নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজশাহীর দুর্গাপুরের মাড়িয়া গ্রামের কৃষক সাধন আলী এবার ১৭ শতাংশ জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছিলেন। সপ্তাহ খানেক জমি থেকে তিনি সেই পেয়াঁজ সংগ্রহ করেছেন। এরই মধ্যে তিন দিন প্রায় ৮ মণ পেঁয়াজ বাজারে উপজেলার দুর্গাপুর হাটে বিক্রি করেছেন। তার মধ্যে গত ৯ এপ্রিল দুই মণ পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন ২ দুই হাজার ৬৪০ টাকায়। সেই হিসেবে ওইদিন তিনি প্রতিমণে দাম পেয়েছেন ১৩২০ টাকা করে।
এর পর গত ১৩ এপ্রিল তিনি একই পেঁয়াজ একই হাটে বিক্রি করেছেন ১ হাজার ৭৬০ টাকা মণ দরে। ওইদিন তিনি তিন মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে দাম পেয়েছেন ৫ হাজার ২৮০ টাকা। সর্বশেষ গত বুধবার হাটের দিন আবারও তিন মণ পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন।

এদিন তিনি দাম পেয়েছেন প্রতি মণে ২ হাজার ১৬০ টাকা করে। সেই হিসেবে মোট দাম পেয়েছেন ৬ হাজার ৪৮০ টাকা। সবমিলিয়ে ২৪ হাজার ৪০০ টাকার পেঁয়াজ এরই মধ্যে তিনি বিক্রি করেছেন। এখনো ঘরে মজুদ আছে আরও প্রায় ২২ মণ। সেগুলো বিক্রি করলে এখন বাজারেই আরও দাম পাওয়া যাবে আরও অন্তত ৪৭ হাজার টাকা।
সাধন আলী জানান, পেঁয়াজ জমি থেকে তোলার পরে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে তিনি প্রতি মণে ৮৪০ টাকা দাম বেশি পেয়েছেন। ফলে ৮ মণ বিক্রি করার পরে বাকি পেঁয়াজগুলো আর বিক্রি না করে তিনি বাড়ির ঘরের চাতালে সংরক্ষণ করে রেখেছেন।
সাধন আলী বলেন, ১৭ শতাংশ জমিতে পেঁয়াজ চাষ করতে গিয়ে প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন সবগুলো বিক্রি করলে আরও প্রায় ২২ মণ পেঁয়াজ বিক্রি করতে পারব। সেই হিসেবে প্রায় ৭১ হাজার টাকার পেঁয়াজ বিক্রি হবে। তাতে অন্তত ৪১ হাজার টাকা লাভ থাকবে।’
সাধন আলী আরও বলেন, পেঁয়াজ যদি কাঁচা অবস্থায় বিক্রি করি দিতুক (দিতাম) তাহলে গড়ে খুব বেশি হলে ৮-৯শ টাকা মণ পাওয়া যেত। তখন ওজনে একটু বেশি হলেও বড় জোর সবমিলিয়ে ৩৫ হাজার টাকার পেঁয়াজ বিক্রি হত। কিন্তু ঘরে রেখে পেঁয়াজ শুকানোর কারণে এখন দাম বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
একই গ্রামের আরেক কৃষক জেনারুল ইসলাম জানান, তিনি প্রায় দুই বিঘা ১৮ শতক জমিতে এবার পেঁয়াজ চাষ করেছিলেন। পেঁয়াজ চাষ করতে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে পেঁয়াজ চাষ করতে। এর মধ্যে ধার-দেনা করতে হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। তবে পেঁয়াজ পেয়েছেন প্রায় ২২০ মণ। বিঘাপ্রতি প্রায় ৮৫ মণ পেঁয়াজ পেয়ছেন তিনি। এর মধ্যে ৬ মণ বিক্রি করেছেন। সামনে রবিবারে বিক্রি করবেন আরও ১০ মণ। তার পরের হাটে আরও মণ বিশেক বিক্রি করবেন। বাকিগুলো রেখে দিবেন বাড়িতেই। আগামী ঈদের মধ্যে বা ঈদের পরে সেগুলো বিক্রি করবেন।
জেনারুল বলেন, ‘এতো পেঁয়াজ রাখার বাড়িতে জায়গা নাই। তাই বিক্রি করতে হবে মণ ত্রিশেক। ওই পেঁয়াজ বিক্রি করেই ধার-দেনা শোধ হবে আশা করি। বাকি পেঁয়াজ বিক্রি করে সংসারের বড় কোনো কাজে লাগানো যাবে।’
একই উপজেলার আমগাছী গ্রামের এনামুল হক বলেন, ‘আমি পরের জমিতে কাজ করে সংসার চালায়। ধার-দেনা করে ১৫ শতক জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছুনু। প্রতিবার পেঁয়াজ উঠার পরে বাড়ির চাতালে এবং ঘরের মধ্যে রাখি দিই। এই বছরও রাখি দিছি। এখুন বিক্রি করবো না। ১২ হাজার টাকার মতো ধার হয়েছিল। ওই টাকা ছাগল বিক্রি করে শোধ করবো। পেঁয়াজ যা পাইছি বিক্রি করে হাজার পঁঞ্চাশেক টাকা হবে।’
এনামুল হক জানান, ১৫ শতক জমিতে পেঁয়াজ চাষ করতে গিয়ে তাঁর সবমিলিয়ে খরচ হয়েছে ২০ হাজার টাকার মতো। এখন পেঁয়াজ বিক্রি করলেও অন্তত ৩০ হাজার টাকা লাভ হবে।
পবার মহেন্দ্র এলাকার চাষি নজরুল ইসলাম জানান, তিনি এবার প্রায় এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছিলেন। গত প্রায় ১৫ দিন আগেই অধিকাংশ পেঁয়াজ বিক্রি করে দিয়েছেন। তাঁর পেঁয়াজ খুব একটা ভালো হয়নি। আবার শুরতে ৭-৮শ মণ দরে বিক্রি হওয়ায় তাঁর কিছুটা লোকসান হয়েছে।
নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বাড়িতে পেঁয়াজ রাখার জায়গা নাই। তাই কাঁচা পেঁয়াজ বিক্রি করতে হয়েছে। একটা সপ্তাহ রাখতে পারলে লাভ হতো। কিন্তু লাভ করতে পারিনি হাজার দশেক টাকা লোকসান হয়েছে।’
রাজশাহীর সবচেয়ে বড় পেঁয়াজের মোকাম বলে পরিচিত জেলার বাগমারা উপজেলার তাহেরপুর হাট। সপ্তাহে সোমবার ও শুক্রবার বসে এ হাট। প্রতি হাটে ৩০-৪০ ট্রাক পেঁয়াজ কেনা-বেচা হয় এখানে। এ হাট থেকে পেঁয়াজ সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন মোকামে পাঠান ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম।
তিনি জানান, গত সোমবার এ হাটে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১৭-১৯শ টাকা দরে। তবে আজ শুক্রবার দাম আরও বাড়তে পারে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘এখনো প্রচুর পেঁয়াজ আছে কৃষকের ঘরে। অধিকাংশ কৃষকই পেঁয়াজ ঘরে মজুদ করেছেন। যাদের একেবারেই টাকার সমস্যা, তারাই কেবল পেঁয়াজ বিক্রি করছেন বা করেছেন। যারা একটু স্বচ্ছল তারা এখন পেঁয়াজ বিক্রি করবেন না। কারণ ঘরে শুকনা পেঁয়াজ দীর্ঘদিন রাখা যায়। আগামী পেঁয়াজের দাম আরও বাড়বে আশায় কৃষকরা তেমন বিক্রি করছেন না। অনেক ব্যবসায়ীও পেঁয়াজ কিনে হিমাগারে বা চাতালে মজুদ করছেন। আবার আমদানিও বন্ধ এ কারণে বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে।’
এ হাটের আরেক ব্যবসায়ী বাবলুর রহমান জানান, এবার শুরুতেই (২০-২৫ দিন আগে) কাঁচা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৭-৮শ টাকা মণ দরে। এর এক সপ্তাহ পর থেকেই বাজার বাড়তে থাকে। কিন্তু এখন দাম প্রায় দ্বিগুন বেড়েছে। আগামী হাটে দুই হাজার টাকার নিচে পেঁয়াজ পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। তবে বৃষ্টি হলে দাম কমবে। কারণ এখনো কিছু পেঁয়াজ মাঠে আছে। বৃষ্টি হলে সেগুলো কৃষকদের হাতের হাত বিক্রি করতে হবে। না হলে পচন ধরব।’
এদিকে, রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর মুড়িকাটা ও চারা পেঁয়াজ মিলে মোট ১৮ হাজার ৫৮৫ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল। পেঁয়াজ চাষ হয়েছে ২১ হাজার ৫০৬ হেক্টর জমিতে। পেঁয়াজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪ লাখ ৭ হাজার ৩০০ টন। এখন পর্যন্ত ৮৫ শতাংশ পেঁয়াজ সংগ্রহ করা হয়েছে জমি থেকে। এখনো ১৫ শতাংশ পেঁয়াজ মাঠে রয়েছে। সেই হিসেবে মাঠেই আছে এখনো প্রায় ৭০-৮০ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ।
রাজশাহীর পেঁয়াজ চাষিরা জানান, এবার বিঘাপ্রতি ৬০-১০০ মণ পেয়াজ উৎপাদন হয়েছে। এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করতে সর্বোচ্চ খরচ হবে ৫০ হাজার টাকা। আর গড়ে ৬০ মণ পেঁয়াজ হলেও চাষিদের লোকসান হওয়ার কথা না। তবে যারা একেবারে ছোট চাষি, বা ঋণ-দেনা করে পেঁয়াজ চাষ করেছেন, আবার যাদের বাড়িতে রাখার মতো একেবারেই জায়গা নাই, তারা শুরুতেই কাঁচা পেঁয়াজ বিক্রি করে কিছুটা লোকসানের মুখ দেখেছেন। কিন্তু এখন কাঁচা পেঁয়াজ বিক্রি করলেও লোকসান হবে না।
স/আর









