সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
দেশে ব্যাংকিং খাতে ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে সার্বিকভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেছে। এর প্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ। এতে ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা কমে গেছে।
একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকির মাত্রা বেড়ে গেছে। মোট ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের মধ্যে ৮০ শতাংশই বড় অঙ্কের ঋণ। ব্যাংকগুলোর মোট সম্পদের প্রায় ৫৬ শতাংশই শীর্ষ ১০ ব্যাংকের কাছে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ব্যাংকিং খাতে নানা ধরনের ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে আরও আছে আমানত বাড়ার চেয়ে বেশি মাত্রায় ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের চেয়ে বেশি বেড়েছে ব্যয়। ঋণ বিতরণের চেয়ে আদায় হচ্ছে কম। ব্যাংকের সম্পদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের মাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১৯ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। ওই সময়ে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণও বেড়েছে।
মোট খেলাপি ঋণের ৫০ দশমিক ৫ শতাংশই রয়েছে শীর্ষ ৫ ব্যাংকের কাছে। বাকি ৪৯ দশমিক ১ শতাংশ অন্য ব্যাংকগুলোর হাতে। মোট খেলাপি ঋণের ৬৬ শতাংশ শীর্ষ ১০ ব্যাংকের কাছে। বাকি ৩৪ শতাংশ অন্য ব্যাংকগুলোর কাছে। বাণিজ্য খাতে মোট ঋণ বিতরণ বেড়েছে সাড়ে ২২ শতাংশ। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২৮ শতাংশ। গার্মেন্ট খাতে ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ ঋণ বিতরণ করেছে, এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ১২ শতাংশ।
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের বেশিরভাগই আদায় অযোগ্য কু-ঋণ। মোট ঋণের ৮৫ দশমিক ৯ শতাংশই আদায় অযোগ্য। সন্দেহজনক ঋণ ৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং নিুমানের ঋণ ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। কু-ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়। ফলে এ ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেলে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন খাতে অর্থ আটকে যায়। এতে তাদের ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের হারও বাড়ে। ফলে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকির মাত্রা বেড়ে যায়।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, মোট ঋণের ৬৭ দশমিক ৫ শতাংশ বিতরণ করা হয়েছে ঢাকায়। এর মধ্যে ৬৫ দশমিক ২ শতাংশই খেলাপি। অর্থাৎ ঢাকায় যেসব ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, তার বেশিরভাগই খেলাপি হয়ে গেছে। এর পরেই রয়েছে চট্টগ্রামের অবস্থান। এখানে মোট ঋণের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে খেলাপি ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
খেলাপি ঋণ নবায়ন করা হয়েছে সবচেয়ে বেশি বেসরকারি ব্যাংকে। এই হার ৫৬ শতাংশ। আর সরকারি ব্যাংকে ৪০ শতাংশ এবং বিশেষায়িত ব্যাংকে ৯ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের মধ্যে ৪৩ দশমিক ৪ শতাংশ রয়েছে শীর্ষ ৫ ব্যাংকে। শীর্ষ ১০ ব্যাংকে আছে ৬৩ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ বড় ব্যাংকগুলোতেই ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ বেশি। এর মধ্যে সরকারি ব্যাংকগুলোতে ২০১৭ সালে এ সম্পদের হার ছিল ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ, গত বছর তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। একই সময়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে সাড়ে ১২ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৪ শতাংশ। বিদেশি ব্যাংকগুলোতে এ হার ৩৬ থেকে কমে ৩০ শতাংশ হয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বেশিরভাগই বড় অঙ্কের ঋণ। এর মধ্যে ৫৬ শতাংশই বড় অঙ্কের ঋণ এখন ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে পরিণত হয়েছে। গত বছর এ খাতে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের হার ছিল সাড়ে ৪০ শতাংশ। মধ্যম শিল্প খাতে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ২২ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ১৩ শতাংশ। ছোট শিল্পে ১৩ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৮ শতাংশ।
ব্যাংকিং খাতে মোট সম্পদের মধ্যে শীর্ষ ৫ ব্যাংকের কাছে রয়েছে ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ। শীর্ষ ১০ ব্যাংকে আছে ৪৪ দশমিক ৩ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালে ব্যাংকিং খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়েছে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। আমানত বেড়েছে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ এ সময়ে আমানত কমেছে, ঋণপ্রবাহ বেড়েছে। এতে ব্যাংকগুলোতে তারল্য ব্যবস্থাপনায় সমস্যা দেখা দিয়েছে।
২০১৪ সালে আমানত বেড়েছিল ১৩ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১৫ সালে ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০১৬ সালে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ২০১৭ সালে ১০ দশমিক ৬ শতাংশ।
গত কয়েক বছরে তা কমে ৯.৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এদিকে ঋণপ্রবাহ একই সময়ে বেড়েছে। ২০১৪ সালে ছিল ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০১৫ সালে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ, ২০১৫ সালে ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০১৭ সালে ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের ৪৬ শতাংশই শীর্ষ ১০ ব্যাংকের হাতে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।
দেশের ৫৭টি ব্যাংককে ৫টি গ্রুপে ভাগ করে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এতে দেখা যায় ব্যাংকগুলোর ঋণের ৮০ শতাংশ ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের চলে গেছে।
প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, ২০১৭ সালে ব্যাংকিং খাতে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা নিট মুনাফা ছিল। গত বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকায়। ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে মুনাফার হার বেড়েছিল সাড়ে ১৪ শতাংশ। ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে কমেছে ৫৭ দশমিক ৭ শতাংশ।









