জাতীয়

সীমান্তের দুপারে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মানুষ 

নিউজ ডেস্ক৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪৭ মিনিট পড়া

সিল্কসিটি নিউজ ডেস্ক

মিয়ানমারের রাখাইনে জান্তা বাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মির লড়াই আরও তীব্র হয়েছে। ওপারে চলছে মুহুর্মুহ গোলাগুলি। গুলি ও ভারী মর্টারশেল ছুটে আসছে বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতরে। একের পর গোলা ও বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠছে সীমান্ত এলাকা।

মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত  সাড়ে ৮টা পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে কক্সবাজারের উখিয়া ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সীমান্তে পাঁচ বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর। জীবন বাঁচাতে সীমান্তবর্তী বাংলাদেশি গ্রামগুলো ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। আগের দিন বাংলাদেশি নারীসহ দুজন নিহত হওয়ার ঘটনায় আতঙ্কে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছে সীমান্তবর্তী মানুষ। বান্দরবান ও কক্সবাজারের তিন উপজেলার সীমান্ত এলাকার ১০ গ্রামের অন্তত এক লাখের বেশি বাসিন্দা প্রায় ঘরবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। তাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে বান্দরবান জেলা প্রশাসন।

এদিকে আরাকান আর্মির ধাওয়া খেয়ে পর্যন্ত মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) ২৬৪ জন বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশ সীমান্তে ছুটে আসছে শত শত মিয়ানমারের নাগরিক (রোহিঙ্গা)। মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশকালে ২৩ জনকে আটক করা হয়েছে। বড় নৌকা দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টার সময় ৬৫ জনকে ফেরত পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে কোনোভাবেই রোহিঙ্গা ঢুকতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে রাতদিন টানা গুলিবর্ষণ, মর্টারশেলসহ বিস্ফোরণের শব্দে সীমান্ত এলাকাজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ ঘটনায় সীমান্তের কাছাকাছি ১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে প্রশাসন। পার্বত্য বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার তিন উপজেলার সীমান্ত এলাকার ১০ গ্রামের মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। সীমান্তবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন।

সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে বান্দরবান জেলা প্রশাসন। মঙ্গলবার বান্দরবানের জেলা প্রশাসক শাহ্ মোজাহিদ জানান, আমরা সীমান্ত এলাকার মানুষের জন্য ২টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছি। আমাদের আহ্বান সীমান্ত এলাকার মানুষজন যাতে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যান। ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে সবাইকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাব।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, মঙ্গলবার সকালে নৌকায় করে নতুন করে ৬৫ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করে। বিজিবি তাদের প্রতিহত করেছে। আমরা আর কোনো রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঢুকতে দেব না।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহিন ইমরান জানিয়েছেন, মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলি, মর্টারশেল সীমান্তের এপারে বসতঘরে এসে পড়ছে। তাই সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

বান্দরবানের জেলা প্রশাসক শাহ্ মোজাহিদ উদ্দিন জানিয়েছেন, প্রাথমিক অবস্থায় ঘুমধুম ও তুমব্রু সীমান্তের মানুষকে নিরাপদে আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে। উত্তর ঘুমধুম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে আশ্রয়কেন্দ্র করা হয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, কক্সবাজারের উখিয়ার সীমান্তবর্তী রহমতের বিল সীমান্ত অতিক্রম করে আশ্রয়ের জন্য বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বিজিপির ১১১ সদস্য। বর্তমানে উখিয়ার রহমতের বিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিজিবির হেফাজতে তাদের রাখা হয়েছে। উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের রহমতের বিল, ধামনখালী, আন্জুমান পাড়া সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের ঢেঁকিবুনিয়ায় ব্যাপক সংঘর্ষ চলছে। শত শত রাউন্ড গুলি-ভারী মর্টারশেলের বিকট শব্দ কেঁপে উঠছে উখিয়ার সীমান্ত।

পালংখালী ইউনিয়নের থাইংখালীর রহমতের বিল এলাকায় মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার সময় আল-ইয়াকিনের সদস্য সন্দেহে ছয়জনকে অস্ত্রসহ আটক করেছে স্থানীয় জনতা। আটককৃতদের কাছ থেকে তিনটি অস্ত্র, দুটি গ্রেনেড, একটি মর্টারশেল ও কিচজু বুলেট জব্দ করা হয়েছে। আটককৃতরা হলো-আব্দুল্লাহ (১৮), আবু সালাম (৩১), মো. রফিক (২৪), শফিক আলম (২১), শামসু (২৭), হাফেজ ফারুক (১৮)। তারা নিজেদের উখিয়ার কুতুপালং-বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা বলে দাবি করেছে। পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী জানান, আটককৃতদের জনতা পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে।

বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি), সেনা ও শুল্ক কর্মকর্তাসহ বিকালে আরও ৩৬ জন পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। এ নিয়ে গেল কয়েক দিনে ২৬৪ জন বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন।

বিজিবি আরও জানায়, গতকাল সকালে উখিয়ার থাইংখালী রহমতের বিলে দুই নারীসহ মিয়ানমারের ১১৪ জন বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের মধ্যে শুধু মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরাই নয়, দেশটির সেনাসদস্য, শুল্ক কর্মকর্তা ও অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাও রয়েছেন।

পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, সীমান্ত এলাকা থেকে অনেক লোকজন অন্যত্র চলে যাচ্ছে এবং অনেক চাষী ক্ষেতেও মাছের প্রজেক্টে যেতে পারছে না। সীমান্তের লোকজন খুব আতঙ্কে আছে। থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

এদিকে গতকাল সকালে মিয়ানমারের মর্টারশেল এসে পড়েছে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের মধ্যমপাড়া এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের বাড়িতে। উঠানের আমগাছে লেগে মাটির নিচে ঢুকে যায়। এতে কেউ হতাহত না হলেও বসতঘরের কাচের জানালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এলাকাবাসী জানান, ঘুমধুমের বেতবুনিয়া বাজার থেকে পূর্ব দিকে পাহাড়ের ওপর মধ্যমপাড়ায় বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের বসতঘর। মঙ্গলবার সকাল থেকে ওপারের ঢেঁকিবুনিয়া এলাকার বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) ২ নম্বর ব্যাটালিয়ন ক্যাম্প রয়েছে। ঠিক সেখান থেকে সকাল ৯টার দিকে একটি মর্টারশেল ছুড়ে এসেছে ছৈয়দ নুরের বাড়ির আঙিনায়।

ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, তুমব্রু আশপাশের এলাকার লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং দোকানপাটও বন্ধ রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি সাত নম্বর ওয়ার্ডে একটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। লোকজনকে একত্রিত না হয়ে আলাদা আলাদা চলাফেরা করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে মিয়ানমার থেকে ছোড়া মর্টারশেল বাড়িতে পড়ে দুজনের মৃত্যু হয়। পাশাপাশি এলাকার লোকজন অন্যত্র চলে যাচ্ছে।

পাঁচ বাংলাদেশি আহত : মিয়ারমার থেকে ছোড়া গুলিতে কক্সবাজারের উখিয়ায় চারজন এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে একজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। উখিয়ার পালংখালী ও থাইংখালীর এলাকায় চার বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ হন। গতকাল সকাল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বিভিন্ন সময় তারা গুলিবিদ্ধ হন। আহতরা হলেন পালংখালী ইউনিয়নের নলবুনিয়া এলাকার আয়ুবুল ইসলাম, রহমতের বিল এলাকার আনোয়ার হোসেন, পুঁটিবুনিয়া এলাকার মোবারক হোসেন ও মো. কালা। পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী জানান, এ চারজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। তাদের মধ্যে আনোয়ার হোসেন ও মোবারকের অবস্থা গুরুতর। এখনো গুলিবর্ষণের শব্দ শোনা যাচ্ছে।

স্থানীয়রা বলেন, দিনে একটু স্বস্তিতে থাকলেও সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মিয়ানমারের ছোড়া মর্টারশেল ও গুলির শব্দে মনে হয় যেন মাটি দেবে যাচ্ছে। এই আতঙ্কে এলাকার মানুষের চোখে ঘুম নেই।

স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু কোনারপাড়া এলাকায় গতকাল বিকালে এ গ্রামের বাসিন্দা সৈয়দ আহমদ (৪০) গুলিবিদ্ধ হন। তার মাথায় গুলি লেগেছে। তাকে উপজেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে । এছাড়া উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তের জলপাইতলী, বাজার পাড়ার এলাকার মানুষ এখনো আতঙ্কে এলাকা ছেড়েছে। এলাকার বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জনমানবহীন হয়ে পড়েছে। মিয়ানমারের ঢেঁকিবুনিয়া সীমান্ত চৌকি ঘিরে সারারাত গোলাগুলি ও মর্টারশেল নিক্ষেপে কেঁপে উঠেছে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকার আটটি গ্রাম।

এ দিকে, মিয়ানমার সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ তার দপ্তরে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, পালিয়ে আসা বিজিপি সদস্যসহ অন্যদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। মিয়ানমারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তারা তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন। তাদের সীমান্তরক্ষীদেরও ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সোমবার জাতীয় সংসদে বলেছেন, মিয়ানমার সীমান্তের পরিস্থিতি খুবই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে সীমান্তে সশস্ত্র বাহিনীকে ধৈর্য ধরতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজারের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মিজানুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে তীব্র সংঘর্ষের মধ্যে সেখানে চাকমা সম্প্রদায়ের প্রায় চারশ এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কিছু লোক জড়ো হয়েছে। এ অবস্থায় ওই চাকমা-রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জান্তার দুটি ঘাঁটির দখলে আরাকান আর্মি : রাখাইনের ম্রাউক ইউ ও কিয়াকতাও শহরে জান্তা বাহিনীর আরও দুটি ব্যাটালিয়নের সদর দপ্তর দখলে নেওয়ার দাবি করেছে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ)। গতকাল মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম দি ইরাবতির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাখাইনের ঐতিহাসিক ম্রাউক ইউ শহরে কয়েক দিনের তীব্র সংঘর্ষের পর সোমবার সকালের দিকে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর লাইট ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়ন (এলআইবি)-৩৭৮’র সদর দপ্তরের দখল নিয়েছে আরাকান আর্মির যোদ্ধারা। এর আগে, গত মঙ্গলবার ম্রাউক ইউ শহরে জান্তা বাহিনীর এলআইবি-৫৪০ এর সদর দপ্তরের দখল এবং এলআইবি-৩৭৭ ঘাঁটিতে হামলা চালায় আরাকান আর্মি।

 

 

ট্যাগ: