রাজশাহী

মেধার পথে সাজ্জাদের বাধা দারিদ্র্যতা

নিউজ ডেস্ক৮ নভেম্বর ২০১৬৩ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

পারিবারিক বা সামাজিক কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়, দারিদ্র্যতার চরম সীমা সাফল্যের একেকটি ধাপকে যেন বার বার আঁকড়ে ধরতে চায় তাকে। কিন্তু কখনোই থেমে থাকেনি সে। সেই একটু খানি বয়স থেকেই প্রতিটি বাধা পার করেছে চরম কষ্টের মধ্য দিয়ে।

 

  • আর্থিক অনটনের মধ্যে বার বার যখন পড়া-লেখা পড়েছে হুমকিরমুখে তখনই ঘুরে দাঁড়িয়েছে সে। অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে দারিদ্র্যতাকে মাথায় নিয়ে পড়া-লেখার খরচ জুগিয়েছে সে। এখন সামনের আরো বড় সফল্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সে। তবে এবারো হয়তো আষ্টে-পিষ্ঠে এসে জড়িয়ে ধরবে সেই অভাব-অনটনের অপর নাম দারিদ্র্যতা। কিন্তু সেখানেও ভিত নয় সে। সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সে বাধাও পার করতে প্রস্তুত।

 

তারপরেও আতঙ্কিত সঙ্কিত মন তাকে ঘিরে ধরেছে, যদি এখান থেকেই পা পিছলে পড়তে হয় সেই দারিদ্র্যতার চপটাঘাতে?

 

  • বলছিলাম রাজশাহীর পবা উপজেলার বড়গাছী এলাকার মেধাবী শিক্ষার্থী সাজ্জাদ হোসেনের কথা।  যে দিনের পর দিন দারিদ্র্যতার প্রতিকূলতা ঠেলে সাফল্যকে এনেছে হাতের মুঠোই। কিন্তু বড় সাফল্য উচ্চ শিক্ষা এখন সেই দারিদ্র্যতার কাছেই হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

সাজ্জাদ আলীর বাবার নাম ছমির থান্দার। বয়স প্রায় ১০৫ বছর। বয়সের ভারে ন্যুয়ে বাবার যখন চলাই দায়, তখন তার পক্ষে অর্থ সংগ্রহ করার মতো ক্ষমতায় বা থাকে কতটুকু। ঠিক তেমনটিই ঘটেছে ছমির থান্দারের ক্ষেত্রেও। ফলে একমাত্র ছেলে এবং বৃদ্ধা স্ত্রীকে নিয়ে পড়েছেন বিপাকে তিনি। কিন্তু তার পরেও হাল ছাড়েননি ছমিরের স্ত্রী নাসিমা বিবি এবং ছেলে সাজ্জাদ আলী। নাসিমা বিবি এই বয়সেও করেন পরের বাড়িতে কাজ। আর ছেলে সাজ্জাদকে সংসার এবং লেখা-পড়ার ভার টানতে করতে হয় পরের জমিতে কৃষি কাজ আবার কখনো টিউশনি।

 

এভাবেই চলে সাজ্জাদদের সংসার এবং পড়া-শোনা। আর এভাবেই সাজ্জাদ একের পর একটি সাফল্যকে টেনে এনেছে হাতের মুঠোই। আজ সে স্বপ্ন দেখে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার তবে। হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান সাজ্জাদ আতঙ্কিত উচ্চ শিক্ষার জন্য যে সময় ও অর্থ ব্যয় হবে, সেটি আসবে কোথা কোথা থেকে?

সাজ্জাদ জানায়, চরম দারিদ্র্যতার মধ্যেও নওহাটা মডেল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পিএসসি পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায় সে। এরপর ট্যালেন্টপুুল ছিল জেএসসি পরীক্ষাতেও। সাফল্য আসে এসএসসি পরীক্ষাতেও। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পায় সে। এরপর নওহাটা ডিগ্রি কলেজ থেকে মানবিক বিভাগ থেকে ২০১৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় পায় জিপিএ-৫। যেন একে একে সাফল্যের পাহাড় গড়তে থাকে সে।

 

  • অদম্য মেধাবী সাজ্জাদ এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে প্রাথমিকভাবে দর্শন বিভাগে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। তবে দর্শনে নয়, তার চেয়ে আরো ভাল কোনো বিষয়ে পড়তে ঢাবির ভর্তি কমিটির কাছে আবেদন জানিয়েছে সে।

 

  • সাজ্জাদের ভাষ্য, আশা করছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাল কোনো বিষয়েই পড়তে পারবো। তবে ভর্তি হয়ে সেখানে কিভাবে খরচ জোগাবো সেটি নিয়েই এখন দুশ্চিন্তায় আছি। ঢাকায় ভর্তি হলে সেখানে থাকা-খাওয়াসহ পড়া-শোনার যে খরচ হবে, সেটি কিভাবে আসবে, নাকি এখানে এসেই থেমে যেতে হবে-এমন আশঙ্কা ঘুরপাক মনের মাঝে।’

 

  • সাজ্জাদ আলী বলে, মনের মাঝে স্বপ্ন আছে বিসিএস ক্যাডার হয়ে ভাল চাকরি করে গ্রামের মানুষদের সেবা করব। আমার মতো অনেক মেধাবী আছে গ্রামে। অর্থের অভাবে অনেকেই আমার মতো পড়শোনা করতে কষ্ট হয়, তাদের আমি পাশে দাঁড়াবো।’

কথা হয় সাজ্জাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক ওমর আলীর সাথে। তিনি বলেন, সাজ্জাদ খুব গরীব ঘরের ছেলে। ছোট থেকে অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছে। তার ঘরে এক বেলা খাবার জোটে তো বাঁকি দু-বেলা অনাহারে কাটে তাদের। কিন্তু পড়াশোনার প্রতি তার অসীম মনোবল। তার এই মনোবল দেখে আমরা স্কুলের পক্ষ থেকে বই, খাতা, ইউনিফর্মসহ পড়াশোনার যাবতীয় শিক্ষা সরঞ্জাম কিনে দিয়েছি। কিন্তু এখন সে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে চলেছে। তার পাশে সমাজের হৃদয়বান মানুষরা না দাঁড়ালে ছেলেটি হয়তো আর এগুতে পারবে না।

 

স/আর