তারা বলেছেন, সরকারের বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা ক্রমেই দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে। প্রতি বছরই কমছে বাজেট বাস্তবায়নের হার। অথচ প্রতি বছর বাজেটের অঙ্ক বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু বছর শেষে বাস্তবায়ন নেমে যাচ্ছে ৮০ শতাংশের নিচে। এতে রাজস্ব ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতা দেখা দিচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে অবাস্তব সংখ্যার বাজেট পেশ করা হচ্ছে। আলোচনা ছাড়াই বাজেট পাস হচ্ছে। ফলে বাজেটে জনকল্যাণের দিকগুলো প্রতিফলিত হচ্ছে না।
রাজধানীর মহাখালীতে শুক্রবার ব্র্যাক ইন সেন্টারে ব্র্যাক বিজনেস স্কুল আয়োজিত বাজেট-পরবর্তী এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেছেন।

এতে আলোচনায় অংশ নেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ও ড. আকবর আলি খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং আইপিডিসি ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মমিনুল ইসলাম প্রমুখ।
ড. আকবর আলি খান বলেন, বাজেটের আকার প্রতি বছর বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে সক্ষমতার ঘাটতির মাত্রাও। বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা ক্রমেই দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে উঠছে। আগামী অর্থবছরেও এ ধরনের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, দারিদ্র্য বিমোচনের বার্ষিক গড় হার কমে আসছে। আগে যে হারে দারিদ্র্য কমত, এখন কমার গতি অনেক কমে গেছে। এ অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থা থেকে কিভাবে উত্তরণ হবে, তার কোনো ঘোষণা নেই বাজেটে। আবার আঞ্চলিক বৈষম্যও দিন দিন প্রকট হচ্ছে। অনেক জেলায় ৫০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। অনেক জেলায় এ সংখ্যা অনেক কম। এ বৈষম্য দূর করতে কোনো উদ্যোগ বাজেটে নেই। অথচ এ ধরনের উদ্যোগ নেয়াটা জরুরি।
বাজেটে ঘোষিত আয়-ব্যয়ের সংখ্যায় উষ্মা প্রকাশ করে আকবর আলি খান বলেন, বাজেটে আয়-ব্যয়ের যে সংখ্যা বলা হচ্ছে, তা অর্জন হবে না। আর সমস্যা হল- এই সংখ্যাগুলো কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। একটি বাজেট যখন সংসদে জনপ্রতিনিধিদের সামনে পেশ হবে, তখন সংখ্যাগুলো বাস্তবভিত্তিক হওয়া উচিত। গত কয়েক বছর ধরে অবাস্তব সংখ্যার বাজেট পাস করা হচ্ছে। ফলে এটি আর বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
বাজেটের মৌলিক উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, জনগণের কল্যাণে বাজেট করা হয়। জনপ্রতিনিধিদের অনুমোদন নিয়ে কর আরোপ করতে হয়, একই সঙ্গে করের টাকা খরচ করতে হয়। কিন্তু এখনকার বাজেটে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না। সংসদে বাজেট নিয়ে কোনো গঠনমূলক আলোচনাও হয় না। এমন কোনো সংসদ সদস্য পাওয়া যাবে না, যিনি এই বাজেটের পুরোটাই পড়বেন, তারপর এর খুঁটিনাটি দিকগুলো নিয়ে সংসদে আলোচনা করবেন। প্রধানমন্ত্রীর আশীর্বাদ দিয়ে অর্থমন্ত্রী যে বাজেট উপস্থাপন করেন, তাই অনুমোদন হবে। অথচ আমাদের সংবিধানে বলা হয়েছে, প্রতিনিধির মতামত ছাড়া কোনো কর আরোপ করা যাবে না। তাদের মতামত নিয়ে কর আরোপ করলে সেগুলো খরচের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকবে। আর জনপ্রতিনিধিদের মতামত ছাড়া করারোপ করা হলে খরচের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। কর আরোপ, খরচ কোনো কিছুতেই প্রতিনিধিদের মতামত নেয়া হচ্ছে না।
ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের হার প্রতি বছরই কমছে। সরকার যেটুকু আয় করতে পারে সেটুকু খরচ করতে পারে না। আর যা খরচ হয় তার মধ্যে মানসম্পন্ন খরচের হার বেশ কম। বাজেটকে অর্থবহ করতে হলে খরচের মান বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বাজেটের বাস্তবায়ন বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, বাজেট ঘোষণা শুধু একটি দিন বা একটি মাসের কার্যক্রম নয়। এটি শুধু একটি মন্ত্রণালয়েরও নয়। সার্বিকভাবে বছরজুড়েই বাজেট নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে কাজ করতে হবে। তাহলে বাজেটের সব দিক তাদের জানা থাকবে। দেখা যায়, বাজেট পাস হলে কোন মন্ত্রণালয় বা কোন প্রকল্প কত বরাদ্দ পেল সেটি বের করতেই এক মাস চলে যায়। এমন হলে বাজেট বাস্তবায়ন হবে না।
আয় বৈষম্য প্রকটভাবে বেড়ে যাচ্ছে মন্তব্য করে মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, প্রবৃদ্ধির হার বাড়ছে, কিন্তু কর্মসংস্থান বাড়ছে না। আবার প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মূল্যস্ফীতির হারের মধ্যে সমন্বয় নেই। বড় কথা হচ্ছে, আয় বৈষম্য প্রকটভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এটা সমাজে অসন্তোষ তৈরি করতে পারে। এদিকে নজর দেয়াটা জরুরি।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাজেটের চ্যালেঞ্জ হল- সমতাভিত্তিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। যেভাবে আয় বৈষম্য বাড়ছে, সেখানে প্রবৃদ্ধি হয়ে কী হবে? প্রবৃদ্ধির অংশ সুষমভাবে বণ্টন করতে হবে। পাকিস্তান আমলে নীতি ছিল, আগে প্রবৃদ্ধি পরে বিতরণ। এই নীতি থেকে আমাদের বেরুতে হবে। প্রবৃদ্ধি অর্জনের সঙ্গে এর সুষম বণ্টনেও নজর থাকতে হবে। এই বাজেটে যেভাবে কর ও ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারণ করা হয়েছে তাতে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্তরা চাপে পড়ে যাবে। এটা কিছু দিন পরই বোঝা যাবে।
আইপিডিসি ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মমিনুল ইসলাম বলেন, আমদানি কমাতে বিলাস পণ্যের ওপর কর আরোপ করা যেত, সেটা করা হয়নি। আমরা এখন আর্থিক খাত নিয়ে সমস্যায় থাকলেও দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষার মান নিয়ে সমস্যায় পড়ব। কারণ চতুর্থ শিল্পবিপ্লব চলছে, ফলে যে মানের লোকবল প্রয়োজন হবে। আমরা তা গড়ে তুলছি না। এদিকে নজর দেয়া উচিত।









