অর্থ ও বাণিজ্য

রাজস্ব আয় বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ: ড. মির্জ্জা আজিজ

নিউজ ডেস্ক২১ মে ২০১৯৬ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

এবারের বাজেটে কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে?

মির্জ্জা আজিজ : যে কোনো দেশেরই সরকারের ব্যয়ের বড় অংশই মেটানো হয় রাজস্ব আয়ের মাধ্যমে। কিন্তু বাংলাদেশে সরকার যে রাজস্ব আহরণ করে, তা পৃথিবীর ন্যূনতম আয়ের দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশের চেয়ে নেপালের মাথাপিছু আয় অনেক কম। কিন্তু মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে দেশটির কর আদায় বাংলাদেশের দ্বিগুণেরও বেশি। অর্থাৎ কম আয় সত্যেও বেশি কর আদায় হচ্ছে। বাংলাদেশে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত এনবিআরের রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৭ শতাংশ। এর মানে হল আগামী বাজেটে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো। এছাড়া বাজেটের চ্যালেঞ্জগুলো সব সময় প্রায় কাছাকাছি। এবারও স্বতন্ত্র কোনো চ্যালেঞ্জ নেই।

বাজেটে সরকারের দুর্বল দিক কী?

মির্জ্জা আজিজ : দুর্বলতাগুলোর মধ্যে অন্যতম হল বাস্তবায়ন। প্রতি বছরই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা, সংশোধিত বাজেটে তা কমানো হয়। আর বাস্তবায়ন হয়, তার চেয়েও কম। অন্যদিকে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর গুণগতমান খুবই নিম্ন। রাস্তা নির্মাণের পর ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে তা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্প নির্বাচন, পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেয়া, যথা সময়ে বাস্তবায়ন এবং গুণগতমান নিশ্চিত করতে হবে। এটা বাজেটের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ। কিছু বরাদ্দ দেয়া অপ্রয়োজনীয়।

এটি মধ্য বা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে খুব বেশি ভূমিকা নেই। এরপরও বিভিন্ন কারণে বরাদ্দ দেয়া হয়। এটি যৌক্তিক নয়। মূল বিষয় হচ্ছে, উন্নয়নে আরও গতি আনতে হবে। এক্ষেত্রে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হল বিনিয়োগ। বেসরকারি বিনিয়োগ অত্যন্ত হতাশাজনক। দেশের অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে এ বিনিয়োগ কমছে। এক্ষেত্রে বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়া হলেও তার খুব একটা বেশি সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। দেশের অর্থনীতিতে মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়েতে প্রতিদিনই বিশাল যানজট লেগে থাকে।

এরপর বন্দরের সমস্যা দীর্ঘদিনের। এক্ষেত্রে কিছু সমস্যা বন্দরের অবকাঠামোতে। বাকিটা কাস্টমসের জটিলতা। ফলে পণ্য আসার পর খালাস করতে অনেক সময় লাগে। একই সমস্যা অন্যান্য পরিবহনে। এছাড়া গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যা তো রয়েছেই। বিদেশ থেকে এলএনজি (তরল প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করা হলেও তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এছাড়াও আরেক সমস্যা হল দক্ষ মানবসম্পদের অভাব। সবকিছু মিলে এসব প্রতিবন্ধকতা কোনোভাবেই বিনিয়োগের জন্য সহায়ক নয়।

আর বিনিয়োগ বাড়াতে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিতে হবে। পাশাপাশি বাজেটটি স্বচ্ছ, বস্তুনিষ্ঠ এবং বাস্তবায়নযোগ্য হতে হবে। একটি বিষয় লক্ষণীয়, গত কয়েক বছর পর্যন্ত বাজেট বাস্তবায়নের হার অব্যাহতভাবে কমছে। আর এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য এবারের বাজেটে পরিষ্কার দিকনির্দেশনা থাকা উচিত।

অন্যদিকে সরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে যে সময় সীমা বেঁধে দেয়া হয়, তার চেয়ে দ্বিগুণ, তিনগুণ সময় বেশি লাগে। এতে খরচও বাড়ে।

বাজেটে কোন খাতে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত?

মির্জ্জা আজিজ : প্রথমত অবকাঠামো। এরপর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া উচিত। কারণ বর্তমানে আমরা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এর মানে হল দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি। কিন্তু মানুষগুলোকে উৎপাদনশীল খাতে নিয়ে আসার জন্য যে ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণ দরকার, সেখানে দুর্বলতা আছে।

ফলে সাধারণ শিক্ষার প্রসার হলেও শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্বিন্যাস করে কিভাবে কর্মমুখী করা যায়, সে ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও প্রতিষেধক চিকিৎসায় অনেক দুর্বলতা রয়েছে। স্বাস্থ্যের জন্য ব্যয় করতে না পেরে বড় একটি শ্রেণী দারিদ্র্য সীমার নিচে চলে যাচ্ছে। ফলে এ খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে আপনার সুপারিশ কী?

মির্জ্জা আজিজ : সরকার রাজস্ব আয় বাড়াতে হলে ভৌগোলিক সম্প্রসারণে যেতে হবে। বর্তমানে করমুক্ত আয় সীমা ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু গ্রামে বেশ কিছু মানুষ এ সীমার বেশি আয় করেন। ফলে তাদের করের আওতায় আনতে হবে। ভ্যাটের ক্ষেত্রেও এখনও রেজিস্ট্রেশনে সমস্যা রয়েছে। ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্ট্রার (ইসিআর) নেই। আবার ইসিআর থাকলেও এন্ট্রি করে না। এ সমস্যা কিভাবে দূর করা যায়, বাজেটে তার দিকনির্দেশনা থাকতে হবে।

এভাবে করের হার না বাড়িয়ে রাজস্ব আহরণ কিভাবে বাড়ানো যায়, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। আরেকটি বিষয় বাজেটে কখনোই জোরালোভাবে দেখানো হয় না। যা হল রাষ্ট্রীয় শিল্প সংস্থা। এসব সংস্থাগুলোর লোকসান অব্যাহতভাবে বাড়ছে। এসব সংস্থাকে কিভাবে লাভজনক করা যায় সে বিষয়ে বাজেটে দিকনির্দেশনা থাকা উচিত।

চলতি অর্থবছরে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলছে সরকার। প্রবৃদ্ধির এ অংক নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ। এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?

মির্জ্জা আজিজ : জিডিপির প্রবৃদ্ধির ব্যাপারে আমার বক্তব্য পরিষ্কার। প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক। কারণ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকেও ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্জন। কিন্তু সরকার ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলছে। এটা প্রশ্নবিদ্ধ। এর প্রথম যুক্তি জিডিপি বাড়লে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির কথা। কিন্তু রাজস্ব বাড়েনি। দ্বিতীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সেটিও বাড়েনি।

ঘাটতি অর্থায়নের ব্যাপারে আপনার সুপারিশ কী

মির্জ্জা আজিজ : গত কয়েক বছরে ঘাটতি অর্থায়নের জন্য সঞ্চয়পত্রের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়েছে। বাজেটে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ঋণ নেয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, বাস্তবে তার দ্বিগুণেরও বেশি ঋণ নেয়া হয়। এটি যৌক্তিক নয়। কারণ এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এর সুদের হার অত্যন্ত বেশি। এ কারণে প্রতি বছরই বাজেটে সুদ পরিশোধে ব্যয় বাড়ছে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচনসহ সামাজিক বৈষম্য কমানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেয়া সম্ভব হয় না।

দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?

মির্জ্জা আজিজ : সামষ্টিক অর্থনীতিতে ব্যবস্থাপনা মোটামুটি সন্তোষজনক। সাম্প্রতিক সময়ে রফতানি বেড়েছে। এর একটি কারণ হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের ফলে চীনে রফতানি বেড়েছে। রেমিটেন্সের প্রবৃদ্ধি ভালো নয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বড় একটি ইস্যু সামনে এসেছে। তা হল দেশ থেকে টাকা পাচার। এটি বন্ধ করতে বাজেটে কি ধরনের পদক্ষেপ থাকা উচিত।

মির্জ্জা আজিজ : গত কয়েক বছর পর্যন্ত অর্থ পাচারের বিষয়টি সামনে চলে আসছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্টেও বাংলাদেশ থেকে বড় অংকের অর্থ পাচারের কথা বলা হচ্ছে। যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এক্ষেত্রে বাজেটে কিছুটা দিকনির্দেশনা থাকতে পারে। বিশেষ করে পাচার রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর উপায় কী ?

মির্জ্জা আজিজ : ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ। এর বড় কারণ হল ব্যাংকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হচ্ছে। আর্থিক সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা উপেক্ষা করে রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ দেয়া হয়। আবার ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক বিবেচনায় নমনীয়তা দেখানো হয়। এর কুফল হিসেবে সুদের হার বাড়ছে।

ব্যাংকের ওপর জনসাধারণের আস্থা কমে যাচ্ছে। এছাড়াও ব্যাংকে ও সঞ্চয়পত্রের সুদের হারে পার্থক্য রয়েছে। এসব কারণে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। আর পুঁজি সংকটে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদ হার বাড়িয়েছে। কিন্তু আমানতের চেয়ে ঋণের সুদ হার অনেক বেশি বাড়িয়েছে।

এতে আমানত ও ঋণের সুদের ব্যবধান (স্প্রেড) বেড়েছে। যা শিল্পোক্তাদের জন্য সমস্যা তৈরি করছে। ব্যাংকে আরেকটি সমস্যা হল বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা। উচ্চ আদালতের স্থগিত আদেশের ফলে হাজার হাজার মামলা পড়ে আছে। এছাড়াও অর্থঋণ আদালতে পাহাড়সম মামলা জমেছে। এক্ষেত্রে সরকার একটি দিকনির্দেশনা দিতে পারে। বিশেষ করে আইন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমন্বিতভাবে বিচার পদ্ধতিতে ত্বরান্বিত করতে ভূমিকা রাখতে পারে।