নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নিবন্ধন শাখায় ঘুষ-বাণিজ্যের যেন মহোৎসব চলছে। ষষ্ঠ অষ্টম ও নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিবন্ধনের কাগজপত্র জমা দিতে গেলেই তিনটি শাখায় আলাদা করে স্কুলপ্রতি ১০০-২০০ টাকা করে ঘুষ আদায় করা হয়। টাকা না দিলে কোনো ফাইলেই হাত দেন না এ শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। বছরে সাড়ে তিন হাজার স্কুল থেকে তিন শাখা মিলে কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকার বাণিজ্য করে থাকে এই তিনটি শাখা। টাকা না দিলেই শিক্ষকদের সঙ্গে অসাদাচারণও করে থাকেন দুই শাখার প্রধান দুই কর্মকর্তা। এ নিয়ে শিক্ষা বোর্ডে সম্প্রতি একজন শিক্ষক লিখিত অভিযোগও করেছেন। কিন্তু এখনো থামেনি বাণিজ্য।
এদিকে, গতকাল রবিবার দুপুরে শিক্ষাবোর্ডের একজন কর্মকর্তাকে নবম শ্রেণির নিবন্ধনের তালিকা জমা দেয়ার সময় একজন শিক্ষকের নিকট থেকে ঘুষ গ্রহণ করে সেই টাকা পকেটে ঢুকাতে দেখা যায়। এই ধরনের একটি ভিডিও কালের কণ্ঠের হাতে এসে এসেছে। ঘুষ গ্রহণকারী ওই ব্যক্তির পরিচয়ও নিশ্চিত হওয়া যায়। তার নাম রবিউল ইসলাম। তিনি শিক্ষা বোর্ডের হিসাব শাখায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগভূক্ত কর্মচারী বলে বোর্ডের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এর আগে নিবন্ধন শাখায় এভাবে প্রকাশ্যে ঘুষ লেনেদেনের ভিডিও ভাইররাল হয়েছিল। ওইসময় ষষ্ঠ শ্রেণির নিবন্ধন শাখায় সেকশন কর্মকর্তা (সহকারী সচিব) আরিফুজ্জামানের দপ্তরে টাকা উত্তোলন করছিলেন ফেরদৌশ আল নামের এক কর্মচারী। তিনিও চুক্তি ভিত্তিক কর্মচারী।
তবে সেকশন কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান বলেন, ‘ফেরদৌস আলমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ওয়ার্ডার আছে। ঘুষের যে ভিডিওটা আছে, সেটি অনেক আগের। নতুন করে কোনো ভিডিও আছে কিনা জানা নাই, থাকলে আমি ব্যবস্থা নিব।’
সূত্র মতে, প্রতি বছরের সেপ্টম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত স্কুলগুলো থেকে জমা নেওয়া হয় শিক্ষার্থীদের নিবন্ধনের কাগজ। চলতি ডিসেম্বরে নবম শ্রেণির নিবন্ধনের তালিকা জমা নেয়া হচ্ছে। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের অধিনে প্রায় সাড়ে তিন হাজার স্কুল আছে। এসব স্কুলের প্রধান শিক্ষকরা বা অফিস সহকারীরা শিক্ষার্থীদের নিবন্ধনের কাজগপত্র জমা দিতে গেলেই বিদ্যালয়ে হিসাব শাখা ও দুটি নিবন্ধন শাখায় আলাদা করে দিতে হয় ১০০ থেকে ২০০ টাকা করে। বিশেষ করে রাজশাহী শহরের বাইরে যেসব স্কলে আছে, সেগুলো থেকে বেশি করে টাকা নেওয়া হয়। আবার জেলার বাইরের স্কুল থেকে টাকার পরিমাণ হয় আরও বেশি।
ওইসব স্কুলের শিক্ষক বা অফিস সহকারীরা ঘুষ বেশি নিলেও উচ্চ্য-বাচ্চ্য বা প্রতিবাদ করতে পারবেন না বুঝে তাদের নিকট থেকেই বেশি টাকা আদায় করা হয়। অথচ নিবন্ধনের কাগজ জমা দিতে কোনো প্রকার টাকা গ্রহণের নিয়ম নাই। স্কুল থেকে যে কাগজপত্র জমা পড়বে-সে অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের নিবন্ধনের কাজ করবে শিক্ষা বোর্ড। কিন্তু টাকা না দিলেই ওই স্কুলের নানা সমস্যা তৈরী করে নিবন্ধন শাখা। কখনো কখনো কিছু কিছু শিক্ষার্থীর নাম তালিকা থেকে বাদ দেয়। যেন পরবর্তিতে আবার আসতে হয় স্কুলের প্রধান শিক্ষককে। এভাবেই হয়রানি করা হয় বিদ্যালয়ের নিবন্ধন শাখা হতে।
শিক্ষা বোর্ড সূত্র মতে, হিসাব শাখার প্রধান হলেন আমিনুল ইসলাম। তার ইন্ধনে এ শাখায় ফাইল জমা দিতে গেলে আদায় হয় ১০০-২০০ টাকা। এখানে টাকা আদায় করেন চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী রবিউল ইসলাম। ষষ্ঠ ও অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নিবন্ধনের ফাইল জমা দিতে শাখা প্রধান (সহকারী সচিব) আরিফুজ্জামান সরকারের দপ্তরে। আর নবম শ্রেণির নিবন্ধনের দায়িত্বে রয়েছেন শাখা প্রধান (সহকারী সচিব) আনোয়ার হোসেন। তাদের দপ্তরেও দিতে হয় ১০০-২০০ টাকা করে। সবমিলিয়ে তিন দপ্তরে আলাদাভাবে টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে তারা শিক্ষকদের সঙ্গেও অসাদাচরণ করে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি এক শিক্ষকের সঙ্গে অসাদাচারণ করেন সহকারী সচিব আনোয়ার হোসেন। এরপর ওই শিক্ষক লিখিত অভিযোগ করেন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে। পরবর্তিতে আনোয়ার হোসেনকে শোকজ করে চিটি দেন শিক্ষা বোর্ডের সচিব শামীম আরা চৌধুরি। কিন্তু এর পর আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
গতকাল রবিবার শিক্ষা বোর্ডে সরেজমিন গিয়েও ঘুষের টাকা লেনদেনের বিষয়টির প্রমাণ মেলে। পাবনা থেকে আসা একজন প্রধান শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা যারা রাজশাহীর বাইরের জেলা থেকে আসি, তাদের নিকট থেকে নিবন্ধনের কাগজ জমা দেয়ার সময় তিন টেবিলে দিতে হয় একশ-দুইশ টাকা করে নেওয়া হয়। আমরা কোনো প্রতিবাদ করতে পারব না বলে আমাদের নিকট একটু বেশি টাকা নেওয়া হয়। আবার অতোদূর থেকে দ্বিতীয় বার আসাও ঝামেলা। তাই দিয়ে টাকা। টাকা না দিলেই ঝামেলা করে। দেখা যাবে দুই-একজন শিক্ষার্থীর নাম বাদ পড়েছে বা কোনো সমস্যা তৈরী করে রেখেছে। পরে আবার আসতে হয়।’
রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার একজন প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘টাকা অল্পকিছু করে নেয়। দিতে হয়। যেহেতু অল্প টাকা কিছু বলি না। আমাদের দেখলেও একটু সম্মান করে। তাই প্রতিবাদ না করে এক দেড়শ টাকা দিয়ে দেয়। কখনো কখনো ১০০ টাকাও দেয়। তবে দেয়। না দিলে তারা মন খারাপ করে।’
সিরাজগঞ্জের একজন শিক্ষক বলেন, ‘আমি তিন শাখায় একশ করে তিনশ টাকা দিছিলাম। দিতেই হয়। না দিলে হয়রানি করবে। কে যাবে একশ-দুইশ টাকার জন্য আবার হয়রানি হতে?’
শিক্ষা বোর্ডেরই একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘তিনটি শাখার ঘুষ-বাণিজ্য নিয়ে আমরাও হতাশ। একজন বাইরের ব্যক্তিকে দিয়ে ঘুষ আদায় করা হয় টেবিল-চেয়ার পেতে। এর চেয়ে লজ্জার কিছু থাকতে পারে না। এ নিয়ে নানা কিছু হয়ে গেছে। কিন্তু ঘুষ বন্ধ করা যায়নি। প্রত্যেকটি বিদ্যালয় থেকে ১০০-২০০ টাকা করে আদায় করা হলেও সাড়ে তিন হাজার স্কুল থেকে বছরে তিনটি শ্রেণি থেকে কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকার বাণিজ্য করে যাচ্ছে এই শাখা তিনটি।
জানতে চাইলে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির নিবন্ধন শাখার প্রধান আরিফুজ্জামান নবাব বলেন, ‘নিবন্ধনের জন্য কারো নিকট থেকে টাকা নেওয়া হয় না। কাউকে হয়রানিরও সুযোগ নাই। আমার টেবিলে কাউকে টাকা দিতে হয় না। অন্য কোথাও দিলে আমার কিছু করার নাই। আমার চোখে পড়লে আমি ব্যবস্থা নিব।’
জানতে চাইলে নবম শ্রেণির নিবন্ধন শাখার প্রধান আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি কোনো ঘুষ নেয় না। ঘুষ কারা নেই বলতে পারব না। আমি কারো সঙ্গে খারাপ আচরণও করিনি।’
হিসাব শাখার প্রধান আমিনুল ইসলামকে বার বার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
জানতে চাইলে শিক্ষা বোর্ডের সচিব শামীম আরা চৌধুরী বলেন, ‘একজন শিক্ষক একটি বিষয়ে অভিযোগ করেছিলেন। সেটির জবাব চাওয়া হয়েছে। তবে ঘুষ-বাণিজ্য হলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিব।’









