নিজস্ব প্রতিবেদক:
স্থানীয় এমপির আশ্রয়-পশ্রয়ে বেপরোয়া হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সৈয়দ ইরতিজা আহসানের বিরুদ্ধে। বিভিন্ন প্রকল্প থেকে বাণিজ্য, অনিয়ম-দুর্নীতি, পুকুর নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারসহ নানা অভিযোগ রয়েছে এ ইউএনও’র বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রায় বছর খানেক আগে শিবগঞ্জের ইউএনও পদন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হয়েছেন। এরপর তাঁকে সবমিলিয়ে চারবার বদলি করা হয়েছে। কিন্তু সব বদলির আদেশ তিনি অগ্রাহ্য করে ইউএনও হয়েই এখনো বহাল তবিয়তে আছেন শিবগঞ্জে।
এছাড়াও রাজশাহী পুঠিয়াসহ আরো কয়েকজন ইউএনও’র বিরুদ্ধে নানা অপকর্মের অভিযোগ তুলে স্থানীয় জনসাধারণ বিভাগীয় কমিশনারসহ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোাগও করেছেন। কিন্তু কাজের কাজ এখনো কিছু হয়নি। কাউকে কাউকে ডেকে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে ভর্ৎসনা করা হয়েছে। কিন্তু এখনো তাঁরা রয়ে গেছেন বহাল তবিয়তে। আর এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে চরম ক্ষোভ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সবেচেয়ে বেশি অভিযোগ রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার ইউএনও সৈয়দ ইরিতিজা আহসানের বিরুদ্দে। ইউএনও থেকে পদন্নতি পাওয়ার পরে এরইে মধ্যে তাঁর অন্তত ৪ বার বদলির আদেশ হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে। কিন্তু প্রতিবারই তিনি নিজেরে এবং স্থানীয় এমপি গোলাম রাব্বানীর ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে টিকে গেছেন শিবগঞ্জেই।
গত ১৮ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচবি রেদোয়ান আহমেদ স্বাক্ষরিত এক বদলি আদেশের চিঠিতে গত ২১ জুলাইয়ের মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করতে বলা হয় সৈয়দ ইরতিজা আহসানকে। ওইদিনের মধ্যে তিনি যোগদান করতে ব্যর্থ হলে ওইদিন বিকেল থেকেই তিনি তাৎক্ষণিক অবমুক্ত হবেন বলেও গণ্য হবেন।
অভিযোগ উঠেছে, সরকারি এই আদেশ লঙ্ঘন করে স্থানীয় এমপি গোলাম রাব্বানীর আশ্রয়-পশ্রয়ে এখনো শিবগঞ্জ উপজেলার ইউএনও হিসিবে স্বপদে বহাল রয়েছেন। এই ইউএনও’র বিরুদ্ধে স্থানীয় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অনিয়ম-দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ তুলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার এবং স্থানীয় জেলা প্রশাসকের নিকট একাধিক অভিযোগও করেছেন। এছাড়াও বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের বিপক্ষে এমপি গোলাম রাব্বানীর প্ররোচণায় ফলাফল জালিয়াতি করেছে বলেও অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
স্থানীয় উজিরপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপদি দুরুল হুদা অভিযোগ করে বলেন, ‘এমপির আশ্রয়ে থেকে ইউনও সৈয়দ ইরতিজা আহসান ইচ্ছেমতো অফিসে আসেন। তিনি ঘুম থেকে উঠেন দুপরে। এরপর ইচ্ছে হলে অফিস করেন, না হলে করেন না। ফরে তাঁর কাছে নানা বিষয়ে কাজে-কমকাণ্ডে গিয়েও সাধারণ মানুষকে হয়রানির শিকার হতে হয়। আবার বিগত নির্বাচনে এমপি রাব্বানীর কথা শুনে ইউএনও নির্বাচনে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিপক্ষে হয়ে কাজ করিয়েছেন। কোনো প্রার্থীর বিপক্ষে ফলাফলও জালিয়াতি করেছেন ইউএনও।’
অভিযোগ উঠেছে, ওই বদলির পরে তাঁকে সর্বশেষ গত ২৯ আগস্ট সিরাজগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে বদলি করা হয়। এছাড়াও গত বছরের ৯ নভেম্বর ইউএনও থেকে পদন্নতি দিয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে সৈয়দ ইরতিজা আহসানকে রাজবাড়ি জেলায় বদলি করা হয়। কিন্তু সেটিও তিনি কানে না তুলে শিবগঞ্জেই থেকে যান।
সর্বশেষ গত বুধবার বিভিন্ন বরাদ্দের চেক প্রদান অনুষ্ঠানে এমপি গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে দেখা যায় ইউএনওকে।
ইউএনও সৈয়দ ইরতিজা আহসানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভিযোগ তো উঠতেই পারে। তাহলে কি সবই সত্য? এগুলোর কোনো ভিত্তি নাই।’
ইউএনও’র সঙ্গে এমপি রাব্বানীর ঘোনিষ্টতা নিয়ে গতকাল এমপি রাব্বানীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ নুরুজ্জামানের বিরুদ্ধে গত ১৩ জুলাই নানা অনিয়ম-দুর্নীতির প্রকাশ হলে পত্রিকা বিক্রিতা উৎপল নামের এক হকারকে পিটিয়ে থানায় দেওয়া হয়। পরে রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী আশরাফ উদ্দিনের হস্তক্ষেপে ইউএনও উৎপলকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়।
ওইদিন জেলা প্রশাসক নিজে ইএনওকে তাঁর কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে ভর্ৎসনাও করেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। ইউএনও নুরুজ্জামানের এমন কাণ্ডের পর গোটা উপজেলা জুড়েই সাধারণ মানুষের মাঝে এখনো ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। ইউএনও’র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগও করা হয়েছে।
এদিকে পুঠিয়ার কয়েকজন বাসীন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যত অবৈধ কারবারি রয়েছেন, তাদের সঙ্গে ইউএনও’র সখ্যতা চরমে। তাদের সঙ্গে নিয়ে ইউএনও নুরুজ্জামান দাপট দেখিয়ে বেড়ান এলাকায়। নিয়মিত অফিস না করে তিনি গাড়ীর সাইরেন বাজিয়ে এলাকায় ঘুরে বেড়ান।
উপজেলার খাস পুকুর লিজ দেওয়া, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে জোর করে কমিশন আদায় করাসহ নানা অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিুরদ্ধে। ইউএনও’র দাপটের অতিষ্ঠ হয়ে সম্প্রতি দুজন সরকারি কর্মকর্তা পুঠিয়া থেকে বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যান। বদলির সময় তারা উর্দ্ধত কর্তৃপক্ষকে ইউএনও’র বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে পুঠিয়ায় চাকরি করা সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেন। এছাড়াও উপজেলা খাদ্য অধিদপ্তরের আরো এক কর্মকর্তা একই অভিযোগ তুলে এরই মধ্যে বদলির জন্য নানাভাবে তদবির করছেন।
ওই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যে কোনো প্রকল্প এলেই ইউএনও আগে-ভাগেই কমিশন চেয়ে বসে থাকেন। আবার কমিশন না দিলে তিনি কোনো ফাইলে স্বাক্ষর করতে চান না।’
উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘ইউএনওকে টাকা না দেওয়ায় তিনি কৃষকদের সারের ভুর্তুকির প্রায় ১০ লাখ টাকার চেক আটকে দেন। টাকা না নিয়ে তিনি ওই চেক ছাড়তে করতেও রাজি হচ্ছিলেন না। শেষে বিষয়টি স্থানীয় এমপি কাজী আব্দুল ওয়াদুদ দারা পর্যন্ত গোড়ালে তাঁর হস্তক্ষেপে ইউএনও পরে চেক ছাড় করতে রাজি হন। তবে এখনো চেক না পাওয়ায় কৃষকদের মাছে ওই টাকা বিতরণ করা যায়নি বলেও সূত্রটি নিশ্চিত করেছে।
এসব নিয়ে জানতে চাইলে ইউএনও নুরুজ্জামান বলেন, ‘এখানকার একটি পক্ষ আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করেছে। তবে আমি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নয়। এসবের কেউ কোনো প্রমাণও দিতে পারবে না।’
এদিকে দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তারুন নাহারের বিরুদ্ধেও রয়েছে নানা অভিযোগ। চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি ফুটপাতে মুচির দোকান থেকে শুরু, নাপিত, কাপড়ের দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে ব্যাপক বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে উপজেলা সদরের ব্যবসায়ীরা ইউএনও আক্তারুন নাহার ও সহকারী কমিশনারের (ভূমি) রাজিবুল ইসলাম খানের অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেন। উত্তেজিত ব্যবসায়ীরা ইউএনও’র কার্যালয় লক্ষ্য করে ইটপাটকেলও ছুড়েন। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ অভিযোগ করে বলেন, ‘দুর্গাপুরের ইউএনও’র বিরুদ্ধে পুকুর খননের নামে ব্যাপক অভিযোগ করেছেন স্থানীয় লোকজন। বিষয়টি নিয়ে আমরাও প্রশাসনের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছি। কিন্তু তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’
তবে ইউএনও আক্তারুন নাহারের ফোনে গতকাল কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।’ সূত্র, আরো জানায়, এই তিন ইউএনও ছাড়াও আরো কয়েজকজন ইউএনও’র বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তাদের বিরুদ্ধেও জেলা প্রশাসক ও রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ এসেছে স্থানীয় জনগণের পক্ষ থেকে। কিন্তু এখনো বহাল তবিয়তে আছন অভিযুক্ত ইউএনওরা।
এসব বিষয়ে নিয়ে যোগাযোগ করা হলে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল হান্নান বলেন, কিছু কিছু ইউএনও’র বিরুদ্ধে আমাদের কাছেও অভিযোগ আসছে। সেগুলোর অভ্যান্তরীন তদন্তও হচ্ছে। তদন্ত শেষে কারো কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। কাউকে কাউকে বদলিও করা হচ্ছে।’
আরেক প্রশ্নের জবাবে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, ‘এখনো অভিযোগ আসছে, সেগুলো আমরা গোপনে তদন্ত করছি। অভিযোগ পেলে অন্যদের বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তথ্য:সূত্র কালের কণ্ঠ









