নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজশাহী নগরীর তেরোখাদিয়া এলাকার মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী আনছার আলী। গত ঈদের দিন দিনভর এলাকায় ঘুরে ঘুরে ৭৬টি গরুর চামড়া কেনেন। প্রতিটি চামড়া তিনি কেনেন ৬০০-৮০০ টাকা দামে। সেই চামড়া ওইদিন সন্ধ্যায় অটোরিকশা ভাড়া করে বিক্রি করতে নিয়ে যান জেলার পুঠিয়া উপজেলার বেলপুকুরে। কিন্তু নিয়ে গিয়ে দেখেন চামড়া কেনার তেমন কোনো লোক নাই। অগত্যা রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রতিটি চাড়মা গড়ে সাড়ে তিনশ’ টাকা দামে বিক্রি করে বাড়িতে চলে আসেন।
আনছার আলী বলেন, ‘আমিসহ আরও এক বন্ধু মিলে ওই চামড়াগুলো কিনেছি। একটা অটোরিকশার ভাড়া দিয়েছি সারা দিনের জন্য দুই হাজার টাকা। এছাড়াও পকেট খরচ গেছে আরও প্রায় ৫০০ টাকা।

সবমিলিয়ে চামড়া কিনতে ৫০ হাজার টাকায় ব্যয় হয়েছে। কিন্তু সেই চামড়া বিক্রি করেছি ২৬ হাজার ৬০০ টাকায়। সবমিলিয়ে চামড়া কিনতে গিয়ে ২৩ হাজার ৪০০ টাকায় লোকসান হয়েছে। পকেট খরচ বাদ দিলেও ২৩ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে আমাদের।’
আনছারের বন্ধু সাইমুম বলেন, ‘চামড়ার সিন্ডিকেট এবার থাকবে না। দামও ভালো পাওয়া যাবে-গণমাধ্যমে এমন খবর দেখে আমরা চামড়া কিনতে গেলছুনু। ঈদের দিন ঈদ আনন্দ মাটি করে দুই টাকা লাভের মুখ দেখার আশায় ব্যার হইয়্যা লাভ তো দূরের কথা দুই বন্ধু প্রায় ক্যাঁদতে ক্যাঁদতে রাতে বাড়ি অ্যাসেছি।’
রাজশাহীর দুর্গাপুরের আমগাছী গ্রামের আবেদ আলী। পেশায় একজন কশাই। তবে প্রতিবার ঈদে ধার-দেনা করে গরু-ছাগলের চামড়া কিনেন। এবার ঈদের দিনেও একমাত্র ছেলে রুবেলকে সঙ্গে নিয়ে বের হয়েছিলেন চামড়া কিনতে। এলাকায় ঘুরে ঘুরে তাঁরা বাপ-ছেলে মিলে প্রায় ৩০ হাজার টাকার চামড়া কিনেছিলেন। একেকটি চাড়মা ৫০০-৭০০ টাকা দরে তাঁরা কোরবানিদাতা মুসল্লীদের নিকট থেকে কিনে নিয়েছিলেন। সেই চামড়া ওইদিন রাতে তাঁরা বিক্রি করতে নিয়ে যান দুর্গাপুর উপজেলা সদরে। কিন্তু ৩০ হাজার টাকা চামড়া কিনে তারা বিক্রি করে পান ২২ হাজার টাকা। এতে করে ৯ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হয় আবেদ আলীকে।
আবেদ আলী বলেন, ‘আমরা দক্ষ মানুষ হয়েই চামড়া কিনতে গিয়ে ধরা খেয়েছি। তাহলে যারা চামড়া সম্পর্কে জানেন, এমন মৌসুমি ব্যবসায়ী কি পরিমাণ লোকসান করেছেন ভাবেন?’
একই উপজেলার গৌরিহার গ্রামের জুলহাশ উদ্দিনও পেশায় কশায়। তিনিও এবার ঈদের দিনে চাড়মা কিনে প্রায় ৭০ হাজার লোকসানের মুখে পড়েছেন বলে দাবি করেন। জুলহাশ উদ্দিন বলেন,‘আমি প্রায় ৩০০ চামড়া কিনছি। কিন্তু এখন বিক্রি করার মতো পাটি (ক্রেতা) তেমন প্যাচ্ছি না। এখন বিক্রি করতে গ্যালি অন্তত ৭০ হাজার টাকা লস হবি। তাই কিনা চামড়াগুলিতে লবন দিয়ে র্যাখি দিছি। আরও ১০-১২ দিন পরে নাটোরে মোকাম খুললে নিয়ে যাবো। ১০-১২ দিনের আগে পাইকাররা ঢাকা থ্যাকি আসপি ন্যা। তখন বাজার কেমুন হবি বলা যাচ্চ্যে না তবে যে অবস্থা, লসি হবি মুনে হচ্চ্যে।’
এদিকে, জেলার পবা উপজেলার নওহাটা এলাকার মাজদার আলী নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘যেসব চামড়া একটু কেটে গেছে, সেসব চামড়া কেনার কোনো লোক পাওয়া যায়নি। তাই অনেকেই চামড়া বারনই নদীতে ফেলে দিছে। আবার খাশি ও গরু মহিষের মাথার চামড়া তো বিক্রি হয়নি বললেই চলে। বিক্রি হলেও ১০-২০ টাকা দাম। তাই কেউ কেউ বিক্রি না করে নদীতে ফেলে দিছেন।’
রাজশাহীর চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি লুৎফর রহমান জানান, ‘চামড়ার বাজার এখুন পর্যন্ত খুব খারাপ। সামনে ১০-১২ দিন পরে কি হবি বলা যাচ্চ্যে না। আমরা কাটা চামড়া কিনিনি। একটা চামড়ার পেছনে অন্তত ৩০ ট্যাকা খরচ হয়। আর কাটা চামড়া বিক্রি করে দাম পাওয়া যাবি হয়ত ৪০-৫০ ট্যাকা। বা তারও কম। তাহলে কাটা চামড়া কিনি কি হবি?’
তিনি জানান, কোরবানির সময় সাধারণত অদক্ষ লোকজনই বেশি পশু জবাইয়ের পর শরীর থেকে চামড়া ছিলা বা আলাদা করার কাজ করেন। এতে করে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চামড়া কেটে যায়। সে কারণে খুব সতর্কতার সঙ্গে চামড়া কিনতে হয়। অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী কাটা চামড়ার দিকে তেমন গুরুত্ব দেন না। আবার গুরুত্ব দিলেও হয়তো অর্ধেক বা কিছু কম দামে কিনে ফেলেন। কিন্তু বাজারে তারা পরে বিক্রি করতে গিয়ে সেই হারে কাটা চামড়ার দাম পাননা। এতে করে অধিকাংম মৌসুমি ব্যবসায়ী বেশি লোকসানের মুখে পড়েন।
রাজশাহীর চামড়া পট্ট্রির ব্যবসায়ী শামসুল আলম জানান, এবার তিনি ঈদের দিনে ৩০০ পিসের মতো চামড়া কিনেছেন। প্রতিটি চামড়া ৩০০-৮০০ টাকা পর্যন্ত কিনেছেন। সেগুলো দোকানেই লবন দিয়ে মজুদ করে রেখেছেন। ১০-১২ দিন পরে নাটোরে নিয়ে পাইকারদের কাছে বিক্রি করে আসবেন তিনি।
স.আর









