জাতীয়

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কতটা সহায়ক হবে আরাকান আর্মি

নিউজ ডেস্ক৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটি নিউজ ডেস্ক

প্রতিবেশীর সঙ্গে শীতল সম্পর্কের ফল হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে মিয়ানমারের জান্তা সরকার। রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির সঙ্গে চলমান সংঘাতে অনেকটাই নাস্তানাবুদ হয়ে পড়েছে জান্তার অনুগত সেনাবাহিনী ও সীমান্ত রক্ষী বাহিনী। যুদ্ধের ময়দান থেকে তারা অনেকেই পিছু হটছে। শুধু তাই নয়, এসব বাহিনীর যেসব সদস্য এতদিন বাংলাদেশের দিকে প্রাণঘাতী অস্ত্র তাক করে রাখতেন, তারাই এখন প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছেন আশ্রয়ের আশায়; রাখাইন থেকে তাড়িয়ে দেওয়া রোহিঙ্গাদের পাশে আশ্রয় পেতে যাচ্ছেন অনুপ্রবেশকারীরা।

প্রশ্ন হলো, আরাকান আর্মির (এএ) হাতে রাখাইন প্রদেশের কর্তৃত্ব চলে গেলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে তা কতটুকু সহায়ক হবে কিংবা আদৌ সহায়ক হবে কি? বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাখাইনের নেতৃত্ব যার হাতেই আসুক, শক্তিশালী কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ছাড়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অসম্ভব।

মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক কনস্যুলেট প্রধান মেজর (অব) এমদাদুল ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেতৃত্ব শুরু থেকেই বিভ্রান্ত। এখনো তারা বিভ্রান্তিতে আছে। আরাকান আর্মি রাখাইনের কর্তৃত্ব হাতে পেলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আরও জটিল হয়ে যাবে। কারণ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নীতিগতভাবে চায় না আরাকান আর্মি। তিনি আরও বলেন, আরাকান আর্মি তো রাখাইন রাজ্যের স্বাধীনতাও চায় না। কিন্তু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা আছে। সেই ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ রাজ থেকে বিভিন্ন গোষ্ঠী তাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়ে এসেছে, যা আরাকান আর্মির দর্শনের সঙ্গে যায় না।

মেজর (অব) এমদাদুল ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে এ মুহূর্তে বাংলাদেশের কূটনীতির বাইরে অন্য কোনো কৌশল নেওয়ারও সুযোগ নেই।

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা সে দেশের বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) সদস্যরা বলছেন, জান্তার অনুগত সেনাবাহিনী সংঘর্ষে পরাজিত হওয়ার পর আরাকান আর্মির (এএ) হাতে জান্তা বাহিনীর যারাই ধরা পড়ছেন, তারা খুন হচ্ছেন। তাই নিরাপদ ভেবে তারা প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। অবশ্য সীমান্ত পার হয়ে আসার পথে তাদের অনেককেই অস্ত্র খোয়াতে হচ্ছে। সে অস্ত্র কেড়ে নিচ্ছেন আরাকান সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) সদস্যরা। তারা ওই অস্ত্র দিয়ে আরাকান আর্মির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে লড়ছেন। আরএসওর এই ভূমিকার মুখে মিয়ানমার সরকারের পক্ষে থাকা রোহিঙ্গা অপর সশস্ত্র সংগঠন আরসা কিছুটা কোণঠাসা অবস্থায় পড়েছে। জানা গেছে, চারটি সীমান্ত চৌকির মধ্যে তিনটিই আরাকান আর্মির কব্জায় গেছে আরএসওর সহযোগিতার কারণে।

আরএসও বরাবরই রাখাইন রাজ্যে (সাবেক আরাকান) রোহিঙ্গাদের বসবাসের পক্ষে। রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকারসহ সব রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে। এজন্য গত ৮০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তারা সংগ্রাম চালিয়ে গেলেও নেতৃত্বের অভাবে তা সফল হয়নি।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে বসবাসকারী জনগণ আরএসওর প্রতি বরাবরই সহানুভূতিশীল। গত শতকের আশির দশকে আরএসও স্বাধীন আরাকান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য বর্মি সরকারের বিরুদ্ধে কঠিন লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু লড়াই শেষ হবার আগেই সংগঠনটিতে বিভক্তি দেখা দেয়। শুধু তাই নয়, মূল লক্ষ্য থেকে চ্যুত হয়ে তারা হয়ে যায় বেনিয়া; বর্মি সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইয়ের পরিবর্তে বাংলাদেশের সন্ত্রাসীদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করতে শুরু করে। একসময় আরএসওর অস্ত্র বাংলাদেশের সর্বহারাদের হাতেও চলে যায়, পৌঁছে যায় কুষ্টিয়া পর্যন্ত। এ কারণে বাংলাদেশ সরকারও রুষ্ট আরএসওর ওপর। বিএনপি সরকারের সর্বশেষ মেয়াদে র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল (অব) হাসিনুর রহমানের নেতৃত্বে র‌্যাব সদস্যরা নাইক্ষ্যংছড়ির বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমানা থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করে।

সেসময় সরকারের পূর্বমূখী কূটনীতি বাস্তবায়নের পথে মিয়ানমারের ওই অনুরোধ রক্ষা ও মিয়ানমারকে বিশ্বাস করার খেসারত এখন বাংলাদেশকে দিতে হচ্ছে। কারণ আরএসও অস্ত্রশূন্য নিশ্চিত জেনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশকে বাংলাদেশে জোরপূর্বক ঠেলে দেয় জান্তা সরকার। সে সঙ্গে আরসা সৃষ্টি করে দেশে ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের শায়েস্তা করতে লাগিয়ে দেয়। আরসা নেতা আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনিনি ২০১৭ সাল থেকে বারবার সীমানা পার হয়ে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এসেছেন, আবার নিজের কাজ শেষে নিরাপদে ফিরে গেছেন রাখাইনে।

রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে ‘রাজাকার’-এর পরিচিতি পাওয়া আরসার খারাপ সময় যাচ্ছে। রাখাইনে প্রত্যাবাসনে নেতৃৃত্ব দেওয়া রোহিঙ্গা নেতা মুহিব্বুল্লাহকে খুন করার পর এ ঘটনায় জড়িত আরসার একাধিক সদস্য বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। এর মধ্যে উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে আরএসওর শক্তি কিছুটা বেড়েছে।

তবে এসব সংগঠনের কার্যক্রমের ওপর ভরসা করতে একেবারেই নারাজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রাহমান নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, রাখাইন রাজ্যের কর্তৃত্ব শেষ পর্যন্ত আরাকান আর্মির হাতে থাকবে সে নিশ্চয়তা কোথায়? আর থাকলেও তাতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর লাভ নেই। আরাকান আর্মি এবং মিয়ানমারের মূল জনগোষ্ঠী বামাররা মিলে একসঙ্গে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়েছে। তিনি বলেন, মিয়ানমারের এই সংঘাতের সুযোগে দূরের কোনো শক্তি সক্রিয় হবার আগেই বাংলাদেশের উচিত চীন ও ভারতকে সেখানে সক্রিয় করা। তিনি মনে করেন, মিয়ানমারের এই সংকটকালীন পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য ত্রিশংকু পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

 

 

ট্যাগ: