সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (এএইচএ) ও আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজি (এসিসি)-সহ আরো কয়েকটি সংস্থা মিলে প্রাপ্তবয়স্কদের উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ, মূল্যায়ন ও ব্যবস্থাপনার জন্য ২০২৫ সালে একটি নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। গত ১৪ আগস্ট এই নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়েছে বলে টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে জানা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় অর্ধেক প্রাপ্তবয়স্ক (৪৬.৭%) উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন এবং এটি বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে একটি। এই নতুন নির্দেশিকা শুধু চিকিৎসার লক্ষ্যেই প্রকাশ করা হয়নি, বরং জীবনযাপন, বিজ্ঞান ও বাস্তব জীবনে প্রয়োগের বিষয়েও বলা হয়েছে।

এই নির্দেশিকার লক্ষ্য হলো মানুষকে সচেতন করা, যাতে সবাই নিজের যত্ন নিতে পারে এবং প্রিয়জনকে সহায়তা করতে পারে।
প্রতিরোধের সঙ্গে দ্রুত পদক্ষেপও জরুরি
নতুন এই নির্দেশিকায় সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে জীবনযাপন। হার্টের জন্য উপকারী খাদ্যগ্রহণ, লবণ কমানো, ব্যায়াম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ—এই পুরনো নিয়মই সবার আগে। তবে নতুন নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, প্রয়োজনে শুরুতেই চিকিৎসা দেওয়া উচিত, যাতে শুধু হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক নয়, বরং কিডনি সমস্যা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, এমনকি স্মৃতিশক্তি হ্রাস ও ডিমেনশিয়া থেকেও সুরক্ষা পাওয়া যায়।
স্মার্ট ঝুঁকি নির্ণায়ক
নতুন এই নির্দেশিকায় স্থান পেয়েছে ২০২৩ সালে চালু হওয়া ঝুঁকি নির্ণায়ক। এটি বয়স, রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, এমনকি বাসার জিপ কোড পর্যন্ত বিবেচনা করে ১০ ও ৩০ বছরের হৃদরোগের ঝুঁকি নির্ধারণ করে—যেখানে সামাজিক বৈষম্যকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আরো উন্নত ল্যাব পরীক্ষা
নতুন এই নির্দেশিকায় কিডনি ও হরমোনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে মূত্রের অ্যালবুমিন-টু-ক্রিয়েটিনিন অনুপাত পরীক্ষা সব উচ্চ রক্তচাপ রোগীর জন্য নিয়মিত হবে।
পাশাপাশি, অ্যালডোস্টেরন-টু-রেনিন অনুপাত পরীক্ষাও আরো বেশি রোগীর জন্য প্রযোজ্য হবে—বিশেষ করে যারা স্লিপ অ্যাপনিয়া বা স্টেজ-২ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন।
মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের দিকে বিশেষ নজর
রক্তচাপ শুধু হৃৎপিণ্ড ও কিডনির সমস্যা নয়, বরং মস্তিষ্কেরও ক্ষতি করে। সামান্য বৃদ্ধি পেলে স্মৃতি ও জ্ঞান কমিয়ে দিতে পারে। তাই এখন লক্ষ্য হচ্ছে সিস্টোলিক ১৩০ mm Hg-এর নিচে রাখা। বিশেষ করে মস্তিষ্কের সুরক্ষার জন্য এটি অবশ্যই পালনীয়।
ওষুধ
যাদের টাইপ-২ ডায়াবেটিস, স্থূলতা বা কিডনি রোগ আছে, তাদের জন্য একটিমাত্র ওষুধ যথেষ্ট নয়। তাই এখন এইস ইনহিবিটার, এআরবি, ক্যালসিয়াম-চ্যানেল ব্লকার বা থায়াজাইড ডিউরেটিক দিয়ে চিকিৎসা শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আর যদি রক্তচাপ ১৪০/৯০ mm Hg বা তার বেশি হয়, তবে একসঙ্গে দুটি ওষুধ (কম্বো পিল) নেওয়া উত্তম। স্থূলতায় ভুগছেন এমন রোগীদের ক্ষেত্রে GLP-1 ধরনের ওষুধও যুক্ত করা যেতে পারে।
গর্ভাবতীদের বিশেষ নির্দেশনা
গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ বড় ঝুঁকির বিষয়—যেমন প্রি-এক্ল্যামসিয়া বা অকাল প্রসব। তাই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে—
কিছুক্ষেত্রে লো-ডোজ অ্যাসপিরিন (৮১ মি.গ্রা. প্রতিদিন) ব্যবহার করতে হবে।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের সীমা আরো কঠোরভাবে ১৪০/৯০ mm Hg নির্ধারণ করা হয়েছে।
সন্তান জন্মের পরও নজরদারি চালিয়ে যেতে হবে, কারণ রক্তচাপ অনেক সময় থেকে যায়।
বাস্তবসম্মত জীবনযাপন
লবণ : দিনে সর্বোচ্চ ২,৩০০ মি.গ্রা., আদর্শ ১,৫০০ মি.গ্রা.। প্রধান উৎস হলো প্যাকেটজাত ও রেস্তোরাঁর খাবার।
অ্যালকোহল : সম্ভব হলে একেবারেই নয়।
স্ট্রেস : দূর করা নয়, নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম, মেডিটেশন, শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ, যোগব্যায়াম যেটি মানানসই সেটি করুন।
ওজন : মাত্র ৫% কমালেও উল্লেখযোগ্য উপকার পাওয়া যায়।
খাদ্যাভ্যাস : ডায়েট মেনে চলুন। ফল, শাক-সবজি, দানাশস্য, বাদাম, বীজ, চর্বিহীন প্রোটিন, লো-ফ্যাট দুগ্ধজাত খাবার, স্বাস্থ্যকর তেল গ্রহণ করুন।
ব্যায়াম : সপ্তাহে অন্তত ৭৫–১৫০ মিনিট কার্ডিও বা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করুন।
বাড়িতে রক্তচাপ মাপা : শুধু ক্লিনিকের রিডিং নয়, ঘরেও নিয়মিত রক্তচাপ মাপা জরুরি।
বিশেষজ্ঞের মত
নির্দেশিকা লেখক কমিটির চেয়ারম্যান ও ইউনিভার্সিটি অব মিসিসিপি স্কুল অব মেডিসিনের অধ্যাপক ড্যানিয়েল ডব্লিউ. জোন্স বলেন, ‘উচ্চ রক্তচাপ হলো হৃদরোগের সবচেয়ে সাধারণ ও পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি। ব্যক্তিগত ঝুঁকি আগে থেকে শনাক্ত করে এবং জীবনযাপনে কৌশল অবলম্বন করে চিকিৎসা করলে আরো বেশি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। সেই সঙ্গে হৃদরোগ, কিডনি রোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও ডিমেনশিয়ার ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে।’









