নিজস্ব প্রতিবেদক :
আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের পরিচয়—এই স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছিল রাজশাহীর কোথাকারী উপজেলার পৌরসভার নিমঘুটু গ্রামের মাঠটি। “রক্ষাগোলা সমাজ সংগঠন সমূহের বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ও মেলা যেন শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, ছিল এক মিলনমেলা—পরিচয়ের, ঐতিহ্যের, আর আত্মমর্যাদার।
রঙিন সাজে সজ্জিত প্যান্ডেল, বাঁশের খুঁটিতে গাঁথা পতাকা, আর মঞ্চে বাজতে থাকে একের পর এক ঢোলের তালে নাচের ছন্দ। ছোট-বড় সবার চোখে আনন্দের ঝিলিক। সকাল থেকে শুরু হয় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা। সাঁওতাল, ওঁরাও, পাহাড়িসহ নানা ধর্মের আদিবাসী নারী-পুরুষ ও শিশুদের নিয়ে বিভিন্ন সংগঠনের গান ও নৃত্য পরিবেশন। সাথে ছিলে আদিবাসীদের বিভিন্ন কৃষ্টি কালচার তুলে ধরার প্রতিযোগিতা। কেউ বাঁশি, কেউ ঢোল, কেউ তবলা, কেউ হারমনির সুরে মাতিয়ে তোলেন অনুষ্ঠান প্রাঙ্গন। তাদের পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যবাহী ধামসা-মাদলের তালে তালেও নাচতে থাকেন। প্রতিটি পরিবেশনা যেন জীবনের গল্প—প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা এক জনগোষ্ঠীর প্রাণের ভাষা।
আয়োজনে ছিল রক্ষাগোলা সমাজ সমন্বয় কমিটি। কয়েকটি বেসরকারী সংস্থার সহযোগিতায় সহযোগিতায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রক্ষাগোলা সম্নয় কমিটির সভাপতি সুধির স্বরেন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সাল আহমেদ। উপস্থিত ছিলেন স্কুল শিক্ষক আব্দুল মান্নান, হরেন্দ্রনাথ সিং, মেরিনা হাসদা, নিরাবুল ইসলাম প্রমুখ।
মেলায় ছিল হস্তশিল্প প্রদর্শনী, আদিবাসী পোশাক, বাঁশ-বেতের তৈরী বিভিন্ন জিনিসপত্র, লাঙ্গল-জোয়াল, নাঙলি আদিবাসীদের বিভিন্ন খাবারসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র নারী উদ্যোক্তারা নিজেদের তৈরি গয়না, রঙিন চুড়ি, এবং কাপড় বিক্রি করছিলেন হাসিমুখে।

বিকেলের দিকে সূর্য যখন গাছের মাথায় হেলে পড়ছে, তখন মঞ্চে শুরু হয় সমাপনী পর্ব। বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় পুরস্কার, করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ। এক কিশোরীর চোখে আনন্দের অশ্রু—সে হয়তো জিতেছে গান প্রতিযোগিতায়, কিন্তু আসলে জিতেছে নিজের স্বপ্নে বিশ্বাস।
রক্ষাগোলার এই অনুষ্ঠান শুধু সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা নয়; এটি ছিল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা ঐতিহ্যের সেতুবন্ধন। যেখানে মানুষ নিজের ভাষা, নাচ, গান আর হাসির মাধ্যমে বলে উঠছে—আমরা আছি, আমরা বাঁচব, আমাদের সংস্কৃতি বেঁচে থাকবে।
রাতের আকাশে যখন তারারা জ্বলজ্বল করছিল, তখনও গ্রামজুড়ে ভাসছিল ঢোলের আওয়াজ, বাশির সুর, আর মানুষের মুখে একটাই উচ্চারণ—
“আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের পরিচয়।”









