রাজশাহীর খবর

রাজশাহীর তাঁতী লীগ নেতা নির্বাচন পর্যবেক্ষকের তালিকায়, অফিসও নেই

নিউজ ডেস্ক১০ আগস্ট ২০২৩৪ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

নির্বাচন কমিশন পর্যবেক্ষক সংস্থা হিসেবে প্রাথমিকভাবে নিবন্ধনযোগ্য বেসরকারী সংস্থা তালিকা প্রকাশ করেছে তাতে রাজশাহীর ‘স্বাস্থ্য শিক্ষা সেবা ফাউন্ডেশন – সেফ’ নামে এক সংস্থার নাম রয়েছে। এই সেফের মালিক রুপন কুমার দত্ত। তিনি মহানগর তাঁতী লীগের চার নং সহ-সভাপতি। এর আগে ছাত্রলীগ করতেন। নির্বাচন কমিশনে যে ঠিকানা দিয়ে আবেদন করা হয়েছে সেখানে গিয়েও এই সংস্থার কার্যালয় পাওয়া যায় নি। তবে ওই ঠিকানার বাসায় রুপন কুমার দত্ত পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন। সনদ জালিয়াতির অভিযোগে একটি কলেজের প্রভাষক পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। তবে সব কিছু ছাপিয়ে রুপন এখন এলাকাতে ডাক্তার হিসেবেই বেশি পরিচিত। তিনি চেম্বার ও ফার্মেসি খুলে চিকিৎসা দেন। অবসরপ্রাপ্ত একজন সচিব এই সংস্থার উপদেষ্টা। তিনি রুপনের মামা।

জানা গেছে, দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে পর্যবেক্ষক সংস্থা হিসেবে নাম অন্তর্ভূক্তি করতে বেসরকারী সংস্থারগুলোর কাছে দরখাস্ত আহŸান করে গত ১৮ জানুয়ারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নীতিমালার ৮নং ধারায় পরিস্কার বলা আছে, ‘কোনো রাজনৈতিক দল বা এর অঙ্গসংগঠনের সাথে কোনোভাবে যুক্ত কেউ নির্বাচন পর্যবেক্ষক হতে পারবেন না’। সারাদেশ থেকে আসা আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই শেষে মঙ্গলবার প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত ৬৮টি সংস্থার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সহকারী পরিচালক আশাদুল স্বাক্ষরিত তালিকার ২৭নম্বরে আছে রাজশাহীর ‘স্বাস্থ্য শিক্ষা সেবা ফাউন্ডেশন- সেফ’ নামে একটি বেসরকারী সংস্থার নাম। ঠিকানা দেয়া হয়েছে মহানগরীর বেলদারপাড়া। বুধবার দুপুরে বেলদারপাড়ায় গিয়ে ‘স্বাস্থ্য শিক্ষা সেবা ফাউন্ডেশন- সেফ’ নামে কোনো সংস্থার কার্যালয় খুঁজে পাওয়া যায় নি। এমন কি কোনো সাইনবোর্ডও চোখে পড়ে নি।

তবে স্থানীয়রা জানান, বেলদারপাড়ায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে পরিবারসহ বাস করেন রুপন কুমার দত্ত। দুই তলার বাসায় ওই গিয়ে দেখা যায়, মালিক থাকেন ওপরে। আর নিচের তলায় একটি বিউটি পার্লারের সাইনবোর্ড সাঁটানো। ওই বাসার সামনের টি স্টলের মালিক দীপু বলেন, ‘এই বাসার নিচ তলাতে থাকেন রুপন। এনজিওর সেরকম কোনো অফিস নেই। সাইনবোর্ডও নেই। ওই পাড়ার বাসিন্দা হায়দার বলেন, ‘রুপনের এনজিওতে চাকরি করে এমন কাউকে তো দেখি না। ওরা স্বামী-স্ত্রী মিলেই কাজ করে। বাসাটাই ওদের অফিস’।

বাসায় গিয়ে পাওয়া যায় রুপনের স্ত্রী শায়লাকে। তিনি জানান, স্বামী রুপনের এনজিওতে তিনিও কাজ করেন। রেজুলেশনেও স্বাক্ষর করেন। তবে তাদের সংস্থার কার্যক্রম রাজশাহী মহানগরীর বাইরে তানোর ও মোহনপুর উপজেলায়। একারণে রাজশাহীতে তেমন অফিস নেই। তবে অফিস নেয়ার কথা চলছে।
রুপন কুমার দত্তের খোঁজ মেলে মহানগরীর উৎসব সিনেমা হলের মোড় এলাকায়। লবঙ্গ নামে একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টের নিচতলায় ফার্মেসির ভেতরের রুমে তার চেম্বার। চেম্বারে বসেই এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় রুপনের। রুপন জানান, রাজশাহী কলেজে পড়ার সময় ছাত্রলীগ করতেন। তবে কোনো পদে ছিলেন না। তবে ২০২২সালের ১১ মে রাজশাহী মহানগর তাঁতী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনুমোদন দেয়া হয়। এই কমিটির তিনি ৪নং সহ-সভাপতি। বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক নানা কর্মসুচিতেও তিনি থাকেন। এনজিওর পাশাপাশি তিনি মাদার মেডিকেয়ার নামে ফার্মেসি খুলে চিকিৎসা দিচ্ছেন। রুপনের দাবি, তিনি রাজনীতিতে খুব একটা সক্রিয় নন। বিনা ফিতে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন। তার প্রতিষ্ঠিত এনজিও সেফ এ পর্যন্ত দুটি আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার প্রকল্প থার্ডপার্টি হিসেবে বাস্তবায়ন করেছে। এনজিওটির উপদেষ্টা হিসেবে আছেন তার আত্মীয় অবসরপ্রাপ্ত একজন সচিব।

রুপন কুমার দত্ত বলেন, ‘আমি নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হিসেবে সংস্থার পক্ষ থেকে আবেদন করেছিলাম। কিন্তু এখনো কমিশন থেকে আমাকে কিছু জানানো হয় নি। এর আগেও ২০১৮সালের নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হতে আবেদন করেছিলাম। তখনও হয় নি। আসলে এ কাজে আমার তেমন আগ্রহ নেই। তবে এবার যেহেতু তালিকায় নাম আছে সেহেতু সুযোগ পেলে দায়িত্ব পালন করবো’। তিনি দাবি করেন, তার এনজিওতে শতাধিক জনবল আছে। বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবকও আছে। তারাও কাজ করেছে। সংস্থার নিজস্ব ফান্ডও আছে’।

রাজশাহীর শাহ মখদুম কলেজের অধ্যক্ষ এসএম রেজাউল করিম জানান, অনার্স কোর্স খোলার সময় রুপন কুমার দত্ত রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক পদে নিয়োগ পান। পরে জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ে যাচাইয়ের সময় তার বেসরকারী শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার (এনটিআরসিএ) সনদ জাল হিসেবে ধরা পড়ে। এ ঘটনার পর কলেজ থেকে পদত্যাগে তাকে বাধ্য করা হয়।

রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আহসানুল হক পিন্টু বলেন, ‘ছাত্রজীবনেও রুপন ছাত্রলীগ করতো। এখনো আমাদের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তবে এনজিওর লাইনেই কাজ করে সে’।

বেসরকারী সংস্থা সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন’র রাজশাহী বিভাগীয় কমিটির সভাপতি আহমদ সফিউদ্দিন  বলেন, ‘রাজশাহীর মাত্র একটি সংস্থা পর্যবেক্ষক হিসেবে প্রাথমিক তালিকায় এসেছে। এটি কেন? এক জায়গায় একাধিক পর্যবেক্ষক সংস্থা থাকতে হবে। ইসিতে খুব সতর্ক থাকতে হবে, যেন বিতর্কিত কোনো সংস্থা পর্যবেক্ষকের সুযোগ না পায়। এজন্য সংস্থাগুলোর সম্পর্কে ভাল করে খোঁজ খবর নিয়েই তালিকা চূড়ান্ত করা উচিত। এখনো সে সুযোগ আছে। কোনোভাবেই যেন ইসি কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ না থাকে। তা না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে’।

স/আর

ট্যাগ: