির, ছোট মাছ, শাক-সবজি, তিল ইত্যাদিতে প্রচুর ক্যালসিয়াম থাকে।
ভিটামিন ডি : রোদে অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিট অবস্থান করলে শরীরে প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ডি তৈরি হয়। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট নিতে হয়।
নিয়মিত ব্যায়াম : হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা, হালকা দৌড় বা ওজন বহনকারী ব্যায়াম (weight-bearing exercise) হাড়কে মজবুত রাখে।
ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার : এগুলো হাড়ের গঠন ব্যাহত করে এবং ক্যালসিয়াম শোষণ কমায়।
হাড়ের পরীক্ষা (BMD Test) : বয়স ৫০ বছর পার হলে বা ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর সদস্য হলে বছরে অন্তত একবার Bone Mineral Density (BMD) পরীক্ষা করা উচিত।
ব্যবস্থাপনা
চিকিৎসকের পরামর্শে বিসফসফোনেট, ক্যালসিটোনিন, প্যারাথরমোন অ্যানালগ, ডেনোসুমাব ইত্যাদি ওষুধ ব্যবহার করা হয়। তবে যেকোনো ওষুধ শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ আবশ্যক।
মোট কথা, অস্টিওপোরোসিস নীরবে হাড় ক্ষয় করে, কিন্তু সময়মতো সচেতনতা ও ব্যবস্থা নিলে এর ক্ষতি রোধ করা সম্ভব। ভালো খাদ্যাভ্যাস, রোদে থাকা, নিয়মিত ব্যায়াম, আর সময়মতো পরীক্ষা—এই চারটি অভ্যাসই আপনার হাড়কে করবে শক্ত ও সুস্থ। চলুন, ২০২৫ সালের বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবসে প্রতিজ্ঞা করি, ‘আমরা সবাই হাড়ের যত্ন নেব, শক্ত হাড়ে গড়ব শক্ত ভবিষ্যৎ।’
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক
এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়









