রাজশাহীর খবর

রাজশাহীতে ট্রাক টার্মিনাল ও শ্রমিক ইউনিয়নের নামে মহাসড়কে বেপরোয়া চাঁদাবাজি

নিউজ ডেস্ক৫ জানুয়ারি ২০২০৪ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওয়াতায় নগরীর নওদাপাড়া এলাকায় তৈরী করা হয়েছে ট্রাক টার্মিনাল। নিয়ম অনুযায়ী এই টার্মিনালে যেসব ট্রাক প্রবেশ করবে বা রাখা হবে, কেবল সেগুলো থেকেই ফি বা চাঁদা আদায় করতে পারবে লিজ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এই নিয়মের কোনো বালাই নাই। ট্রাক টার্মিনালের নামে নগরজুড়েই চলছে চাঁদাবাজি। অর্থাৎ রাজশাহী নগরীর ভিতর দিয়ে যেসব ট্রাক চলাচল করছে সবগুলোকেই চাঁদা দিতে হচ্ছে লিজ গ্রহণকারী।

দিতে হচ্ছে মানে, জোর করে নেওয়া হচ্ছে। রীতমতো লাঠি, রড হাতে নিয়ে মহানড়কে দাঁড়িয়ে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে প্রশাসনের নাকের ডগায়। কিন্তু এ নিয়ে কারো মাথাব্যাথা নাই। এ কারণে ব্যাপরোয়া চাঁদাবাজরা। টাকা না পেলেই কখনো কখনো তুলছে ট্রাকচালকদের গায়ে হাত। আবার ট্রাকের গ্লাসও ভেঙে দিচ্ছে তারা। আবারো কখনো কখনো ঘটছে জীবনহানীর মতো দুর্ঘটনা। তার পরেও থেমে নেই এ চাঁদাবাজি। এ নিয়ে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে ট্রাক চালক ও মালিকদের মাঝে।

অভিযোগ উঠেছে, পুলিশ প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এসব চাঁদা উঠছে রাস্তা থেকে। চাঁদার একটি ভাগও সংশ্লিষ্ট থানাসহ ট্রাফিক বিভাগের যাচ্ছে। ফলে পথে পথে যেন চাঁদার হাট বসেছে।

সকালে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, নগরীর ট্রাক টার্মিনালের সামনে ৫-৬ জন লোক লাঠি ও রড হাতে নিয়ে রাজশাহী সিটি বাইপাশ দিয়ে যাওয়া সকল ট্রাক থেকে জোর করে চাঁদা তুলছে। ট্রাকগুলোকে জোর করে থামিয়ে চালকদের নিকট থেকে ৫০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হচ্ছে। অথচ এই ট্রাকগুলো ছুটে যাচ্ছে বিভিন্ন গন্তব্যে। ট্রাক টার্মিনালের ভিতরে প্রবেশ করার বালাই নাই তাদের। কিন্তু এই টার্মিনালের সামনে দিয়ে মহাসড়ক ধরে যাওয়ার কারণেই চালকদের দিতে হচ্ছে চাঁদা। যেন বিমানবন্দরের নিয়ম মেনে চলতে হচ্ছে ট্রাক চালকদের। চাাঁদা আদায়ের জন্য রাস্তার ধারে ফুটপাতের ওপরে একটি ঘরও নির্মাণ করা হয়েছে।

চাঁদাবাজিতে ব্যস্ত একজন ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই ট্রাক টার্মিনালটি লিজ নিয়েছেন রাজশাহী মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সভাপতি কামাল হোসেন রবি। তাঁর নির্দেশেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে সকল ট্রাক থেকে তারা চাঁদা উত্তোলন করছে ১০০ টাকা করে। নগরীর শিরোইলে বাফার সার গোডাউনের সামনেও ট্রাক টার্মিনালের নামে ৫০ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। এভাবে প্রতিদিন রাজশাহীতে প্রবেশকারী অন্তত ৫ হাজার ট্রাক থেকে সমানে চাঁদা উত্তোলন করা হচ্ছে। এর মধ্যে ১০টি ট্রাকও প্রবেশ করানো হয় ট্রাক টার্মিনালে। কিন্তু প্রতিটি ট্রাক থেকেই উত্তোলন করা হচ্ছে চাঁদা। আর সেই টাকা হচ্ছে লুটপাট। সবমিলিয়ে শুধু ট্রাক টার্মিনালের নামেই অন্তত আড়াই লাখ টাকা চাঁদা উঠছে প্রতিদিন।

জানতে চাইলে হোসেন আলী নামের একজন শ্রমিক বলেন, এই টাকা ইউনিয়নের ফান্ডে জমা হয়। এখন পর্যন্ত কতটাকা জমেছে জানতে চাইলে তিনি এর কোনো উত্তর দিতে পারেননি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা পণ্যবাহী ট্রাকের চালক নূরুল হোসেন বলেন, ‘আমার মালবাহী ট্রাকটি যাবে ঢাকায়। কিন্তু রাজশাহী ট্রাক টার্মিনালের নামে চাঁদা দিতে হলো ৫০ টাকা। আবার ট্রাক শ্রমিকদের নামে দিতে হলো আরো ৫০ টাকা। সবমিলিয়ে দুটি স্লিপে এই টাকা আদায় করা হলো অনেকটা জোর করে। টাকা দিতে না চাইলেই চাঁদা আদায়কারীরা তেড়ে আসে মারতে। কখনো কখনো গাড়ীর গ্লাসে বা আমাদের ওপরেও হামলা করে। লাঠি-রড দিয়ে বাড়ি মারে। এতে ভয়ে বাধ্য হয় টাকা দিতে।’

আরেক ট্রাক চালক আকবর আলী বলেন, টাকা না দিয়ে পার হওয়ার কোনো উপায় নাই। একেবারে জোর করে টাকা আদায় করা হয়। টাকার জন্য একেবারে ট্রাকের সামনে এসে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যায় আদায়কারীরা। এভাবে কখনো ট্রাক নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁিকও থেকে যায়।’

রাস্তায় চাঁদা আদায় সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজশাহী ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ফরিদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের টাকা ব্যয় হয় মালিক-শ্রমিকদের কল্যাণেই। কিন্তু আমাদের বাইরেও রাস্তায় নেমে জোর করে টাকা আদায় হয় ট্রাক থেকে। এই টাকার কোনো হিসেব নাই।’

রাজশাহী মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি কামাল হোসেন রবি বলেন, অধিকাংশ টাকায় উত্তোলন হয় ট্রাক মালিক-শ্রমিকের নামে। শুধুমাত্র ৫০ টাকা করে উত্তোলন হয় ট্রাক টার্মিনালের নামে। তাও যেসব ট্রাক রাজশাহীর বাইরে থেকে আসে, কেবল সেগুলো থেকেই আমরা চাঁদা তুলি। রাজশাহীর ট্রাক চালকরা চাঁদা দিতে চায় না।’

রাস্তায় ট্রাক থেকে চাঁদাবাজি সম্পর্কে জানতে চাইলে মহানগর পুলিশের মুখপাত্র গোলাম রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘শ্রমিকরা চাঁদা উঠালে আমরা কি করবো। এটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। আর ট্রাক টার্মিনালের চাঁদা কিভাবে উঠছে সেটি খতিয়ে দেখা হবে।’

প্রসঙ্গত, গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে নগরীর নওদাপাড়া আমচত্তর এলাকায় লাঠি হাতে নিয়ে ট্রাক থেকে চাঁদা তুলতে গিয়ে ট্রাকের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান রাজশাহী ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের প্রচার সম্পাদক শামীম হোসেন। তারপরেও থামেনি সেখানে চাঁদা আদায়। প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা ট্রাক এই নওদাপাড়াতেই দাঁড়িয়ে লাঠি নিয়ে ট্রাক থেকে চাঁদা আদায়ে ব্যস্ত কয়েকজন লোকজন। পালা করে তারা চাঁদা আদায় করছে দুটি গ্রুপ। একটি গ্রুপ ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের নামে আরেকটি গ্রুপ ট্রাক টার্মিনালের নামে। ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্যরা মাঝে মধ্যেই রাস্তায় নামলেও ট্রাক টার্মিনালের নামে রাতদিন সমানে চলছে চাঁদাবাজি।