অর্থ ও বাণিজ্য

শিল্প ও অবকাঠামো উন্নয়ন: পুঁজির জোগান বাড়াতে মূলধন বাজার

নিউজ ডেস্ক১০ জুন ২০১৯৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

শিল্প ও অবকাঠামো স্থাপনে কম সুদে পুঁজির জোগান বাড়াতে শক্তিশালী মূলধন বাজার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এখান থেকে উদ্যোক্তারা সহজ শর্তে বিভিন্ন বন্ড ছেড়ে পুঁজি তুলতে পারবেন।

এসব বন্ড মূলধন বাজারে যে কোনো সময় বেচাকেনা করা যাবে। এ বাজার থেকে পুঁজি তুলতে দেশের খ্যাতিমান কোম্পানিগুলোর অগ্রাধিকার থাকবে। কোম্পানি পর্যায়ে সুদের হার হবে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ। বন্ডগুলো অভিহিত মূল্যের কম বা বেশি দরে মূলধন বাজারে বিক্রি করা যাবে। দেশে প্রচলিত বন্ড বা শেয়ারবাজারের বিকল্প হিসেবে এ মূলধন বাজার গড়ে তোলা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) একটি গ্রুপ কাজ করছে। ইতিমধ্যে তারা বিভিন্ন দেশের মূলধন বাজারের গঠন ও কার্যক্রম সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করেছে।

সেগুলোর আলোকে বাংলাদেশেও একটি মূলধন বাজার কাঠামো গড়ে তোলার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসও এ বিষয়ে সহায়তা করছে। এর আগে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী মূলধন বাজার গড়ে তোলার সুপারিশ করেছিল। কার্যকর মূলধন বাজার গড়ে তুলতে চলতি অর্থবছরের বাজেটে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু অর্থবছরের শুরুতে এ সংক্রান্ত কাজ খুব একটা এগোয়নি। তবে এখন বেশ অগ্রগতি হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, শিল্প খাতে পুঁজির জোগান বাড়াতে বিভিন্ন দেশে একাধিক উৎস রয়েছে। আমাদের এখানে ব্যাংক ছাড়া অন্য কোনো উৎস নেই। মূলধন বাজার গড়ে তোলা হলে এটি দেশের শিল্পায়নে বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। কিন্তু এটি পরিচালনার ক্ষেত্রে কঠোর হতে হবে। অন্যথায় ব্যাংক বা শেয়ারবাজারের মতো শিথিলতা থাকলে এটিও কোনো কাজে আসবে না। বরং আর্থিক খাতের আরও একটি ক্ষতের সৃষ্টি হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, মুদ্রাবাজারে বহুমুখী অর্থের প্রবাহ ও প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করতে এ বাজার বড় ভূমিকা রাখতে পারবে। এতে অর্থের প্রবাহ বাজারমুখী হবে। আটকে থাকার প্রবণতা কমবে। ফলে টাকার চলাচল বাড়বে। এতে লেনদেন বেড়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে।

সূত্র জানায়, বড় শিল্প বা অবকাঠামা নির্মাণের জন্য মোটা অংকের পুঁজি জোগানের জন্য দেশে ব্যাংক ছাড়া বিকল্প কোনো উৎস নেই। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা খুবই দুর্বল। তারা বড় অংকের কোনো বিনিয়োগ করতে পারছে না। সে সক্ষমতাও তাদের নেই। শেয়ারবাজার অনিয়মের বেড়াজালে রুগ্ন হয়ে পড়েছে। এখান থেকেও বড় অংকের পুঁজি তোলার সুযোগ নেই। সমবায়ী ও ক্ষুদ্রঋণের প্রতিষ্ঠানগুলোতে বড় অংকের পুঁজির জোগানে সক্ষমতা নেই। দেশের বন্ড মার্কেটও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারছে না। নানা উদ্যোগের পরও মিলছে না কোনো সুফল। ফলে বড় অংকের ঋণের জন্য সরকার বা উদ্যোক্তারা এখন ব্যাংকমুখী। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো বড় ঋণের জোগান দিতে পারে না। মোটা অংকের ঋণ হলেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর দ্বারস্থ হতে হয়।

এতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে। বর্তমানে তারল্য সংকটের কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও বড় অংকের ঋণ দিতে পারছে না। এতে দেশের শিল্পায়নের বিকাশ ও অবকাঠামো নির্মাণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

অর্থায়নের নিয়ম অনুযায়ী বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেবে। আর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো চলতি মূলধনের জোগান দেবে। শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিতে দুটি বিশেষায়িত ব্যাংক ছিল। বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক ও বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থা। এ দুটিকে এক করে গঠন করা হয়েছে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়ন করতে রয়েছে বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। তহবিল সংকটের কারণে তারাও এসব খাতে দীর্ঘমেয়াদি বড় অংকের ঋণ দিতে পারছে না। এসব কারণেই এখন মূলধন বাজারের বিষয়টি সামনে চলে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, মূলধন বাজার পরিচালিত হবে একটি আইনের আওতায়। এতে কিভাবে বাজার থেকে পুঁজি নেয়া যাবে এবং কিভাবে পরিচালিত হবে সেসব বিষয়ে বিস্তারিত বিধিবিধান থাকবে। এগুলো দেখভাল করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে থাকবে একটি নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান। উদ্যোক্তাদের পুঁজির প্রয়োজন হলে এ প্রতিষ্ঠানের কাছে আবেদন করবে। কোম্পানি কত সুদে কি পরিমাণ পুঁজি তুলতে চায় কত দিনের জন্য সেটি উল্লেখ থাকবে আবেদনে। কর্তৃপক্ষ পর্যালোচনা করে বন্ড ছাড়ার অনুমোদন দেবে। অভিহিত মূল্যের ভিত্তিতে বন্ডগুলো বিভক্ত হবে। এসব বন্ড যে কোনো ব্যক্তি, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিনতে পারবে। বন্ডে বিনিয়োগকারীদের অর্থের প্রয়োজন হলে সেগুলো সেকেন্ডারি মার্কেটে বিক্রি করে টাকা তুলে নিতে পারবে। বছর শেষে কোম্পানিকে নির্ধারিত হারে মুনাফা দিতে হবে। মুনাফার হার হবে বাজারভিত্তিক। ভালো কোম্পানি কম মুনাফা দিয়ে পুঁজি নিতে পারবে।

দেশে প্রচলিত শেয়ারবাজারের সঙ্গে এর পার্থক্য হবে, শেয়ারবাজার থেকে পুঁজি নেয়া সময় সাপেক্ষ। এতে অর্থের খরচও বেশি। বছর শেষে কোম্পানি মুনাফা দিতেও পারে আবার নাও দিতে পারে। এতে ঝুঁকির মাত্রা বেশি। কিন্তু মূলধন বাজার থেকে দ্রুত ও কম খরচে পুঁজি নেয়া যাবে। বছর শেষে নির্ধারিত হারে মুনাফা দিতে হবে। এতে ঝুঁকির মাত্রা কম হবে। কেননা খ্যাতিমান ও সম্ভাবনাময় ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানি এ বাজার থেকে পুঁজি নিতে পারবে না। আর মুনাফার হার নির্ধারিত বলে সেকেন্ডারি মার্কেটে বন্ডের দাম বেশি হারে উঠানামার সুযোগ থাকবে না।

বর্তমানে যে বন্ড মার্কেট রয়েছে এতে বিনিয়োগ করার পদ্ধতি বেশ জটিল। একই সঙ্গে মুনাফা ও কর কাঠামোও জটিল। যে কারণে এর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ নেই।

সূত্র জানায়- আমেরিকা, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মূলধন বাজারে নানা ধরনের উপকরণ রয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বন্ড, ট্রেজারি নোট, জিরো কুপন বন্ড, প্রিমিয়াম বন্ড, ইনভেস্টমেন্ট বন্ড, কারেন্সি বন্ডসহ নানা উপকরণ। এগুলোর বেশির ভাগই বিভিন্ন কোম্পানির নামে ইস্যু করা। আবার কর্পোরেট কোম্পানিগুলোও এতে বিনিয়োগ করে। পাশাপাশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও বিনিয়োগ করে। বাংলাদেশেও এভাবে চিন্তা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে ব্যক্তি পর্যায়ে অনেকের হাতেই বিনিয়োগ যোগ্য অর্থ রয়েছে, কিন্তু বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত। ফলে সেগুলো অলস পড়ে আছে। বিভিন্ন কর্পোরেট কোম্পানির হাতেও প্রচুর অর্থ থাকে। যেগুলো ব্যাংকে রয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো মুনাফা পায় না বললেই চলে। এ প্রক্রিয়ায় এসব অর্থও মূলবাজারে নেয়া সম্ভব হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতেও অনেক আমানত থাকে। সেগুলো ব্যাংকে কম মুনাফায় বিনিয়োগ করা হয়। এগুলো তখন বেশি মুনাফায় মূলধন বাজারে আনা সম্ভব হবে।